সম্প্রতি নভেম্বরে ভারতীয় মেয়েরা নজির গড়ল। স্মৃতি মান্ধানার পুরো বিশ্বকাপে নজিরবিহীন অবদান এবং জেমাইমা রড্রিগেজের দুর্ধর্ষ সেমিফিনালের শতক ভারতকে শিরোনাম পাওয়ালো। তাই আজ তারা শিরোনামের শীর্ষে, সোশ্যাল মিডিয়া ছেয়ে রয়েছে। কয়েকবছর আগে এই জায়গা পেয়েছিল টেনিস তারকা সানিয়া মির্জা এবং শাটলার পি ভি সিন্ধু ও সাইনা নেহ্বাল । এই ধারাবাহিকতায় মেয়েদের ক্রীড়ায় যোগদান বেশিরভাগই ক্রিকেট, টেনিস, ব্যাডমিন্টনেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। কিন্তু এমন অনেক মেয়ে আছে যারা এই লাইমলাইটের পরোয়া না করে ভারতকে শীর্ষস্থানে নিয়ে গিয়েছিল, যাদের কথা আমরা প্রায় ভুলে গেছি।
সাল ১৯৩৫, ভারতের হয়ে অলিম্পিকে অংশ নেওয়া প্রথম ভারতীয় মহিলা ছিলেন মাত্র ১৭ বছর বয়সি নিলিমা ঘোষ। তিনি ফাইনালে পৌঁছাতে না পারলেও সেই সময়ে একজন ভারতীয় মেয়ের পক্ষে অলিম্পিকে অংশ নেওয়াই ছিল এক অসাধারণ সাফল্য।সাল ২০১৮, স্বপ্না বর্মণ এশিয়ান গেমসে হেপ্টাথলনে সোনা জিতে ইতিহাস গড়েন এবং ২০১৯ সালে অর্জুন পুরস্কারে সম্মানিত হন। মহিলা ফুটবলের “গোল মেশিন” হিসেবে পরিচিত বালা দেবী। আন্তর্জাতিক মঞ্চে ৫০-এরও বেশি গোল করে দেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন। একইভাবে “ফুটবল ফ্রিস্টাইল কুইন” নামে পরিচিত বিপাশা বৈষ্ণব নিজের দক্ষতায় বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন। এদের প্রত্যেকেরই যাত্রাপথ শুরু নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে,সাথে ছিল অদম্য জেদ আর স্বপ্ন। সেই জেদের জোরেই তাঁরা ভারতকে গৌরবের আসনে তুলে ধরেছেন। অথচ নিলিমা ঘোষকে বাদ দিলে, বাকি অধিকাংশ নামই সাম্প্রতিক তবুও আমরা তাঁদের মনে রাখিনি।
এখানেই প্রশ্ন ওঠে, এই পার্থক্যের কারন কী? এর উত্তর হল মিডিয়া এবং দর্শকের পছন্দ। ক্রিকেট আমাদের দেশে সবথেকে বেশি প্রচলিত খেলার মধ্যে একটি এবং ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদের খেলারও ধীরে ধীরে গুরুত্ব বাড়ছে, যে পরিমাণ সমর্থন হরমানপ্রীতের দল পেয়েছে তা আগে মিতালি-ঝুলনরাও পায়নি। দর্শকদের সমর্থনের পাশাপাশি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সহায়তাও তারা পাচ্ছে, উইমেন্স প্রিমিয়ার লিগে পাচ্ছে বাড়তি টাকা কামানোর সুযোগ। কিন্তু এর অর্ধেক সমর্থন বা আয়ের সুযোগ অন্য খেলোয়াড়রা পান না। যেখানে শীর্ষস্থানীয় উইমেন ফুটবলারদের বার্ষিক আয় ১০-১২ লাখ টাকা, কিন্তু ক্রিকেটে সমপরিমাণ বেতন দেওয়া হয় নিম্ন স্তরের চুক্তিভুক্ত খেলোয়াড়দের। এই দুই খেলার মধ্যে যে এত বড় মাপের ফারাক বিদ্যমান, তা শুধু আয়ের নয় বরং সুযোগ ও স্বীকৃতিরও।
ফুটবলের থেকে ক্রিকেট খেলা শেখা বেশি খরচাসাপেক্ষ। ক্রিকেটে দরকার হয় ব্যাট, কিট, গ্লাভস ইত্যাদি নানান সরঞ্জাম কিন্তু ফুটবলে তুলনামূলক কম সরঞ্জামেই খেলা যায়। আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত সমাজে অনেকেই ক্রিকেটের খরচা বহন করতে পারেন না, তারা অন্য খেলায় ঝুঁকে পড়েন। তারাও নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী নিজের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে চায়, তবে তাদের বেতনে এবং সমর্থনে এত ফারাক কেন?
