ছাত্রশূন্য স্কুল বন্ধ করে দিলেই কি সরকারি স্কুলের ওপরে আস্থা ফিরে আসবে?

৪ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

সিদ্ধান্তটা আসলে প্রশাসনিক সংস্কারেরই অন্তর্গত। আপাতদৃষ্টিতে এই যুক্তিকে অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এই যুক্তির উলটোদিকে বেশ কিছু যুক্তি রাখা যায়। সরকারি এই সিদ্ধান্তটির প্রেক্ষিতে উত্থাপন করা যায় বেশ কিছু প্রশ্নও। এখানে একটি তথ্যও দিয়ে রাখা দরকার। ২০২৫-এ সংসদে সরকার একটি তথ্য দিয়ে জানিয়েছিল যে, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ভারতের ৫,১৪৯টি সরকারি স্কুলে কোনো ছাত্রছাত্রী ছিল না আর ৬৫,০৫৪টি স্কুলে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যার ছিল ১০-এরও কম। ছাত্রশূন্য স্কুলগুলির ৭০ শতাংশ রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ ও তেলঙ্গানা এই দুই রাজ্যে। আর ছাত্রশূন্য স্কুলের তালিকায় প্রথম নামটি পশ্চিমবঙ্গের।

লজ্জার এই তথ্যটির সামনে দাঁড়িয়ে প্রথমেই এই প্রশ্ন ওঠে যে, এই স্কুলগুলি ছাত্রশূন্য হলো কেন? এই প্রশ্নটির উত্তর না দিয়ে শুধু ছাত্র নেই বলে স্কুল বন্ধ করে দেওয়া প্রশাসনিক হিসেব মেলাতে পারে, কিন্তু সরকারের শিক্ষানীতিকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। বলাই বাহুল্য কোনো জাদুমন্ত্রবলে একদিনে হঠাৎ তো স্কুলগুলি ছাত্রশূন্য হয়ে পড়েনি। স্কুলশিক্ষার শরীরে এই রক্তহীনতা বহু বছরের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং শিক্ষাগত পরিবর্তনের ফল। একথা অনস্বীকার্য যে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনসংখ্যার স্থানান্তর হয়েছে, গ্রাম থেকে শহরে মানুষ গিয়েছে, বহু পরিবার বেসরকারি স্কুলের দিকে ঝুঁকেছে, ইংরেজি-মাধ্যম শিক্ষার চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু একইসঙ্গে প্রশ্ন ওঠে যে, বহুদিন ধরেই সরকারি স্কুলের মান, পরিকাঠামো, শিক্ষকসংখ্যা, প্রশাসনিক নজরদারি এবং শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে যে-প্রশ্নগুলি উঠেছে, এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজে পাওয়ার কোনো চেষ্টা কি সরকার করেছে? নাগরিকদের অভিজ্ঞতা বলছে যে এই প্রশ্নটির উত্তর হলো–না। তাই, বলা বাহুল্য, ৯৩৩টি সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার দায় পূর্বতন সরকার কিন্তু এড়িয়ে যেতে পারে না। বহু বছর ধরে এই স্কুলগুলিতে ছাত্রসংখ্যা কমেছে। প্রশাসনের কাছে সেই তথ্য ছিল। তাই আজ তো এই প্রশ্ন করাই যায় যে, এই স্কুলগুলিকে বাঁচাতে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? এই স্কুল গুলির মধ্যে ক-টি স্কুলের পরিকাঠামো উন্নত করার চেষ্টা হয়েছে? ক-টি স্কুলের শিক্ষক-সংকট মেটানো হয়েছে? স্কুলগুলি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় স্থানীয় মানুষ বা অতীতে এই সমস্ত স্কুলে যে-সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীরা পড়ে গিয়েছে তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল কি? এই স্কুলগুলির মধ্যে কতগুলিকে স্থানীয় শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে পুনর্গঠন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর ছাড়া আজ স্কুল বন্ধ করার সিদ্ধান্তকে নিছক ‘প্রশাসনিক সংস্কার’ বলে মেনে নেওয়া কঠিন। একটি সরকারি স্কুল ছাত্রশূন্য হয়ে গেলে সবচেয়ে সহজ কাজ হলো স্কুলটি বন্ধ করে দেওয়া। কঠিন কাজ হলো সেই স্কুলটিকে আবার মানুষের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলে পঠন-পাঠন চালু করা। সরকার কোন পথ বেছে নিচ্ছে সেটি কিন্তু আসল সরকারের রাজনৈতিক অবস্থানকে স্পষ্ট করে।

