যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কেবল উচ্চশিক্ষার কোনো সাধারণ প্রাঙ্গণ নয়; এটি চিন্তার এক অবিনশ্বর ক্যানভাস, যেখানে যুগ যুগ ধরে প্রতিবাদের ভাষা জীবন্ত হয়ে উঠেছে ব্রাশের টানে আর দেওয়াল লিখনির মারপ্যাঁচে। কিন্তু সম্প্রতি সেই ঐতিহাসিক ক্যাম্পাসের দেওয়ালে যখন সাদা চুনকামের প্রলেপ পড়ে, তখন তা কেবল কিছু আপত্তিকর স্লোগান মোছার প্রশাসনিক দায়িত্ব হয়ে থাকে না; তা হয়ে দাঁড়ায় এক গভীর রাজনৈতিক রূপক। প্রশ্ন জাগে কেন বারবার যাদবপুরের মতো মুক্তমনা ক্যাম্পাসের ওপর নেমে আসে রাষ্ট্রীয় আঘাত? কেন গণতন্ত্রের এই প্রাণকেন্দ্রকে অনুগত করার এমন মরিয়া প্রচেষ্টা চলে?
যাদবপুরের দেওয়াল মানেই নিছক ইট-পাথরের আস্তরণ নয়। ভিয়েতনামের মুক্তি সংগ্রাম থেকে ফিলিস্তিনের নাৎসিবিরোধী লড়াই কিংবা মার্ক্সীয় দর্শনের নানা বাঁক—সবকিছুরই ছায়া পড়েছে এই ক্যাম্পাসের চত্বরে।
৮বি বাসস্ট্যান্ডের চত্বর যাদবপুরের আন্দোলনের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সেই চত্বরে দাঁড়িয়ে যখন জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার আওয়াজ ওঠে এবং ক্যাম্পাসের দেওয়াল লিখন নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলা হয়, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে রাষ্ট্রের নজর আজ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন সত্তার ওপর কতটা তীক্ষ্ণ। শাসক কিংবা প্রভাবশালী মহলের একাংশের চোখে যাদবপুর এক ‘দুর্গ’, যাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া জরুরি। কারণ, এই ক্যাম্পাসটি মুখ বন্ধ করতে শেখেনি। এখানে হাজারটা ভিন্ন সুর একসঙ্গে বেজে ওঠে, যা অনেক সময়ই একরৈখিক রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে মেলে না। তাই স্লোগান মোছার এই তৎপরতা কেবল পরিচ্ছন্নতা অভিযান নয়; এটি চিন্তার পরিসরকে ঝেঁটিয়ে পরিষ্কার করে দেওয়ার এক সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক এজেন্ডা।
রাষ্ট্র বা ক্ষমতা কাঠামোগুলি স্বভাবতই প্রশ্নহীন আনুগত্য পছন্দ করে। কিন্তু যাদবপুর বরাবরই প্রশ্ন করতে শিখিয়েছে। কার্ল মার্ক্স থেকে জঁ পল সার্ত্রে, কিংবা মুক্তবুদ্ধির চারণারা—এই ক্যাম্পাসের বাতাসে মিশে আছে বুদ্ধিবৃত্তিক বিদ্রোহের নির্যাস। যখনই সমাজ বা রাষ্ট্রে একরৈখিকতার সংকট তৈরি হয়, তখনই তারা ভয় পায় সেই তরুণ প্রজন্মকে, যারা ক্ষমতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে জানে। যাদবপুরের ওপর নেমে আসা আঘাতগুলো আসলে পরাধীনতার সেই অদৃশ্য শেকল, যা মুক্তোঝরা ডানায় বারবার আঘাত হানতে চায়।
দেওয়ালের চুনকাম একদিন খসে পড়তেই পারে। নতুন প্রজন্মের কলমে ফের জেগে উঠতে পারে প্রতিবাদের নতুন গ্রাফিতি। কারণ, ইতিহাসের শিক্ষা বলে—দমনপীড়ন চালিয়ে মুক্তচিন্তার স্রোতকে চিরতরে স্তব্ধ করা যায় না। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তার স্বকীয়তায় উজ্জ্বল ছিল, এবং থাকবে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এমন এক সমাজের দিকে এগোচ্ছি যেখানে মুক্তমনা হওয়ার অপরাধে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে প্রতিটি স্বাধীনচেতা প্রতিষ্ঠানকে?

