“আপনি কে?” – প্রশ্ন দেশের উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ-সমাজকর্মী জঁ দ্রেজ কে!

৭৯ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

গত ১০ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ভারতের রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তর এলাকায় এক আকস্মিক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র ব্যানারে ভোটার তালিকা সংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দিতে গিয়ে দিল্লি পুলিশের হাতে আটক হন দেশের বিশিষ্ট উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ও সমাজকর্মী জঁ দ্রেজ । এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। তবে এই আটকের থেকেও বেশি আলোচনার জন্ম দেয় প্রতিবাদ চলাকালীন একটি বিশেষ মুহূর্ত, যেখানে পুলিশকর্মী এবং এক সংবাদকর্মী তাঁকে চিনতে না পেরে প্রশ্ন করেন, “আপনি কে?” এবং “কোথা থেকে এসেছেন?” এই কথোপকথনের ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায় এবং জাতীয় স্তরে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করে।


যন্তর মন্তরের এই প্রতিবাদ সমাবেশে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ভোটার তালিকার ত্রুটি নিয়ে সোচ্চার হয়েছিলেন কর্মীরা। সেখানে সাধারণ নাগরিকের বেশে উপস্থিত থাকা জঁ দ্রেজকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং মিডিয়া কর্মীরা প্রাথমিকভাবে চিনতে ব্যর্থ হন। ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতি, জনকল্যাণ এবং ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বিমোচনে যাঁর আজীবন অবদান রয়েছে, তাঁকে যখন প্রকাশ্য রাস্তায় পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন করা হয়, তখন তা এক ধরণের বিদ্রূপাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। সোশাল মিডিয়ায় এই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বুদ্ধিজীবী মহল ও সাধারণ মানুষ তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। অনেকেই একে দেশের নীতিনির্ধারক ও চিন্তাবিদদের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক অজ্ঞতা ও ঔদ্ধত্যের প্রতীক হিসেবে দেখছেন। সমালোচকরা বলছেন, যিনি ভারতের কোটি কোটি মানুষের অন্ন ও অধিকারের আইনি ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন, রাষ্ট্রযন্ত্র তাঁকে না চিনেই আটক করেছে।

জঁ দ্রেজ


১৯৫৯ সালের ২২ জানুয়ারি বেলজিয়ামের ল্যুবেন (Leuven) শহরে জন্মগ্রহণ করেন জঁ দ্রেজ৷ তাঁর পিতা জাক দ্রেজ ছিলেন বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ। শিক্ষাজীবন শেষ করে ১৯৭৯ সালে প্রথম ভারতে আসেন জিন ড্রিজে। এরপর নয়ডার ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। ২০০২ সালে তিনি তাঁর জন্মসূত্রে প্রাপ্ত বেলজিয়ামের নাগরিকত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে ত্যাগ করেন এবং ভারতের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। এরপর থেকে তিনি ভারতের ঝাড়খণ্ডসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করে সাধারণ মানুষের অধিকার ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কাজ করে চলেছেন। ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবন সংগ্রাম তাঁর গবেষণার মূল কেন্দ্রবিন্দু।


জঁ দ্রাজে কেবল একজন তাত্ত্বিক অর্থনীতিবিদ নন, তিনি ভারতের আধুনিক সমাজকল্যাণ কাঠামোর অন্যতম প্রধান স্থপতি ও রূপকার। ভারতের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন সুরক্ষায় যে কয়েকটি ঐতিহাসিক আইন ও নীতি রয়েছে, তার প্রায় প্রতিটির সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত তাঁর নাম।


​তাঁর প্রত্যক্ষ অবদান রয়েছে মহাত্মা গান্ধী গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইন (MGNREGA), তথ্য অধিকার আইন (RTI) এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা আইন (NFSA) তৈরিতে। গ্রামীণ ভারতের প্রতিটি পরিবার যাতে বছরে অন্তত ১০০ দিনের কাজের আইনি অধিকার পায় এবং খাদ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত হয়, সেই লড়াইয়ের সামনের সারিতে ছিলেন তিনি। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের যৌথ গবেষণা ও বই লেখালেখির কাজ ভারতের জনকল্যাণ নীতি গঠনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। ক্ষুধা, অপুষ্টি, প্রাথমিক শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে তাঁর কাজ নীতিনির্ধারকদের বাধ্য করেছে জনকল্যাণমূলক বাজেট বাড়াতে।


সাম্প্রতিক সময়ে, ২০২৬ সালের ৫ জুন ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব বৈষম্য সম্মেলনে (World Inequality Conference) তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ ‘গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড’ (GiRA)-এ ভূষিত করা হয়। বিশ্বজুড়ে বৈষম্য দূরীকরণ এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তাঁর এই অবদান বিশ্বমঞ্চে প্রশংসিত হয়েছে।


যন্তর মন্তরের ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, অনেক সময় রাষ্ট্রযন্ত্র সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর রোধ করতে গিয়ে এমন ব্যক্তিদেরও মুখোমুখি হয়, যাঁদের চিন্তাভাবনা ও কাজের ফলস্বরূপ এই দেশের আইনি ও সামাজিক পরিকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে। জিন দ্রাজের আটক হওয়া এবং তাঁকে না চেনার ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি আমাদের দেখায় যে বর্তমান সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নাগরিক অধিকার ও প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর কতটা সংকটের মুখে।

অন্যান্য প্রতিবেদন.