ক্ষমতায় ছিল বামপন্থা, পূর্ব তিন মেয়াদেও- তবু আজও কেন অধরা “স্বপ্নের ব্রাজিল”?

১৭ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

​লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা ব্রাজিলের রাজনীতিতে এক অবিসংবাদিত ব্যক্তিত্ব। তিনি তাঁর ক্যারিয়ারে তিনটি ভিন্ন মেয়াদে (প্রথম দুই মেয়াদ ২০০৩ থেকে ২০১১ এবং তৃতীয় মেয়াদ ২০২৩ থেকে বর্তমান) ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন। প্রথম দুই মেয়াদের টানা আট বছর এবং পরবর্তীতে দিলমা রুসেফের শাসনকালসহ ব্রাজিলে দীর্ঘ সময় ধরে শ্রমিক পার্টি (Workers’ Party – PT)-র নেতৃত্বাধীন বামপন্থী ও কেন্দ্র-বামপন্থী সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। লুলার আমলে ‘বলসা ফ্যামিলিয়া’ -র মতো যুগান্তকারী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্যসীমার বাইরে নিয়ে আসা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও প্রশ্ন থেকে যায়—এত দীর্ঘ সময় বামপন্থী সরকার ক্ষমতায় থাকার পরেও কেন ব্রাজিল কাঙ্ক্ষিত ‘স্বপ্নের ব্রাজিল’ হয়ে উঠতে পারেনি? কেন ক্ষুধা, দারিদ্র্য এবং গৃহহীনতার মতো মৌলিক সংকটগুলো আজও দেশটির সমাজকে কুরে কুরে খাচ্ছে?

ব্রাজিল বিশ্বের অন্যতম বৈষম্য ব্যবস্থার দেশগুলোর একটি। ঔপনিবেশিক আমল থেকে চলে আসা জমির অসম বণ্টন, বর্ণবাদ এবং সম্পদের কেন্দ্রীভূত মালিকানা এমন এক কাঠামোগত রূপ নিয়েছে যা কেবল কল্যাণমূলক অনুদান বা সাময়িক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে দূর করা সম্ভব নয়। বামপন্থী সরকারগুলো দরিদ্রদের জন্য নগদ সহায়তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করলেও অর্থনীতির মূল ভিত্তি—যেমন বড় বড় ব্যাংকিং খাত, বহুজাতিক কর্পোরেশন এবং বৃহৎ ভূস্বামী গোষ্ঠীর একাধিপত্য ভাঙতে পারেনি। ফলে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার ব্যবধান গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে।
লুলার প্রথম দুই মেয়াদের সাফল্যের মূলে ছিল বিশ্ববাজারে লোহা, সয়াবিন ও তেলসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি বা ‘কমোডিটি বুম’। এই রমরমা বাজারের দৌলতে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা জমা হয়, যা সামাজিক কল্যাণমূলক খাতে ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু এই সময়কালে ব্রাজিল তার অর্থনীতিকে একটি টেকসই, বহুমুখী শিল্পভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে ব্যর্থ হয়।

পরবর্তীতে বিশ্ববাজারে কমোডিটির দাম পতন ঘটলে এবং বৈশ্বিক মন্দা দেখা দিলে ব্রাজিলের অর্থনৈতিক মডেল হোঁচট খায়। অর্থনীতি যখনই স্থবির হয়ে পড়ে, তখনই সামাজিক সুরক্ষার জালগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মানুষ পুনরায় দারিদ্র্যের মুখে পতিত হয়।

ব্রাজিলের রাজনৈতিক ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল এবং খণ্ডিত। পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য লুলার দলকে ঐতিহ্যগতভাবে রক্ষণশীল, ডানপন্থী এবং লবিস্ট দলগুলোর সঙ্গে আপস করতে হয়েছে। বিশেষ করে ব্রাজিলের শক্তিশালী কৃষি লবি এবং শিল্পপতিদের প্রভাব এতটাই প্রবল যে, ভূমিসংস্কার বা প্রগতিশীল কর ব্যবস্থার মতো মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তনগুলো কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। ধনীরা আয়ের অনুপাতে তুলনামূলক কম কর দেয়, অথচ পরোক্ষ করের বোঝা দরিদ্র মানুষের ওপর বেশি পড়ে—এই কর ব্যবস্থার সংস্কারে বামপন্থী সরকারগুলো বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি।

২০১৫-১৬ সালের রাজনৈতিক সংকট, দিলমা রুসেফের অভিশংসন এবং পরবর্তীতে জইর বলসোনারোর অতি-ডানপন্থী আমল ব্রাজিলের অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থাকে বড় ধাক্কা দেয়। কোভিড-১৯ মহামারি পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় করে তোলে। ২০২৩ সালে লুলার তৃতীয় মেয়াদের সূচনা ঘটলেও মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদের হার এবং বেকারত্ব সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিসহ করে রেখেছে।

এর সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায় সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে। সরকারি সামাজিক নিবন্ধনভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ দিকে ব্রাজিলে প্রায় ৩,৬৫,৮২২ জন মানুষ গৃহহীন অবস্থায় রাস্তায় বসবাস করছিলেন। ২০২৬ সালের মে মাসে এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৩,৮৮,৮৫৫ জনে দাঁড়ায়। এতগুলো বছর বামপন্থী শাসন চলার পরও শহরাঞ্চলে গৃহহীনতা এবং বস্তি সংস্কৃতির এই বিস্তার প্রমাণ করে যে, কেবল কল্যাণমূলক নীতির মাধ্যমে আবাসন ও মৌলিক অধিকার পুরোপুরি নিশ্চিত করা যায়নি।

লুলা দা সিলভা এবং ওয়ার্কার্স পার্টির শাসন ব্রাজিলকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে একটি আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠস্বর দিয়েছে এবং কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্যের হাত থেকে রক্ষা করেছে। তবে এটিও সত্য যে, বামপন্থী সরকারগুলো মূলত বিদ্যমান পুঁজিবাদী কাঠামোর ভেতরে থেকে সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু কাঠামোগত বৈষম্যগুলোকে গভীরভাবে চ্যালেঞ্জ বা ধ্বংস করতে পারেনি। ধনী ও অভিজাত শ্রেণির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব অক্ষুণ্ণ রেখে এবং অর্থনীতির বহুমুখী রূপান্তর না ঘটিয়ে কেবল সামাজিক অনুদানের ওপর নির্ভর করায় ব্রাজিল আজও তার কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের দেশে রূপ নিতে পারেনি। দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও গৃহহীনতার এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে প্রয়োজন আরও গভীর কাঠামোগত সংস্কার, কর ব্যবস্থার পুনর্গঠন এবং প্রকৃত ভূমিসংস্কার।

অন্যান্য প্রতিবেদন.