Shopping cart

অধুনা

বিকশিত ভারতে নারীরা আজও আঁধারে?

322

ভারতের স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূরণ হয়েছে। দেশে “আজাদী কা অমৃত মহোৎসভ”-এর স্লোগান শুনেছি আমরা সকলেই। এই স্বাধীন ভারতের অন্যতম বড় শহর হিসেবে আমরা চিনি মুম্বাইকে। মুম্বাই বলতে আমাদের মাথায় আসে “বাণিজ্য নগরী” এবং বলিউড তারকারা। শাহরুখ খানের ‘মন্নাত‘ এবং সলমান খানের এপার্টমেন্টের সামনে একগুচ্ছ ভিড় হয় প্রায় রোজ শুধু তাদের এক ঝলক পাওয়ার জন্য। কাপুর পরিবারের তৈরি আর.কে. স্টুডিও মুম্বাইয়ের অন্যতম দর্শনীয় স্থান। এছারাও মুম্বাইতে অন্য বলি তারকা ও কোটিপতি ব্যবসায়ীদের চোখ ধাঁধানো আকাশছোঁয়া অট্টালিকা আমরা প্রায়ই দেখে থাকি। কিন্তু এই মুম্বাই থেকে ৯২২ কিলোমিটার দূরে মহারাষ্ট্রেরই এক জেলায় যে এ্ক অন্য ভারতের ছবি আছে সে বিষয়ে এই তথাকথিত “তারকা”-রা দৃষ্টিপাতও করেন না।

একবিংশ শতাব্দিতেও যে ভারতের এই দৃশ্য হতে পারে তা ভাবা কঠিন। মহারাষ্ট্রের এক প্রত্যন্ত জেলা গড়চিরোলি, যেখানে আদিবাসী জনজাতি বসবাস করে। সেই গ্রামের মেয়েদের যখন প্রতিমাসে ঋতুচক্র চলে তাদের নিজের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং গ্রামের এক কোণে একটি ভগ্নপ্রায় মাটির ঘরে ৫-৬দিন থাকতে হয়। সেই ঘরে থাকে না পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা, না থাকে স্বাস্থ্যকর শৌচালয়। শুধু থাকে অস্বাস্থ্য ও অবমাননার অন্ধকার। সেই ভগ্নপ্রায় ঘরটিকে বলা হয় “কুরমা ঘড়”, যেখানে থেকে বহু মেয়ে সাপের কামড়ে, সংক্রমণে, অ্যানিমিয়ায় মারা গেছে, তাই গ্রামের মহিলারাও চান না মাসের ৫দিন ওই ঘরে থাকতে। কিন্তু তাদের তো স্বাধীনতা নেই নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার। গ্রামের “পুরুষেরা” এখনও চান যে মহিলারা ওইভাবেই থাকুক তাই মহিলাদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও ওইভাবেই থাকতে হয় এবং যতদিন পুরুষেরা চাইবেন মহিলাদের এই অমানবিক প্রথা চালিয়ে যেতে হবে। এই ছবি শুধু মহারাষ্ট্র নয় পুরো ভারতের প্রত্যন্ত জেলাগুলির, গড়চিরোলি শুধু এক উদাহরণ মাত্র।

একদিকে যেখানে “বিকশিত ভারত”-এর স্বপ্ন দেখছে গোটা দেশ, রাজধানীতে মাসিকের সময় ছুটির আবেদন নিয়ে বিল পেশ করা হচ্ছে, সেখানে সেই একই ভারতের এক প্রান্তে মহিলাদের মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট আনুষ্ঠানিকভাবে ঋতুস্রাবকালীন স্বাস্থ্যকে সংবিধানের ২১ নং অনুচ্ছেদের (জীবন ও মর্যাদার অধিকার) অধীনে একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে কিন্তু ২০২৬-এ দাড়িয়েও বহু নারী “পিরিয়ড পভার্টি”-র শিকার। “পিরিয়ড পভার্টি” হল সেই দারিদ্রতা যা অর্থের নয়, যা সম্মানের। কোন নারী যখন মাসিক ঋতুচক্রে মাসিকের সামগ্রী, স্বাস্থ্যবিধি সুবিধা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদে ও মর্যাদার সাথে মাসিক ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষার সামর্থ্য বা প্রাপ্তির অভাব বোধ করেন,সেটি হয় তার বাস্তবতা। জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষার মতে ২২%-২৪% মহিলারা এই সমস্যার মধ্যে রয়েছেন। একদিকে যখন ভারতের প্রত্যন্ত কোনো গ্রামে এক মেয়ে প্রতি মাসে নিজের মৌলিক অধিকারের সুবিধাটুকু পায় না সেই সময়ই হয়ত মুম্বাইতে আরামদায়ক পরিবেশে বসে কোন নোংরা ফাতেহির মত কেউ প্রশ্ন তুলবেন আমাদের নারীবাদের আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা। যে দেশের দর্শকদের থেকে মোটা অঙ্কের মুনাফা কামিয়ে আজ ওই বলিউড তারকারা বিলাশবহুল জীবনযাপন করেন, সেই দেশের কোন রাজনৈতিক বা সামাজিক সমস্যায় এই বলিউড তারকারা সবসময় নিরবতা পালন করে থাকেন।

