পরিবর্তনের পুজোতে এই কলকাতায় একজন বাঙালিকে ‘বাংলাদেশী’ তকমা পেতে হচ্ছে – এটা লজ্জার নয় ?
পরিবর্তনের পরে এবার প্রথম দুর্গাপূজা হল বাংলায়। যেমনটা আশঙ্কা করা গিয়েছিল তেমনটাই হয়েছে। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে সমস্ত কিছুতেই নতুন সরকার মোটামুটি ব্যর্থ এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। ইঙ্গিত পাওয়াই যাচ্ছিল যে মানুষ খুব একটা উৎসাহ দেখাচ্ছেন না এবারের পূজোতে আনন্দে মাততে। কেন উৎসাহ পাচ্ছেন না, তা বোঝা না গেলেও মানুষের মনে কোথাও একটা আনন্দের অভাব ছিল সেটা বোঝা যাচ্ছিল। এই বছর পুজোর আগে যখন মানুষ বলছিল যে ঠিক পুজোর অনুভূতি হচ্ছে না, এটা মাথায় রাখতে হবে যে তাঁরা শুধুমাত্র তৃণমূলের লোক বা ওঁদের ভাষায় ‘সেকু মাকু’ নয়, বেশিরভাগই সাধারণ মানুষ। বেশ কিছু দৃশ্য চোখে পড়ছিল অনেকেরই। ধরা যাক অন্যান্য বার পুজোর অনেক আগে থেকে বিভিন্ন বড় পুজোর আশেপাশে বিজ্ঞাপন দাতাদের হোর্ডিং দেখা যেত। এবার তুলনামূলকভাবে সেই রকম হোর্ডিং অনেক কম দেখা গেছে। তার মানে বিজ্ঞাপনদাতারাও খুব বেশি উৎসাহী ছিলেন না বাংলায় তাদের পণ্যের বিজ্ঞাপন করতে। অন্যদিকে এখনো বহু মানুষ ভোটার তালিকার বাইরে রয়েছেন তার মধ্যে অনেকটা অংশই হিন্দু মানুষজন, এবং তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত তারা নিজেরাও বুঝতে পারছেন। পাশাপাশি আরও একটা বিষয়ে চোখে পড়েছে হয়ত অনেকেরই, প্রতিশ্রুত অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের তিন হাজার টাকা না পাওয়ার যে ক্ষোভ সেটাও একটা কারণ হতে পারে। শুধুমাত্র সরকারি কর্মচারীদের ২০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা যে কোন বাজারকে চাঙ্গা করতে পারেনা তা এবারের পূজোয় আবার প্রমাণিত হলো।
পাশাপাশি বকেয়া মহার্ঘ ভাতা না পাওয়ার অংশটাও খুব যে কম ছিল তেমনটা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল পরিচিত পুজো গুলোর পরিচালন করার যে কমিটিগুলো সেগুলোকে নানান অজুহাতে ভেঙে দিয়ে নতুন অবাঙালি মানুষদের সেই পুজোগুলোর মাথায় বসিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া নেওয়া হয়েছিল। সেই পরিচালন কমিটিগুলোও জানেনা বা তাদের জানা ছিল না কীভাবে আপামর বাঙালি পুজোয় রাস্তায় নামে এবং উৎসবে শামিল হয়। তার মধ্যে মাঝেমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর একাধিক হুমকি শোনা যাচ্ছিল এবার পুজো হবে সনাতনী প্রথায়। বামেদের ৩৪ বছর এবং তৃণমূলের ” মমতাজ বেগমের ” ১৫ বছরের শাসনকালের থেকে সম্পূর্ণ নতুন করে একটা দুর্গাপুজো সংঘটিত হবে এবার বাংলায়। মুখ্যমন্ত্রী হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন গত ১৫ বছরেই এই দুর্গাপুজো বিশ্বের কাছে “ইউনেস্কোর ইনট্যানজিবেল হেরিটেজ” এর মর্যাদা পেয়েছে। সুতরাং বিষয়টা এখান থেকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু কী কী দেখা গেছে এইবারের পুজোয়? ইডেন গার্ডেন্সে নিজেদের মতো করে পাবলিকের টাকায় বাজি ফাটিয়ে, ড্রোন উড়িয়ে বিজেপির মহালয়া সেলিব্রেশন। পুজোর আগেই বাগেশ্বর বাবার পাখন্ডী বলা বাঙালিকে, কোথাও যেন সুর কেটে গিয়েছিল। মণ্ডপের চারপাশে কোনও আমিষ খাবারের দোকান দেওয়া যাবে না। কলকাতার কিছু অংশে অবাঙালি বিয়ে বাড়ির মতো লাইটিং, বাকি অংশ হয় স্বাধীনতা দিবসের গেরুয়া, সাদা, সবুজ, বা বাকি অংশ অন্ধকার। মনে হচ্ছিল, যেন সবার মনে আনন্দ নেই। সবাই যেন খুশী নয়। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরে নতুন মুখ্যমন্ত্রীর আস্ফালন এবং হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের ঘটনা, কোথায় যেন আনন্দে ভাসতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল।
