সম্প্রতি কলকাতার নগর উন্নয়ন দপ্তরের নির্দেশিকা ও উদ্যোগে শহরের ঐতিহ্যবাহী ও গুরুত্বপূর্ণ ফ্লাইওভার এবং ব্রিজগুলিকে নানা রঙে রাঙিয়ে তোলার নান্দনিক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত এক গভীর বৈজ্ঞানিক অসচেতনতা ও জনসুরক্ষার প্রতি চরম উদাসীনতার জন্ম দিচ্ছে৷
বিজ্ঞান বলে, রঙের ব্যবহার কেবল চোখের শান্তি বা সৌন্দর্যের বিষয় নয়, এর সঙ্গে সরাসরি মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং দৃষ্টিশক্তির নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। ট্রাফিক সিগন্যাল বা রাস্তাঘাট নির্মাণে রং ব্যবহারের পেছনে সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে। কনক্রিটের স্বাভাবিক ধূসর রং আলোর অতিরিক্ত প্রতিফলন বা রিফ্লেকশন নিয়ন্ত্রণ করে। এর ফলে রাতের আলোয় বা প্রখর রোদে চালকের চোখ ধাঁধিয়ে যায় না এবং দূরের বস্তু, সিগন্যাল বা পথচারী অত্যন্ত স্পষ্ট ও নির্ভুলভাবে চালকের গোচরে আসে। একে অপটিক্যাল ব্যালেন্স বলে।

কিন্তু নগর উন্নয়ন মন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা অগ্নিমিত্রা পল-এর দপ্তরের তরফ থেকে শহরের ফ্লাইওভার ও সেতুগুলিতে যে রঙবেরঙের কারুকার্য বা উজ্জ্বল রঙের প্রলেপ দেওয়া হচ্ছে, তা এই প্রাকৃতিক অপটিক্যাল ব্যালেন্সকে সম্পূর্ণ ওলটপালট করে দিচ্ছে। যখন একটি ব্রিজের কংক্রিট স্ট্রাকচারকে উজ্জ্বল বা একাধিক চটকদার রঙে রাঙানো হয়, তখন তা গাড়ির হেডলাইটের আলো বা প্রাকৃতিক আলোকে তীব্রভাবে প্রতিফলিত বা প্রতিসৃত করে। এর ফলে চালকের চোখে এক ধরনের ‘অপটিক্যাল ইলিউশন’ বা দৃষ্টিভ্রম তৈরি হয়। চালকের ফোকাস নষ্ট হয়, চোখের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং দীর্ঘক্ষণ একটানা গাড়ি চালানোর পর এই কৃত্রিম দ্যুতি চোখের সাময়িক অন্ধত্ব বা ক্লান্তি ডেকে আনে।
প্রশ্ন উঠছে, সৌন্দর্যায়ন কি মানুষের জীবনের চেয়েও দামি? প্রতিদিন হাজার হাজার গাড়ি যে সেতুগুলোর ওপর দিয়ে তীব্র গতিতে যাতায়াত করে, সেখানে এই ধরনের চাক্ষুষ বিভ্রান্তি বা দৃষ্টির বিভ্রাট সরাসরি বড় ধরণের পথ দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। ট্রাফিক সুরক্ষার মৌলিক নীতিগুলোকে পাশ কাটিয়ে কেবল রাজনৈতিক ফায়দা তোলা বা শহরকে কৃত্রিম রঙে মুড়ে ফেলে ‘ভিজ্যুয়াল আপগ্রেডেশন’-এর যে হিড়িক রাজনৈতিক প্রশাসনে দেখা যাচ্ছে, তা মূলত অপরিকল্পিত নগর ভাবনারই পরিচায়ক। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপ বা উন্নত বিশ্বের আধুনিক নগর পরিকল্পনা যখন কংক্রিটের স্বাভাবিক রূপ ও তার রিফ্লেক্টিভ ইনডেক্সকে অগ্রাধিকার দিয়ে রাস্তাঘাট ডিজাইন করে, তখন কলকাতার মতো জনবহুল মহানগরীতে ফ্লাইওভারের গায়ে এই শৈল্পিক আগ্রাসন অত্যন্ত বিপজ্জনক।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই ধরণের পদক্ষেপের নেপথ্যে রয়েছে এক ধরণের প্রোপাগান্ডামূলক রাজনীতি—যেখানে মাটির নিখাদ সমস্যা বা সুরক্ষার মূল দিকগুলি এড়িয়ে চটকদার দৃশ্যমান পরিবর্তনকে ‘উন্নয়ন’ বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলে। একে এক ধরণের ‘এস্থেটিক পপুলিজম’ বা নান্দনিক জনতুষ্টিবাদ বলা চলে, যা সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় শহরকে সাজানোর নাম করে আদতে পরোক্ষভাবে নাগরিক নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদী জনস্বার্থ এবং নগর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে এই ধরনের খামখেয়ালি ও অপবিজ্ঞানসম্মত রূপসজ্জার সিদ্ধান্ত অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

