বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতি ও সমাজমাধ্যমে শুরু হয়েছে এক তীব্র সংঘাত। বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু—বাঙালির ভুরিভোজের ঐতিহ্য বনাম উত্তর-ভারতীয় ‘নবরাত্রি’ উদযাপনের নিরামিষ প্রথা। মধ্যপ্রদেশের বাগেশ্বর ধামের প্রধান ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রীর (বাগেশ্বর বাবা) এক বিতর্কিত মন্তব্য এবং তার প্রেক্ষিতে রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের বিপরীত অবস্থান এই ধর্মীয়-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে প্রকাশ্য দিবালোকে নিয়ে এসেছে।
হাওড়ার লিলুয়ায় এক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এসে ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী আবেদন জানান যে, দুর্গাপুজো ও নবরাত্রির সময় মণ্ডপের আশেপাশে আমিষ খাবার বিক্রি ও খাওয়া বন্ধ করা উচিত। এর কিছুদিন আগেই বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (VHP)-ও প্যান্ডেলের কাছাকাছি আমিষ পদ না রাখার পরামর্শিকা জারি করেছিল। কিন্তু বাগেশ্বর বাবা আরও এক ধাপ এগিয়ে এই সময়ে আমিষভোজীদের “পাষণ্ড” বা অধার্মিক বলে আখ্যা দিলে সাধারণ বাঙালি হিন্দু সমাজের একাংশ ও বঙ্গীয় সাংস্কৃতিক মহলে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়।
বাগেশ্বর বাবার এই ‘উত্তর-ভারতীয় নীতি পুলিশি’র বিরুদ্ধে রাজ্য রাজনীতি উত্তপ্ত হতেই বিপাকে পড়ে বঙ্গ বিজেপি। কারণ, বিরোধীরা—বিশেষ করে তৃণমূল কংগ্রেস—তৎক্ষণাৎ বিজেপির বিরুদ্ধে “বহিরাগত সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া” এবং “বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে হস্তক্ষেপের” অভিযোগ তোলে।
বাঙালি ভোটব্যাঙ্ক ও সাংস্কৃতিক সেন্টিমেন্ট রক্ষা করতে আসরে নামতে হয় রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যকে। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বাগেশ্বর বাবার অবস্থানকে তার “ব্যক্তিগত মতামত” বলে খারিজ করেন এবং জানান, বহিরাগত কোনো ধর্মীয় প্রচারক বাঙালির পাতের পদ ঠিক করে দিতে পারেন না। তিনি স্বামী বিবেকানন্দের উদাহরণ টেনে স্মরণ করিয়ে দেন যে, বাংলায় শাক্ত ধর্মে বলির মাংস এবং কালীপুজোয় পাঠা বলির দীর্ঘ প্রাচীন ঐতিহ্য রয়েছে। শমীক বাবু সাফ জানান, “অষ্টমীতে লুচি আর নবমীতে পাঁঠার মাংস খাওয়া বাঙালির পরম্পরা, বাঙালি তা খাবেই”। বিজেপি নেতা তথা প্রাক্তন রাজ্যপাল তথাগত রায়ও স্পষ্ট জানিয়ে দেন, নিজের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে তিনি কারও কাছে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নন।
এই ঘটনাটি হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির একটি গভীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে আলোকপাত করে। বিজেপি কেন্দ্রীয়ভাবে যে সর্বভারতীয়, ‘বৈষ্ণবীয়’ বা সতাতনী হিন্দুত্বের প্রচার চালাতে চায়, তার সঙ্গে বাংলার ‘শাক্ত’ ঐতিহ্যের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বঙ্গ বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব একদিকে রাজ্যজুড়ে জমি শক্ত করতে বাগেশ্বর বাবার মতো বিপুল জনপ্রিয় ধর্মীয় বক্তাদের মঞ্চ করে দিচ্ছে। কিন্তু সেই হিন্দুত্ববাদী প্রচারের জাঁতাকলে যখন বাঙালির নিজস্ব খাদ্যাভ্যাস ও ‘উৎসবের আনন্দ’ পিষে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে, তখন বঙ্গ বিজেপিকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থেই সেই সনাতনী নিদানের বিরোধিতা করতে হচ্ছে। উত্তর-ভারতীয় নবরাত্রির নিরামিষ শাসন যখনই বাঙালির সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে, তখনই তীব্র প্রতিরোধ তৈরি হচ্ছে। ফলস্বরূপ, ভোটের রাজনীতি সামলাতে খোদ বিজেপি নেতৃত্বকেও ধর্মীয় প্রবক্তাদের পথ ছেড়ে বাঙালির পাঁঠার মাংস ও ইলিশ-মাছের থালার পাশেই অবস্থান নিতে হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, এই বিতর্কটি স্পষ্ট করে দেয় যে ভূ-রাজনৈতিক সীমানা অতিক্রম করে একক কোনো ধর্মীয় প্রথাকে সমগ্র ভারতের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সহজ নয়। ভারতবর্ষের ধর্মীয় বৈচিত্র্যের মূল শক্তিই হলো এর আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও বহুত্ববাদ। দুর্গাপুজো বাঙালির কাছে শুধু শাস্ত্রীয় উপাচার নয়, এটি মিলন ও আনন্দের মহোৎসব, যেখানে নিজস্ব ঐতিহ্য ও রন্ধনশিল্প অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। ভোটের সমীকরণ বা সর্বভারতীয় হিন্দুত্বের এজেন্ডা যা-ই থাক না কেন, বঙ্গ রাজনীতির এই মেরুকরণ প্রমাণ করে যে বাঙালি তার সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য এবং খাদ্যাভ্যাসের স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে কখনোই প্রস্তুত নয়।

