আদানিকে বাংলা সঁপে দিয়ে কোন পথে ভবিষ্যৎ?

৪৫ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

​পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট এক ঐতিহাসিক পালাবদলের মুখে দাঁড়িয়ে। রাজ্য সরকারের হাতবদলের পর নিউটাউনের যে জমিতে একসময় আইটি হাব বা সিলিকন ভ্যালি গড়ার স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, আজ সেই জমিতেই শিল্পপতি গৌতম আদানির হাতে মেগা প্রজেক্ট তুলে দেওয়ার ঘটনায় রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক চর্চা।
​২০১৮ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি সিলিকন ভ্যালি উদ্বোধনের সময় লক্ষাধিক কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু নিউটাউনের প্রায় ২,৮০০ একর জমির মধ্যে মাত্র ৪২টি কোম্পানিকে নামমাত্র জমি দেওয়া সম্ভব হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত সক্রিয় হয় মাত্র ৫টি কোম্পানি। আইটি শিল্পের সেই উচ্চাশা বাস্তবে রূপ না নেওয়ায়, বর্তমান প্রশাসন সেই সিলিকন ভ্যালির একাংশেই আদানি গোষ্ঠীকে ২ হাজার শয্যার হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ গড়ার অনুমতি দিয়েছে। প্রশাসনিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অতীতে যেখানে কাঙ্খিত বিনিয়োগ আসেনি, সেখানে আদানি গোষ্ঠীর এই প্রবেশ রাজ্যের অর্থনীতিতে নতুন মোড় এনেছে।


​বৃহস্পতিবার নিউটাউনে আদানির হাসপাতালের শিলান্যাস অনুষ্ঠানে গৌতম আদানি আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা ঠিকা বিনিয়োগের জোরালো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই বিশাল বিনিয়োগের পরিধি কেবল স্বাস্থ্যক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, এর মধ্যে রয়েছে সমুদ্র বন্দর, আধুনিক ডেটা সেন্টার এবং নতুন রোপওয়ে প্রকল্প, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সংবহন থেকে বন্টন ব্যবস্থা এবং রাস্তাঘাট ও সেতু নির্মাণ।


কল্যাণীতে নতুন বিমানবন্দর গড়ার কাজে আদানি গোষ্ঠীকে যুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।রাইটার্স বিল্ডিংয়ের সংস্কার কাজ এবং ইউনেস্কো স্বীকৃত দুর্গাপুজোকে আন্তর্জাতিক স্তরে তুলে ধরতে আদানি গোষ্ঠীর সহযোগিতা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার৷
​এই পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বিতর্কিত দিকটি হলো রাজ্যের প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রতীক রাইটার্স বিল্ডিংয়ের সংস্কারের মতো কাজ সরাসরি বেসরকারি কর্পোরেট হাতের তুলে দেওয়া। অতীতে যেখানে এই ধরনের ঐতিহাসিক ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ রাজ্য দপ্তরের মাধ্যমেই হতো, এবার প্রায় ২০০ কোটি টাকার খরচের জন্য আদানিদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে সরকারকে। বাম জমানার অবসান ঘটিয়ে গত ১৫ বছরের প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং শিল্পের বদলে ‘ভাতা ও তোষণ’-এর সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে বর্তমান সরকার এখন বেসরকারি শিল্পপতিদের ওপরই ভরসা রাখছে।


​বিতর্ক সত্ত্বেও আদানি গোষ্ঠীর তরফে সমাজকল্যাণমূলক কিছু প্রতিশ্রুতির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ৪ হাজার কোটি টাকার এই বিনিয়োগে নির্মিতব্য হাসপাতালের ৫০ শতাংশ অর্থাৎ ১ হাজার শয্যা আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী তিন বছরের মধ্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ১০ হাজার কর্মসংস্থান হবে বলে দাবি করা হচ্ছে। অতীতে তাজপুর বন্দর প্রকল্প নিয়ে নানা জটিলতা তৈরি হলেও, বর্তমান প্রশাসনের হাত ধরে পূর্ব মেদিনীপুর সহ গোটা রাজ্যে আদানি গোষ্ঠীর শেকড় যে আরও গভীরভাবে বিস্তার লাভ করছে, তা বলাই বাহুল্য।


​পরিশেষে বলা যায়, পশ্চিমবঙ্গের শিল্প মানচিত্র আজ এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে আইটি হাব বা সিলিকন ভ্যালির ব্যর্থ প্রতিশ্রুতি এবং অন্যদিকে দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পপতির হাতে সমুদ্র বন্দর থেকে শুরু করে প্রশাসনিক ঐতিহ্য তুলে দেওয়ার এই প্রবণতা রাজ্য রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে। কর্মসংস্থানের তীব্র সংকটে ভোগা বাংলার মাটিতে এই বৃহৎ কর্পোরেট বিনিয়োগ শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন আনতে পারবে, নাকি জনমানসে দীর্ঘমেয়াদী প্রশ্নচিহ্ন রেখে যাবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
​

অন্যান্য প্রতিবেদন.