এবছর (২০২৬) চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেলেন কার্ল ডেইসেরথ, পিটার হেজম্যান ও গেয়র্গ নাগল।
উইলিয়াম শেক্সপিয়র লিখেছিলেন, “What’s in a name?”; অর্থাৎ, নামে কি বা এসে যায়! ৫ই অক্টোবর ঘোষণা হয় এই তিন বিজ্ঞানী চিকিৎসাবিজ্ঞান বা শারীরবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন আলোক-নিয়ন্ত্রিত আয়ন চ্যানেল-এ তাঁদের গবেষণা এবং অপটোজেনেটিক্সের (optogenetics) বিকাশে তাঁদের আবিষ্কারের জন্য।

অপটোজেনেটিক্সের কী?
আমাদের মস্তিষ্ক হলো দেহের সবচেয়ে জটিল ও পরিবর্তনশীল কেমিক্যাল বা ইলেকট্রিক্যাল নেটওয়ার্ক মাধ্যম। এইমুহূর্তে যখন আপনি এই প্রতিবেদনটি পড়ছেন, প্রতি সেকেন্ডে আপনার মস্তিষ্কের ৮৬০০ কোটি নিউরন একে অপরের সঙ্গে লক্ষ লক্ষ সংযোগে এই ইলেকট্রিক্যাল নেটওয়ার্ক মাধ্যম তৈরি করছে। এই বিশাল সংখ্যা এবং জটিল আন্তঃসংযোগের কারণে স্নায়বিক রোগ বোঝা, বিশ্লেষণ করা এবং চিকিৎসা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এবং প্রচলিত পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষগুলোকে আলাদা করার মতো নিখুঁত সূক্ষ্মতা নেই বললেই চলে। তাই, অপটোজেনেটিক্স এক বৈপ্লবিক হাতিয়ার হিসেবে উঠে আসে এবং আলোর সাহায্যে নির্দিষ্ট নিউরনগুলিকে বেছে নিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা ও অভ্যন্তরীণ কার্যপ্রণালী উন্মোচন করার সুযোগ করে দেয়।
২০০৬ সালের শেষের দিকে ‘অপ্টোজেনেটিক্স’ শব্দটি প্রথম Journal of Neuroscience-এ প্রকাশিত হয়, একটি পর্যালোচনামূলক প্রবন্ধে। সেখানে Optogenetics-কে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল স্নায়বিক সার্কিটে “জিনগত লক্ষ্যনির্ধারণ এবং আলোকীয় নিয়ন্ত্রণের সমন্বয়” (fusion of genetic targeting and optical control in neural circuits) হিসেবে। সহজভাবে বললে, বিজ্ঞানীরা এমন একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করে দিয়েছেন—যার সাহায্যে আলো ব্যবহার করে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষের কার্যকলাপ চালু বা বন্ধ করা যায়। এই পদ্ধতিই হলো অপ্টোজেনেটিক্স, যেখানে জিনগত কৌশলে নির্দিষ্ট কোষের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
তাঁদের ভূমিকা?
প্রথমত, পিটার হেজমান, Chlamydomonas নামের এককোষী সবুজ শৈবাল কীভাবে আলোর উৎসের দিকে সাঁতার কাটে, তা নিয়ে গবেষণা করেন। এই গবেষণা থেকেই আলোক-সংবেদনশীল প্রোটিন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া যায়। এরপর জর্জ নাগেল কাজ করেন আলোর সংকেত কীভাবে বৈদ্যুতিক সংকেতে পরিণত হয়, এই নিয়ে। হেগেমানের সঙ্গে কাজ করে ইনি channelrhodopsin নামের আলোক-সংবেদনশীল প্রোটিনের কার্যপদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করেন। নীল আলো পড়লে এই প্রোটিনের মধ্য দিয়ে আয়ন চলাচল করতে পারে, ফলে কোষের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ পরিবর্তিত হয়। এরপর কার্ল ডেইসেরথ এই আবিষ্কারকে মস্তিষ্ক গবেষণায় ব্যবহার করেন। তিনি এবং তাঁর সহযোগীরা মিলে এই প্রোটিনের জিন স্নায়ুকোষে প্রবেশ করিয়ে দেখান যে আলো ব্যবহার করে স্নায়ুকোষের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ডেইসেরথ ও তাঁর সহকর্মীরাই Optogenetics শব্দটি—Optics (আলোকবিজ্ঞান) এবং Genetics (জিনতত্ত্ব)—এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে ব্যবহার করেন। এবং এভাবেই অপ্টোজেনেটিক্স আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানের একটি শক্তিশালী গবেষণা পদ্ধতি হয়ে ওঠে।
তাঁদের সাফল্যের তাৎপর্য কী? এবং এরপর-
মস্তিষ্কের জটিল কার্যপ্রণালি বোঝার ক্ষেত্রে অপ্টোজেনেটিক্স বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গিতে এক নতুন দিশারী। ভবিষ্যতে অপ্টোজেনেটিক্স স্নায়বিক রোগের গবেষণা ও চিকিৎসার নতুন পথ দেখাতে পারে। বিশেষত, বয়স্ক মানুষের মধ্যে দেখা দেওয়া বিভিন্ন স্নায়বিক সমস্যার কার্যপ্রণালি বুঝতে এবং সম্ভাব্য চিকিৎসাপদ্ধতি বিকাশে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে গবেষণাগারে এর সাফল্যকে সরাসরি চিকিৎসাক্ষেত্রে প্রয়োগ করা এখনও হাতের মুঠোয় নেই। তাই এই প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন আরও গবেষণা, ভিন্নদেশীক যৌথ উদ্যোগে নিরাপত্তা যাচাই এবং বিজ্ঞানভিত্তিক স্বাস্থ্যনীতির সমন্বয়। বিজ্ঞানের অগ্রগতি তখনই প্রকৃত অর্থে সার্থক হয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
ভিন্ন দেশ, ভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং ভিন্ন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি একত্রিত হয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে এমন যুগান্তকারী প্রযুক্তির আবিষ্কার তাঁদের সাফল্যের মূল তাৎপর্য। বিজ্ঞানের অগ্রগতি সব সময় কোনও একক গবেষণাগার বা গবেষকের প্রচেষ্টায় আসে না। একইভাবে এই সহযোগিতামূলক যৌথ উদ্যোগ কেবল তিন বিজ্ঞানীর সম্মিলিত অবদানে সীমাবদ্ধ নয়। কীভাবে জীববিদ্যা-ও-পদার্থবিদ্যার মৌলিক আবিষ্কার জিনগত প্রকৌশল এবং স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণাপদ্ধতি একত্রিত হয়ে বিজ্ঞানের একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে, তা প্রমাণ করে, মৌলিক বৈজ্ঞানিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কতটা কার্যকর হতে পারে। মস্তিষ্কের প্রতিটি রহস্যের উন্মোচন আমাদের স্নায়ুতন্ত্র সম্পর্কে জ্ঞানকে আরও গভীর করে তুলছে। তবে গবেষণাগারে অর্জিত এই জ্ঞানকে বাস্তব জীবনে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোই এখন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

