একপাশে বিলাসবহুল বন্যপ্রাণ পর্যটনের চকচকে জগত—শালের বন, জিপ, দেশ-বিদেশের পর্যটকদের দামি ক্যামেরার লেন্স। আর অন্যপাশে অন্ধকার কুঁড়েঘরে নিভে যাওয়া শিশুদের তাজা প্রাণ। মধ্যপ্রদেশের বালাঘাট জেলার বোন্দারি গ্রাম সহ পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে বর্তমানে যে মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে, তা কেবল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ব্যর্থতা নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক অবহেলা ও জনজাতি অধিকার লঙ্ঘনের এক মর্মান্তিক দলিল।
এক নজরে বালাঘাটের বোন্দারি গ্রামকে দেখলে মনে হবে কোনো ক্রান্তীয় স্বর্গরাজ্য। ঢেউখেলানো পাহাড়, দিগন্তবিস্তৃত ধানখেত এবং বিশ্ববিখ্যাত কানহা ব্যাঘ্র প্রকল্পের পর্যটন অর্থনীতি এই অঞ্চলকে অর্থনৈতিক দিক থেকে সমৃদ্ধ মনে করাতে পারে। কিন্তু এই চকচকে অর্থনৈতিক কাঠামোর অন্তরালে রয়েছে এক নির্মম বৈপরীত্য। কানহার অরণ্যকেন্দ্রিক এই পর্যটন শিল্পের লভ্যাংশ বা সুফল কোনোদিনই পৌঁছায়নি এখানকার মূল অধিবাসী আদিবাসীদের কাছে। বরং বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের নামে তাদের জীবন ও জীবিকাকে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে।
গত জুলাই মাসের মধ্যে এইখানে ঘটেছে অসংখ্য শিশুমৃত্যুর ঘটনা৷ এই শিশুমৃত্যুর ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ‘বিশেষভাবে বিপর্যস্ত আদিবাসী গোষ্ঠী’ বা পিভিজিটি (PVTG) তালিকাভুক্ত বাইগা আদিবাসীরা। মৃত শিশুদের মধ্যে অন্তত ৩৫ জনই বাইগা সম্প্রদায়ের। স্বাধীনতার পর থেকেই একের পর এক নীতি এবং বন সংরক্ষণের নামে এই প্রাচীন জনজাতিকে তাঁদের চিরাচরিত অরণ্যের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, উচ্ছেদ করা হয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করা ভূমি থেকে।
স্বাস্থ্য আধিকারিকরা শিশুদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে হাম, ম্যালেরিয়া, পানিবাহিত ই-কোলাই জীবাণু সংক্রমণ কিংবা শ্বাসজনিত অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং সমাজতত্ত্ব উভয় ক্ষেত্রেই এটি স্পষ্ট যে, এই রোগগুলি একা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে না, যদি না তার পেছনে থাকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার চরম পতন। আর এই পতনের মূল কারণ হলো তীব্র অপুষ্টি।
বাইগারা অরণ্যের উৎপাদিত সামগ্রী, কন্দাল ও বনজ খাদ্যের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকত। কিন্তু জঙ্গল থেকে তাদের উচ্ছেদ করার পর এবং বন অধিকার কেড়ে নেওয়ার ফলে তাদের চিরাচরিত খাদ্যাভ্যাসে এসেছে আমূল পরিবর্তন। সরকারি রেশন বা নামমাত্র সহায়তার ওপর নির্ভরশীল এই মানুষগুলি পুষ্টিকর খাবারের অভাবে ধুঁকছে। ফলস্বরূপ, সামান্য সর্দি-কাশি, জ্বর বা ডায়রিয়াও শিশুদের কাছে মারণান্ত্র হয়ে উঠছে। কুন্ডেকসা, মাছুরদা, গাঠিয়া কিংবা মাতলা—বালাঘাটের প্রতিটি গ্রামেই আজ কান্নার রোল, যা আসলে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতারই প্রতিচ্ছবি।
মধ্যপ্রদেশে সরকার এসেছে এবং গেছে, কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলই বাইগা আদিবাসীদের জীবন ও জীবনধারা সংরক্ষণের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ও আন্তরিক কোনো নীতি গ্রহণ করেনি। বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ এবং ইকো-ট্যুরিজমকে যেভাবে জাতীয় অগ্রাধিকারে রাখা হয়েছে, তার বিপরীতে আদিবাসীদের মানবাধিকার এবং বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারের প্রশ্নটি বারবার উপেক্ষিত থেকে গেছে। নীতি নির্ধারকদের খাতায় বাইগারা কেবল পর্যটন অর্থনীতির আড়ালে থাকা এক পরিসংখ্যান মাত্র। তাদের সংস্কৃতি, তাদের পৈতৃক ভূমি এবং তাদের খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষা করার ক্ষেত্রে প্রশাসনের চরম উদাসীনতা আজ তাদের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ময়নাতদন্তের রিপোর্ট না পাওয়া বা সরকারি তথ্যে মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা প্রমাণ করে যে, এই মৃত্যুর দায় এড়াতে প্রশাসনিক স্তরে কতটা মরিয়া চেষ্টা চলছে। কেবল চিকিৎসাকেন্দ্র বা স্বাস্থ্যকর্মীদের সাময়িক উপস্থিতি দিয়ে এই কাঠামোগত সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন আদিবাসীদের হাতে তাদের বনভূমি ও অরণ্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া, তাদের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কানহা অঞ্চলের পর্যটন মডেলের পুনর্বিবেচনা করা—যেখানে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের পাশাপাশি মানুষের জীবনও সমান গুরুত্ব পাবে। অন্যথায়, বাইগা জনজাতির এই নীরব বিনাশ ভারতীয় গণতন্ত্রের নৈতিক ভিত্তির ওপর এক স্থায়ী প্রশ্নচিহ্ন হয়ে থাকবে।