বিভিন্ন জায়গায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি করা পোস্টার, দুর্গার কখনো ৯টা, বা কখনো ১১টা বা ১২ টা হাত। দেখে মনে হচ্ছিল, যাঁরা এই পুজোগুলো পরিচালনার দায়িত্ব তাঁদের মধ্যে কোথায় যেন বাঙালিয়ানার অভাব এবং আন্তরিকতার অভাব চোখে পড়ছিল। পাবলিকের টাকায় ফ্লাইওভার রং, আবার সেটা তোলা, মাঝে দুর্ঘটনা। সব মিলিয়ে টাকা দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে, ‘জীবনে প্রথম এইরকম পুজো দেখছি’ এই ভাষ্য তৈরি করার চেষ্টা হলেও তা সাধারণ মানুষকে ছুঁতে পারেনি। কেনাকাটা কম হয়েছে, ব্যবসা বাণিজ্য পুজোর আগে কম হয়েছে। বিভিন্ন হাট তুলে দেওয়ার ফরমানে বাঙালি ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবরও হয়েছে। তৃতীয়া, চতুর্থী অব্দি বেশিরভাগ প্যান্ডেল তৈরি না হওয়া। সপ্তমীর ভিড় সামলাতেই নাজেহাল পুলিশ, এবং পুজোর মধ্যে চোরবাগানের ওই মর্মান্তিক ঘটনা। ১৯ টা তাজা প্রাণ, সব প্রশাসনের গাফিলতিতে। চোরবাগান ছাড়াও, এই প্যান্ডেল বন্ধ, ওই প্যান্ডেল বন্ধ, এইসব নিয়ে বিভ্রান্তি মানুষকে পুজো থেকে দূরে সরিয়েছে। পুজোর মধ্যে বাম প্রগতিশীল বইয়ের স্টলে কেন্দ্রীয় বাহিনী ও কলকাতা পুলিশ এবং বিজেপির গুন্ডাবাহিনীর হামলা আনন্দের আবহে কোথায় যেন জল ঢেলে দিয়েছে।
দশমী পর্যন্ত অনেক ঠাকুরের প্রতিমা ভেঙে যাওয়া, প্যান্ডেলে আগুন লাগা। দশমী হওয়ার আগেই বাংলা ও বাঙালির মুখ্যমন্ত্রীর নবরাত্রি তে দশেরা সেলিব্রেশন। সব শেষে সরকারের প্রধান মুখের পক্ষ থেকে সনাতনীরা একমাত্র দুর্গা ঠাকুরের মূর্তিকে ছুঁতে পারবেন, এই সমস্ত নিদান দিতে গিয়ে বিজয়া দশমীকেও নষ্ট করা হয়েছে। এত কিছুর পরেও যদি আপনার মনে হয় আগের সব বছর গুলোর মতোই এই বছর পুজো হয়েছে, তাহলে আর কিছু বলার নেই। বাঙালি সত্যি এমন পূজো দেখেনি আগে। এভাবেই হয়তো সাচ্চা হিন্দুদের পুজো করা হয়, যেটা বাঙালি আগে কোনদিন দেখেনি। সেইজন্যেই উত্তরবঙ্গ সংবাদ তাঁদের খবরের একটি শিরোনামে দশমীর পরে লিখেছে, ‘বাঙালিয়ানার বিসর্জন’। এখনো আপামর বাঙালি হয়ত এটা অনুধাবন করে উঠতে পারেনি, কিন্তু বিষয়টা ধীরে ধীরে সেইদিকেই যাচ্ছে। আগামীতে থিম পূজো বন্ধ করে সনাতনী হিসেবে পুজো করা হবে। তার মধ্যে দিয়ে বাঙালির শুধু শিল্পচর্চার ওপর বাধা সৃষ্টি হবে এমনটা নয়, তার সঙ্গে কাজ যাবে অসংখ্য মানুষের। আদানি এইবছর বিশেষ কিছু পুজোতে টাকা ঢেলেছে, আগামীতে সেইগুলো আর সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তারপরে আস্তে আস্তে বাঙালির দুর্গাপুজো হয়ে যাবে নবরাত্রি। দশেরা, রাবণ বধ আর ডান্ডিয়াতে পরিণত করে নিলেই হিন্দুদের সরকারের আদর্শ পুজো হবে, আর সেটাই হবে সনাতনী পুজো। সমস্যাটা হচ্ছে, বেশ কিছু বাংলায় না থাকতে চাওয়া, বাইরে থাকা ‘বং’ হতে চাওয়া বাঙালিরা সেটাও মেনে নেবে, কারণ সে তো বিশ্বনাগরিক হতে চায়। বিশ্ব যদি ছেড়েও দেওয়া যায়, সে তো নিজের যা কিছু অর্জন সব ছেড়ে দিয়ে ভারতীয় হয়ে উঠতে চায়। আর ঠিক তখনই এই কলকাতায় নবীন পল্লী’র পুজোতে যখন যোগীন্দ্রনাথ সরকার এবং তাঁর শিশুসাহিত্য নিয়ে পাড়া সেজে ওঠে, সেখানেই বাংলায় কথা বলার জন্য একজন বাঙালিকে ‘বাংলাদেশী’ তকমা পেতে হয়।

