গত ২৭ আগস্ট গুজরাটের আহমেদাবাদে যা ঘটেছে, তা কেবল কিছু তরুণের ওপর শারীরিক নিগ্রহের ঘটনা নয়; এটি ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে সহনশীলতার চরম অবক্ষয়ের চিত্র । ৪০-৫০ জন উৎসাহী ছাত্রছাত্রী একটি পাবলিক বুক রিডিং সেশনে একত্রিত হয়েছিলেন। তাঁদের পঠনপাঠনের তালিকায় ছিল মালালা ইউসুফজাইয়ের আত্মজীবনী ‘আই অ্যাম মালালা’, আনা ফ্র্যাঙ্কের ঐতিহাসিক ডায়েরি, এবং ভগৎ সিং, বি আর আম্বেদকর ও জওহরলাল নেহেরুর মতো দূরদর্শী ভারতীয় মনীষীদের লেখা। কিন্তু বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (VHP) ও বজরং দলের লোকেরা এই শান্ত্বিপূর্ণ ও শিক্ষামূলক আয়োজনের উপর চড়াও হয়। অভিযোগ তোলা হয়, সেখানে ‘দেশদ্রোহী’ এবং ‘হিন্দু বিরোধী’ সাহিত্য চর্চা করা হচ্ছে। এই ঘটনাটি ভারতীয় গণতন্ত্রের বর্তমান দশা ও বাক্স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
একটি গণতান্ত্রিক দেশের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মুক্তচিন্তার চর্চা। কিন্তু আহমেদাবাদের এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, দেশের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারীরা এখন শিক্ষাকে নিজেদের ছাঁচে ঢালতে চাইছে। কোন বইটি পড়া যাবে আর কোনটা নিষিদ্ধ, তার ফয়সালা করার অধিকার কে বা কারা এই দলগুলোকে দিয়েছে?
ভগৎ সিংয়ের বিপ্লবী সমাজতন্ত্র, বি আর আম্বেদকরের জাতপাতহীন ভারতের স্বপ্ন এবং জওহরলাল নেহেরুর ‘ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া’র মতো গ্রন্থ আজ কট্টরপন্থীদের লক্ষ্যবস্তু। অথচ এই সমস্ত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বরাই আধুনিক ভারতের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন।
বই পড়া বা মতবিনিময় করাকে যখন ‘দেশদ্রোহিতা’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হয়, তখন বুঝতে হবে সমাজে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করাই হামলাকারীদের মূল উদ্দেশ্য। তরুণ প্রজন্ম যাতে স্বাধীনভাবে ভাবতে না শেখে, সেই শিক্ষাই এখানে দেওয়া হচ্ছে।
গত কয়েক বছরে ভারতে ভিন্ন মতাবলম্বী লেখক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ নাগরিকদের টার্গেট করার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। আহমেদাবাদের এই বুক রিডিং সেশনে হামলা তারই একটি ক্ষুদ্র কিন্তু তীব্র প্রকাশ।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গণতান্ত্রিক পরিসর ক্রমশ সঙ্কুচিত হচ্ছে। যেখানে যুবসমাজ বই পড়ে ইতিহাস ও সমাজকে বুঝতে চাইছে, সেখানে তাদের দমন করার অর্থ হলো একটি সচেতন প্রজন্ম গড়ে ওঠার পথকে রোধ করা।
আহমেদাবাদের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ঘটনা নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক নকশার অংশ—যেখানে জ্ঞান ও চিন্তাকে ভয়ংকর অস্ত্র হিসেবে দেখা হয়। মালালা বা আনা ফ্র্যাঙ্ক কেবল কিশোরী নন, তাঁরা বৈশ্বিক মানবাধিকার ও সংগ্রামের প্রতীক। তাঁদের লেখা পড়ে যদি আজকের ভারতীয় তরুণেরা অনুপ্রাণিত হতে চায়, তবে তা রাষ্ট্রের পক্ষে বিপজ্জনক হতে পারে না; বরং এটি সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্বকেই প্রকাশ করে।
প্রশ্ন জাগে মুক্তচিন্তা ও বই পড়ার মতো একটি অহিংস কর্মসূচিকে যদি ‘দেশদ্রোহী’ তকমা দিয়ে দমন করা হয়, তবে কি আমরা ধীরে ধীরে একটি অঘোষিত সেন্সরশিপ ও ভয়ের সমাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি না?

