সরা স্বর্গ তাহেরপুর

১১ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

মাটি পুতুলের জন্য যেমন নদিয়ার কৃষ্ণনগর বিখ্যাত। বর্ধমানের নতুনগ্রাম যেমন কাঠের তৈরি পুতুলের প্রধান কেন্দ্র। ডোকরার জন্য বাঁকুড়ার বিকনার জনপ্রিয়তা যেমন গোটা বাংলায়। ঠিক তেমনই চিত্রিত মা লক্ষ্মী সরার জন্য নদিয়ার তাহেরপুরের খ্যাতি আজকে গোটা রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। তাহেরপুরে প্রায় চোদ্দ-পনেরো ঘরের মতো মৃৎশিল্পীদের পরিবার রয়েছে যারা বাংলার এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিল্প সম্ভারের ধারাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। কৃষ্ণনগরের কাছেই অবস্থিত তাহেরপুর। সারা বছর এখানে পোড়ামাটির জিনিসপত্র তৈরীর পাশাপাশি মা লক্ষ্মীর চিত্রিত লক্ষ্মীসরা তৈরি হয়ে থাকে। এখান থেকেই তৈরি হওয়া বিভিন্ন শৈলীর লক্ষ্মীসরা বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে থাকে।

এখানকার মৃৎশিল্পীদের আদি বাসস্থান পূর্ববঙ্গের (অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশের) ফরিদপুরে। তাহেরপুরের ২৬ নম্বর এ ব্লক পাল পাড়ার প্রবীণ শিল্পী রতন পালের (বর্তমান বয়স ৬২) কথায় ১৬ বছর বয়স থেকে মা লক্ষ্মীর সরা তিনি তৈরি করে চলেছেন। পিতা রাধাবল্লভ পালের কাছে সরা তৈরির হাতেখড়ি। বর্তমানে তার তৈরি লক্ষ্মী সরা পশ্চিমবঙ্গ সহ অসমের তিনসুকিয়া, লামডিং, ডিব্রুগড়, গুয়াহাটিতে যায়। সরার চরিত্র বিন্যাস সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি জানিয়েছেন যে সরার মধ্যে যদি শুধু মা লক্ষ্মী থাকে তাহলে তাকে এক পুতুলি সরা বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ সরার মধ্যে যতগুলি দেব – দেবী চরিত্র থাকবে সেগুলোকে পুতুল বা পুতুলি হিসেবে ধরা হবে। এ ক্ষেত্রে সরার মধ্যে অঙ্কিত পেঁচাকে পুতুলের আওতার বাইরে রাখা হবে। যদি সরার মধ্যে লক্ষ্মী- নারায়ণ থাকে তা হলে তাকে দুই পুতুলি সরা বলা হয়। আবার জয়া ও বিজয়ের মধ্যবর্তী স্থানে মা লক্ষ্মীর অঙ্কিত সরাকে তিন পুতুলি সরা বলা হয়ে থাকে। যে সরার মধ্যবর্তী স্থানে রাধা কৃষ্ণ থাকে এবং তার তলার প্যানেলে জয়া ও বিজয়ার মাঝে মা লক্ষ্মী বিরাজ করে সেই ধরনের সরাকে পাঁচ পুতুল সরা হয়।

দুই পুতলি সরা

ঠিক একই শৈলীর আরো একটি সরা রয়েছে যেখানে সরার একেবারে ওপরে বিরাজ করেন রাধা কৃষ্ণ, সরার মধ্যবর্তী স্থানে জয়া ও বিজয়ার মাঝে বিরাজ করেন মা লক্ষ্মী। এই শৈলী সরাকে পাঁচ পুতুল হিসেবে অভিহিত করা হয়। আবার দুর্গা সরাকে ছয় পুতুলি সরা হিসেবে গণ্য করা হয়। মা দুর্গা, লক্ষ্মী, কার্তিক, গণেশ, সরস্বতী গোটা সরার মধ্যবর্তী স্থান জুড়ে বিরাজ করে থাকে। এই সরার ঠিক তলার প্যানেলে মা লক্ষ্মী থাকেন। তাই এই সরাকে ছয় পুতুলি সরা বলা হয়ে থাকে। মহিষাসুর, সিংহ সহ অন্যান্য বাহনদের পুতুলের আওতায় আনা হয় না। একটা বছরে প্রায় ১৫ হাজার সরা তৈরি করেন রতন পাল। সরার তৈরির কাজ অগ্রহায়ণ মাস থেকে শুরু হয়ে যায়। শেষ হয় ভাদ্র মাসে। কিছু মৃৎশিল্পী রয়েছে যারা বৈশাখ মাস থেকে কাজ শুরু করে।

