শ্রাবণ সন্ধ্যাতে ভেজা সোঁদা মাটিতে হাঁটতে গিয়ে গন্ধ আসে বিভিন্ন রকম রান্নার। বাঁকুড়া-পুরুলিয়ার রাঢ় মাটিতে শ্রাবণ সংক্রান্তিতে ধুম করে মনসা পুজো হয়, সাথে হয় রান্না পুজো। অনেকে এই রান্না পুজোকে ‘অরন্ধন’ও বলে। এই বাংলার মাটিতে শ্রাবণ সংক্রান্তি’র দিন রান্না করে, তার পরের দিন খাওয়ার নিয়ম চলে আসছে বহু বছর ধরে। আমার বাড়িতে প্রতিষ্ঠিতা দেবী মা মনসা। ছোটবেলার থেকে দেখে আসছি ছোট ঠাকুমা বর্ষা-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে মায়ের পুজো করে। সাথে থাকে বাড়ির মা-কাকিমারা। পাড়া-গাঁ তেও ধুম করে পুজো লাগে মা মনসার। বাংলার শ্রেষ্ট পুজো দুর্গাপুজো হলেও, বাংলার বড় পুজো মনসা পুজো। বর্ষাজলে ভেজা শ্রাবণে মা মনসার পুজোকে বলা হয় ‘ঝাপান’।

শ্রাবণ মাসে পাড়া-গাঁ’য়ে কচুফুল ফোটে, সাথে শাপলাও। শাপলা ভেঙে মালা তৈরি হয়, তা ঝোলানো হয় দেবীর গলায়। গ্রামের পর গ্রাম জুড়ে মালার মত লাইট ঝোলানো হয়, সঙ্গে থাকে সাউন্ড কম্পিটিশন। গ্রামের বউরা সিঁথি জুড়ে সিঁদুর টেনে, হলুদ রঙের ফুলছাপ শাড়ি পড়ে, ছেলেকে কোলে নিয়ে যায় ঝাপান উৎসবে। প্রান খুলে দেবীকে ডাকে ‘দেবী আয় মা, আয় মা ঝাপানের আসরে’। তাদের স্বামীরা যে জমিতে চাষ করে, বর্ষাতে সেই জমিতেই থাকে প্রচুর সাপ।
একসময় চাষীরা এই সাপের হাত থেকে নিজেদের জীবন বাঁচানোর জন্য বর্ষাকালে মনসা পুজো করে। সেই থেকেই চলে আসছে এই রীতি।

কেয়াবনের গন্ধ ছাড়িয়ে, গ্রামের সোঁদা মাটির রাস্তাতে যে খুশির আভাস লেগে থাকে, যে ঢাকি প্রান খুলে মায়ের জয়গানকে ঢাকের সুরে মিলিয়ে দেন, তা নিয়েই তো আমাদের গ্রামবাংলা, আমাদের রাঢ়উৎসব। সাপকে, মা মনসাকে বরাবর ই মানুষ ভয়ের চোখে দেখে। কিন্ত গ্রামবাংলায় মা মনসা যেন তাদের ঘরের মেয়ে। পুজোর সময় কেউ দেখি মাকে নতুন শাড়ি দিচ্ছে, কেউ টিপ পড়িয়ে দিচ্ছে। মনসা পুজোর দিন যে রান্না করে রাখা বাড়িতে বাড়িতে, সেই রান্না দেবীকে আগে দিয়ে তারপর নিজেরা খায়। ছোটবেলায় শোনা মনসামঙ্গলের গান, তা আজও যেন জীবন্ত হয়ে আছে । কঠিন একটা সুর আছে, কঠিন আবেগ আছে এই মনসামঙ্গলের মধ্যে। কুম্ভকার কাকার গলায় ‘মা গো’ টান যখন আসে, তখন বুঝতে পারি কেউ আকুল মনে যেন প্রার্থনা করছে। মায়ের গায়ে থাকা মোটা সুতির কাপড় বৃষ্টির জলে ভিজে জানান দেয় চাষীবউদের দু:খগান। এভাবেই চাষীরা বাঁচে। বেঁচে থাকে বাংলার ইতিহাস, বাঙালীর উৎসব, মনসামঙ্গলের জয়গান।