একথা ঠিক যে, ধুঁকতে থাকা সব স্কুলকে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখারও কোনো যুক্তি নেই। একটি এলাকায় যদি একাধিক সরকারি স্কুল কাছাকাছি থাকে এবং কোনো একটিতে ছাত্রসংখ্যা কার্যত শূন্য হয়ে যায়, তাহলে স্কুলগুলিকে সংযুক্ত করার জন্য প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এই পুনর্বিন্যাস হওয়া উচিত স্বচ্ছ তথ্যের ভিত্তিতে, কখনোই রাজনৈতিক সুবিধে বা প্রশাসনিক স্বাচ্ছন্দ্যের ভিত্তিতে নয়। আর একটি বিষয় আরও গুরুত্বপূর্ণ। একটি স্কুল বন্ধ করার আগে সেই এলাকার ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা, যোগাযোগব্যবস্থা, নিকটবর্তী স্কুলের দূরত্ব, ছাত্রছাত্রীদের যাতায়াতের বাস্তবতা এবং আগামী দশ-পনেরো বছরে সম্ভাব্য জনবসতির পরিবর্তন — এইসব কিছুই বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ আজ যে-অঞ্চলে জনসংখ্যা কমছে, কাল কোনো শিল্প, সড়ক, রেল বা সরকারি প্রকল্পের কারণে সেখানে নতুন বসতি গড়ে উঠতেই পারে। কাজেই স্কুল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত অন্য কোনো ব্যবহারহীন সাধারণ সম্পত্তির ভাগ্য নির্ধারণ করার সিদ্ধান্তের মতো সহজে নেওয়া যেতে পারে না।

যেভাবে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই এতগুলি স্কুল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিল তাতে আরেকটি বিপজ্জনক সম্ভাবনাকেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুলগুলির ভবন ও জমি ‘অব্যবহৃত সম্পত্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করে ভবিষ্যতে সেগুলির বাণিজ্যিক বা অন্য কোনো ব্যবহারের রাস্তা খুলে দেওয়া হলে প্রশ্ন উঠবেই স্থানীয় মানুষদের মতামত না নিয়েই এই সিদ্ধান্ত কি সরকার নিতে পারে? জনগণের অর্থে তৈরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির সম্পত্তির মালিক আসলে কে? সরকার না কি জনগণ? সরকার যদি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, গ্রামীণ উন্নয়ন কেন্দ্র বা অন্য জনকল্যাণমূলক কাজে এই বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুলগুলির পরিকাঠামো ব্যবহার করে, সেটি অবশ্যই ভুল সিদ্ধান্ত হবে না। কিন্তু এই সম্পত্তির বেসরকারিকরণ হলে তা আসলে জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করাই হবে। মনে রাখা দরকার, সরকারি শিক্ষা কোনো দাতব্য ব্যবস্থা নয়। এটি নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামো। এই পরিকাঠামোকে গুরুত্বহীন করে বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা আসলে এক অপরাধ। একটি শিশুর বাবা-মায়ের আর্থিক সামর্থ্য কম –তাই তার জন্য কম মানের শিক্ষা থাকবে বা থাকবেই না; আর যার পরিবারের সামর্থ্য বেশি সে বেসরকারি স্কুলে যাবে, এমন একটি দ্বিস্তরীয় শিক্ষাব্যবস্থা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পক্ষে শুধু লজ্জারই নয়, বিপজ্জনক।

পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকারের এবং বিজেপি দলটির কর্তা ব্যক্তিরা হামেশাই বিবেকানন্দের শরণাপন্ন হন। ১৮৯৪ সালের ২০ জুন মাইসোরের মহারাজা মহীশূরের দেওয়ান স্যার কে. শেষাদ্রি আয়ারকে লেখা একটি ঐতিহাসিক চিঠিতে (পরে এটি “আওয়ার ডিউটি টু দ্য মাসেসেস” শিরোনামে প্রকাশিত হয়) বিবেকানন্দ স্পষ্ট করে লিখেছিলেন,
“দরিদ্র বালক যদি শিক্ষালয়ে আসিতে না পারে, তবে তাহাদের নিকট শিক্ষা পৌঁছাইয়া দিতে হইবে।” ৯৩৩টি সরকারি স্কুল বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কি বিবেকানন্দের এই কথাটির সঙ্গে মেলে? এই প্রশ্নটিও জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে যে, সরকারি স্কুলে নতুন করে অভিভাবকদের আস্থা ফেরানোর জন্য সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কী? ছাত্রশূন্য স্কুলের গেটে তালা ঝুলিয়ে কি অভিভাবকদের আস্থা ফিরে পাওয়া যাবে?

অন্যান্য প্রতিবেদন.