সরা অঙ্কনের ক্ষেত্রে গুঁড়ো রঙ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সরা তৈরীর ক্ষেত্রে প্রথমেই ভালো করে মাটি ছেনে নিতে হয়। তারপর সেটির মন্ড বানিয়ে ধীরে ধীরে পিটিয়ে নিতে হয়। এরপর তাকে সরার রূপ দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ার শেষে ঘরে এবং রোদে দুই ভাবেই সরাগুলোকে শুকোতে দেওয়া হয়। তারপর চলে পোড়ানোর প্রক্রিয়া। এর পরবর্তী পর্যায়ে সরাকে পুনরায় ঘষে নেওয়া হয়। যাতে করে সরার শরীর অঙ্কনের জন্য সহায়ক হয়। তারপর খড়ি মাটির প্রলেপের পরে রঙের কাজ শুরু হয়। দ্রুত লয়ে তুলির টানে চলতে থাকে সরা অঙ্কনের কাজ। দীর্ঘ দশকের সাধনা শিল্পীর হাতের আঙুলগুলোকে দক্ষ করে তোলে। আর সেই দক্ষতার জেরে দ্রুতলয় চলতে থাকে তুলির টান। আর সেই প্রক্রিয়া দেখার সৌভাগ্য প্রতিবেদকের হয়েছে। এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল রতন পাল জাতিতে কুম্বকার পাল।

সরা হাতে কুম্ভকার

তাহেরপুর পালপাড়ার এ ব্লক ২৮ নম্বরের অপর এক মৃৎশিল্পী গোবিন্দ পালের কথায় পাঁচ থেকে ছয় রকমের মা লক্ষ্মী সরা তৈরি হয়ে থাকে। যে সরাটি খুব কম তৈরি হয় সেটি হল লক্ষ্মী-সরস্বতী সরা। অর্থাৎ একই সরার মধ্যে বিরাজ করেন মা লক্ষ্মী ও সরস্বতী। অপর একটি সরা যার চাহিদা একেবারে তলানির দিকে সেটি হল গজলক্ষ্মী সরা। অর্থাৎ হাতির পিঠে বসে রয়েছেন মা লক্ষ্মী। তার দুই দিকে জয়া ও বিজয়া। গোবিন্দ পাল আরো জানিয়েছেন সরা তৈরীর ক্ষেত্রে দোআঁশ মাটি ব্যবহার করা হয়। এই মাটির ওপর রঙ করতে সুবিধে হয়। বছরের ১০ থেকে ১২ হাজার সরা তিনি তৈরি করে থাকেন। গোবিন্দ পাল তার তৈরি দুর্গা সরাকে ” নবদুর্গা ” সরা বলে থাকেন।

তুলির টানের এই দ্রুতলয়তা দেখতে পাওয়া যায় মৃৎশিল্পী সুকুমার পালের কাজে। প্রায় ৪২ বছর ধরে অর্থাৎ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সাত থেকে আট রকমের মা লক্ষ্মী সরা তৈরি করে চলেছেন তিনি। তাহেরপুরের টালির ভাটায় নিবাসী এই শিল্পী পরবর্তী তরুণ প্রজন্মেদের মধ্যেও এই শিল্পের ধারা যাতে বিকশিত হতে পারে সেই জন্য নিরন্তন কাজ করে চলেছেন। তার ঘর ভর্তি সরা দেখে মন মুগ্ধ হয়ে যায়। এই বিপুল কর্মযজ্ঞে সহধর্মিনী এবং পরিবারের সকলে তাকে সাহায্য করেন।

পাঁচ পুতলি সরা

উল্লেখ করা যেতে পারে পশ্চিমবঙ্গের লোকশিল্প ও শিল্পীর সমাজ গ্রন্থে সরাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তারাপদ সাঁতরা লিখেছেন, কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো ছোট বড় নানা আকৃতির সরা তৈরি হয়ে থাকে। এই সরাগুলির ব্যাশ ২৫ থেকে ৭৫ সেন্টিমিটার। পূর্ববঙ্গের ঢাকা, বরিশাল, ফরিদপুরে লক্ষ্মী সরা শিল্পের প্রচলন ছিল। দেশভাগের পর সরা শিল্পীরা নদিয়া আর অবিভক্ত ২৪ পরগনা জেলায় চলে আসে। সরার পিঠটা হয় সামান্য উত্তল কচ্ছপের মতো। অঞ্চলভেদে সরার একাধিক নামও রয়েছে যেমন সুরেশ্বরী সরা, ঢাকাইয়া সরা। মূলত কুম্ভকার পালেরা সরা তৈরি করে থাকেন। বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে আচার্য ব্রাহ্মণেরা সরা অঙ্কন করত বলে সেই সকল সরাগুলিকে আচার্যি সরা বলা হয়ে থাকে। দীপঙ্কর পাড়ুই এর গ্রন্থ বাংলার সরা থেকে জানা যায় যে তাহেরপুর পাল পাড়ায় একটা সময় ৬০ থেকে ৬৫টি পরিবার মা লক্ষ্মী সরা তৈরি করতেন। সেই সংখ্যাটা পরে কুড়ি থেকে পঁচিশে নেমে আসে।

অন্যান্য প্রতিবেদন.