২০২৬-এ দাড়িয়েও মেয়েরা আজও খেলা থেকে ব্রাত্য রয়ে যাচ্ছে। মেয়েদের নিজের কর্মজীবনকে প্রাধান্য দেওয়া হয় না। ৭০% মেয়েরা ছোটবেলায় খেলা শুরু করলেও দীর্ঘকালে তারা খেলাধুলা চালিয়ে যেতে পারে না। আমাদের দেশে এখনো মেয়েদের উপর ঐতিহ্যগত লিঙ্গ ভূমিকা চাপানো হয়, মেয়েদের থেকে শুধু আশা করা হয় তারা ঘরের কাজ করবে এবং সঠিক সময়ে বিয়ে করে সংসার করবে। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক কলঙ্কও কাজ করে, কুস্তি বা বক্সিংকে ছেলেদের খেলা হিসেবে প্রাধান্য দেওয়া হয়,”দঙ্গল” সিনেমা ছিল তার বাস্তব উদাহরণ। প্রাপ্তবয়স্ক মহিলাদের (৬৫%) অংশগ্রহণে অসম্মতির সর্বাধিক উল্লিখিত কারণ এখন “সময়ের অভাব”, কারণ তারা পেশাগত কাজ এবং গৃহস্থালীর কাজকর্মের পরে খেলায় সময় দিতে পারে না, আবার পুরুষ ক্রীড়াবিদদের তুলনায় পুরস্কারের অর্থ, বেতন এবং কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বৈষম্য বিদ্যমান। এইসব সমস্যা উহ্য করে জাতীয় পর্যায় দেশকে শিরোনাম এনে দিতে পারা কি এতই সহজ? ভারতে কোন প্রতিভারই অভাব নেই, কিন্তু সামাজিক পরিকাঠামোর অভাব, আর্থিক অসহযোগিতা, প্রচারের অভাব ইত্যাদি সমস্যাগুলি একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আর তাই এভাবেই বহু খেলোয়াড় লাইমলাইটের বাইরে গিয়ে হারিয়ে যায়। ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার পাশাপাশি মেয়েদের আন্তর্জাতিক স্তরে ক্রীড়ায় অন্তর্ভুক্তিকরণে চাই সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ, খেলাধুলার পরিকাঠামোগত উন্নয়ন, সমান আর্থিক সহায়তা এবং সমস্ত খেলাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া। বিশেষ রূপে যেখানে ভারত ২০৩৬-এ অলিম্পিক আয়োজন করার কথা ভাবছে, সেক্ষেত্রে আগে এই অন্তর্নিহিত বিষয়গুলির উপর সরকারের দৃষ্টিপাত একান্তভাবে কাম্য।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা শুধুমাত্র স্বীকৃতির নয়, বরং আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির। আমরা যাদের দেখি, তাদেরই বড় করে তুলি আর যাদের দেখি না, তারা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় আমাদের স্মৃতি থেকে। স্মৃতি মান্ধানা বা জেমাইমা রদ্রিগেজ -দের সাফল্য যেমন গর্বের, তেমনই সমান মর্যাদা প্রাপ্য স্বপ্না বর্মণ, বালা দেবীরও। যারা আলোচনার বাইরে থেকেও দেশকে গৌরবান্বিত করেছিলেন কারণ তারাও চেষ্টা করেছিলেন, তারাও পেরেছিলেন।










