একাধিক ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণের পথে কেন্দ্র?

৯ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

​দেশের ব্যাঙ্কিং পরিকাঠামোয় বড়ো ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে নিজেদের সরকারি অংশীদারি ৭৫ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বিবেচনা করছে কেন্দ্র। এই তালিকার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া, পাঞ্জাব অ্যান্ড সিন্ধ ব্যাঙ্ক, ইন্ডিয়ান ওভারসিজ় ব্যাঙ্ক এবং ইউকো ব্যাঙ্ক। এই পদক্ষেপে শুধু অর্থনৈতিক নীতিই নয়, বরং দেশের সার্বিক ব্যাঙ্কিং কাঠামোর ভবিষ্যৎ এবং রাজনৈতিক মহলেও তীব্র আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে।

বর্তমানে এই ব্যাঙ্কগুলিতে সরকারি শেয়ারের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি। যেমন ইউকো ব্যাঙ্কে সরকারের অংশীদারি ৯০ শতাংশের ওপরে রয়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেবি র (SEBI) নিয়ম অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত যেকোনো সংস্থায় অন্তত ২৫ শতাংশ জনসমক্ষে বা পাবলিক শেয়ারহোল্ডিং থাকা বাধ্যতামূলক। যদিও এতদিন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিকে এই নিয়ম থেকে বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছিল, তবে সরকার এবার সেই আইনি ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার দিকে এগোতে চাইছে। এই উদ্দেশ্যে ‘অফার ফর সেল’ (OFS)-এর মতো বাজারমুখী পদ্ধতির মাধ্যমে ধাপে ধাপে সরকারি বিনিয়োগ কিছুটা কমিয়ে শেয়ার বাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য লভ্য করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি অংশীদারি কমিয়ে ৭৫ শতাংশে নামিয়ে আনার অর্থ এই নয় যে সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাঙ্কগুলি সম্পূর্ণ বেসরকারি হয়ে যাবে, কারণ এর ফলে কেন্দ্রের হাতেই সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই পদক্ষেপটি যে পূর্ণাঙ্গ বেসরকারিকরণ বা কৌশলগত বিক্রির পথ সুগম করতে পারে, সে বিষয়ে ওয়াকিবহাল মহল একমত। অতীতে নীতি আয়োগের তরফ থেকেও সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক ও ইন্ডিয়ান ওভারসিজ় ব্যাঙ্কের মতো প্রতিষ্ঠানগুলিকে বেসরকারিকরণের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ফলে বর্তমান এই নীতিগত ভাবনা আগামী দিনে বড়ো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের পূর্বভাস দিচ্ছে।

এই আলোচনার মধ্যে কলকাতার প্রধান কার্যালয়যুক্ত ইউকো ব্যাঙ্কের নাম উঠে আসায় বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে বিশেষ চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। বাংলা তথা পূর্বাঞ্চলের অর্থনীতি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং সাধারণ মধ্যবিত্ত গ্রাহকদের কাছে ইউকো ব্যাঙ্ক একটি দীর্ঘদিনের আস্থার প্রতীক। অতীতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের মার্জার বা একত্রীকরণের সময়ও আঞ্চলিক প্রধান্য খর্ব হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। কেন্দ্রীয় সরকারের এই দীর্ঘমেয়াদী কৌশল বাস্তবায়িত হলে রাজ্যের আর্থিক পরিকাঠামো ও গ্রামীণ ব্যাঙ্কিং সেবায় তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে।

বর্তমান তথ্যানুযায়ী, দেশে এই মুহূর্তে মোট ১২টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক রয়েছে। সরকারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা হলো বিভিন্ন ধাপের সংস্কার ও একত্রীকরণের মাধ্যমে এই সংখ্যাটি কমিয়ে মাত্র ৩ থেকে ৪টিতে নামিয়ে আনা। আইডিবিআই ব্যাঙ্কের বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়ার পর এই পদক্ষেপটি সেই বৃহত্তর ব্যাঙ্কিং সংস্কারেরই একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

একদিকে নীতি আয়োগ ও সরকারের আর্থিক নীতি প্রণেতাদের একাংশের যুক্তি, এর ফলে ব্যাঙ্কের কার্যকারিতা, বাজার মূল্যায়ন এবং মূলধন সংগ্রহের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। অন্যদিকে, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি ও ব্যাঙ্ক ইউনিয়নগুলির কড়া সমালোচনা করে দাবি তুলেছে যে, এটি পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাকে বেসরকারি কর্পোরেটের হাতে তুলে দেওয়ার এক সুনির্দিষ্ট চক্রান্ত। তাদের মতে, সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমলে সাধারণ মানুষের আমানতের নিরাপত্তা এবং জনকল্যাণমূলক ঋণদানের নীতি ব্যাহত হতে পারে।

কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে এখনো এই বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত বা অপরিবর্তনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে বাজার পরিস্থিতি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার চাপ এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক রূপরেখার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সরকারের কাছে এক বড়ো চ্যালেঞ্জ। আগামী দিনে সংসদীয় আইনি সংশোধন এবং রাজনৈতিক বিরোধিতার মুখে এই নীতি কতটা বাস্তবায়িত হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

​

অন্যান্য প্রতিবেদন.