পরিসংখ্যান বলছে, দেশের বিভিন্ন রাজ্যে “পিরিয়ড পভার্টি”-র হার উদ্বেগজনক। উত্তরপ্রদেশে প্রায় ৭১.৪%, বিহারে ৬৯.০%, আসামে ৬৮.৯%, মধ্যপ্রদেশে ৬৭% এবং গুজরাটে ৩৩.৫% নারী এই সমস্যার সম্মুখীন। তুলনামূলকভাবে পশ্চিমবঙ্গে এই হার কম, প্রায় ১৬.৯%। এই পার্থক্যই দেখিয়ে দেয়, সচেতনতা, শিক্ষা ও সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবর্তন সম্ভব এবং পশ্চিমবঙ্গ বাকি রাজ্যের থেকে অনেকআংশে এগিয়ে ছিল, আছে, থাকবে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন, “নারীত্বের মর্যাদা যেখানে নাই, সেখানে আর যাহাই থাক মনুষ্যত্ব নাই। হয়তো এই লেখায় বিশ্বাস করে বাঙালি, আজও তাই বাকি দেশের তুলনায় নারীকে বেশি মর্যাদা দিতে বাঙালিই জানে। পশ্চিমবঙ্গ এবং কলকাতায় ধর্ষণের ঘটনায় যখন মুখ্যমন্ত্রী রাত ৮ টার পর মেয়েদের বাইরে থাকতে নিষেধ করেন তখন বহু ছেলে ও মেয়েদের একসাথে রাত দখলের উদাহরণ দেখিয়েছে এই বাংলা। তবে কি বাংলায় দ্বিচারিতা নেই? আছে। সেই ডাক্তার ধর্ষণ হওয়ার পর প্রমাণ লোপাটের ঘটনাও ঘটেছে এই বাংলায়। একটি মেয়ের স্বভাব-পোশাক-আচরণ নিয়ে আজও প্রশ্ন ওঠে এই বাংলায় কিন্তু ভারতের বাকি রাজ্যের তুলনায় বাঙালার মেয়েদের পরিস্থিতি কতটা মর্যাদাপূর্ণ তা বারবার নানান পরিসংখ্যানে উঠে আসে এবং এর অন্যতম কারণ বাঙালিদের বিস্তৃত ও অগ্রসর চিন্তাভাবনা।

ভারতের এই পরিস্থিতির জন্য আর্থ-সামাজিক বৈষম্য, শিক্ষার অভাব ও কুসংস্কার একসঙ্গে দায়ী। বহু গ্রামীণ অঞ্চলে এখনও মাসিক চলাকালীন নারীদের “অচ্ছুত” বলে গণ্য করা হয়, ধর্মীয় বিশ্বাসের আড়ালে এই প্রথাকে স্বাভাবিক করে তোলা হয়েছে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে বড় হয়ে ওঠার ফলে অনেক নারীও বাধ্য হন এই ধারণা মেনে নিতে।অথচ এই ঋতুচক্রই মানব প্রজননের মূল ভিত্তি—এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকেই সমাজ অস্বাভাবিক করে তুলেছে। আরও বিস্ময়ের বিষয়, একদিকে মাসিক চলাকালীন নারীদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখা হয়, আবার অন্যদিকে অম্বুবাচী উৎসবে দেবীকে পুজো করা হয়, একই প্রজনন ও নারীত্বের প্রতীককে উদযাপন করা হয়। এই দ্বিচারিতা আমাদের সামাজিক মানসিকতার গভীর বৈপরীত্যকেই তুলে ধরে।

ভারত সরকারও ২০১৪ থেকে “আচ্ছে দিন”-এর আশ্বাস দিয়ে এসেছে কিন্তু নারী কল্যানকে বিরত রেখে কি সমাজের কল্যান সম্ভব? সরকার বিভিন্ন সময় নানা প্রকল্প চালু করলেও সেগুলির বাস্তবায়ন যে প্রকৃত অর্থে হয়নি তার প্রমাণ খুবই পরিষ্কার। গুরুত্বপূর্ণ ভাবে ভারতের গ্রামাঞ্চলের মধ্যে পরিবর্তনের গতি বাড়লে সমগ্র দেশেরই পরিবর্তন সম্ভব।

পরিবর্তন শুরু হতে পারে সচেতনতা থেকেই। ঋতুচক্রকে ঘিরে যে কুসংস্কার ও নীরবতা এখনও সমাজে বিদ্যমান, তা ভাঙা এখন সময়ের দাবি। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমেই এই মানসিকতার পরিবর্তন সম্ভব।একজন নারীর শরীর তার নিজের এই সহজ সত্যটিকে স্বীকার করতে শিখতে হবে সমাজকে। ঋতুচক্র কোনো লজ্জা নয়, কোনো ট্যাবুও নয়—এটি স্বাভাবিক, প্রয়োজনীয় এবং জীবনেরই অংশ। যতদিন না এই স্বাভাবিকতাকে আমরা মর্যাদা দিচ্ছি, ততদিন পর্যন্ত প্রকৃত অর্থে “বিকশিত সমাজ”-এর দাবি অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।

সম্পর্কিত খবর