“চালচুলো নেই তার, নেই তার চেনা বা অচেনা
আদমসুমারী হলে, তার মাথা কেউ গুনবেনা”-
১৯৯২ সালে সুমন লিখেছিলেন৷ আর আজ, ২০২৬ এ দাঁড়িয়ে, স্বাধীনতার আশি বছরে পর দেশের আসন্ন জনগণনায় হঠাৎ করেই বাদ পড়ে গেল দুটি পরিচিত অথচ প্রান্তিক ধারা—’ভিক্ষাজীবী’ ও ‘ভবঘুরে’। রাষ্ট্রের খাতায় যাঁদের এতদিন আলাদা একটা দাগ কেটে চেনা যেত, আগামী দিনে তাঁরা স্রেফ ‘অন্যান্য’-র ভিড়ে হারিয়ে যাবেন। নীতি নির্ধারকদের মতে, এই তথ্যে নাকি ধ্রুব সত্য মেলে না। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, সত্যকে লুকোলেই কি সমস্যা ফুরিয়ে যায়? নাকি পরিসংখ্যানের আয়নাটা ভেঙে ফেললে দেশের গায়ে লেগে থাকা কলঙ্কের দাগগুলোকেও মুছে ফেলা যায় ?
প্রশাসনিক সূত্রে দাবি করা হচ্ছে, সামাজিক সংকোচ ও অপবাদের ভয়ে অনেক মানুষ নিজেদের ভিক্ষাজীবী বা ভবঘুরে হিসেবে পরিচয় দিতে চান না। ফলস্বরূপ, গত কয়েক দশক ধরে এই সংক্রান্ত তথ্যে গরমিল দেখা যাচ্ছিল। ১৯৯১ সালে দেশে ভিক্ষাজীবীর সংখ্যা যেখানে ছিল প্রায় ৫.৪ লক্ষ, ২০০১-এ তা সামান্য বেড়ে ৬.৩ লক্ষ হলেও ২০১১-র শেষ জনগণনায় তা নাটকীয়ভাবে কমে দাঁড়ায় মাত্র ৩.৮ লক্ষে।
অতীতে দেখা গেছে, দেশের মধ্যে সবথেকে বেশি ভিক্ষাজীবীর বাস ছিল পশ্চিমবঙ্গেই (৮১,২৪৪ জন), তারপরেই ছিল উত্তরপ্রদেশ ও অন্ধ্রপ্রদেশ। দারিদ্র্য, কর্মহীনতা এবং প্রান্তিকীকরণের এই জলজ্যান্ত দলিলগুলোকে চোখের আড়াল করার জন্যই কি আজ এই বিভাগগুলোকেই চিরতরে বাদ দিয়ে দেওয়া হলো? তথ্য না থাকলে দারিদ্র্যও নেই!

ভিক্ষাবৃত্তি বা ভবঘুরে জীবনযাপনকে অর্থনীতির খাসতালুকে ‘নন-ইকনমিক অ্যাক্টিভিটি’ বলে দেগে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যে মানুষটি তীব্র রোদে হাত পাতেন বা ফুটপাথের কনকনে ঠান্ডায় খবরের কাগজ গায়ে জড়িয়ে রাত কাটান, তাঁর বেঁচে থাকার লড়াইটি কি অর্থনীতির চেয়েও বড় কোনও বেঁচে থাকার কঠিন সত্য নয়?
নতুন নিয়মে এই মানুষগুলোকে সাধারণ ‘অন্যান্য’ কাঠামোর মধ্যে ফেলে দেওয়া হবে। এর ফলে তাঁদের বয়স, ধর্ম, রাজ্যভিত্তিক বণ্টন বা শিক্ষার মতো মৌলিক তথ্যগুলোর আর আলাদা অস্তিত্ব থাকবে না। যাঁরা সমাজের মূলস্রোত থেকে বহু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন, রাষ্ট্র আজ তাঁদের মুখের ওপর শেষ দরজাটাও বন্ধ করে দিল। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় এই মানুষগুলোর জন্য কোনও সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বা অনুদান আর বরাদ্দ করার অবকাশ থাকবে কি না, তা নিয়ে এখন থেকেই গম্ভীর প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে।
পথের ধুলো যাদের বিছানা এবং খোলা আকাশ যাদের ছাদ, সেই ভবঘুরে ও ভিক্ষাজীবী মানুষগুলো কেবল কতগুলো সংখ্যা নন, তাঁরা একেকটি জীবন্ত ইতিহাস। আজ রাষ্ট্র যখন ঘোষণা করছে যে খাতায় কলমে এই মানুষগুলোর কোনো বিশেষ পরিচয় আর থাকবে না, তখন মনে হয়— আমরা এমন এক তথাকথিত উন্নত সভ্যতার দিকে এগোচ্ছি, যেখানে দারিদ্র্যের ক্ষত ঢাকতে ক্ষতস্থানটিতেই পুরু প্রলেপ লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে৷ যাঁরা বেঁচে আছেন অথচ রাষ্ট্রের হিসেবে আর মৃতপ্রায়ও নন, নিখোঁজ!
দিনশেষে প্রশ্ন থাকলো—যাঁদের সরকারি রেকর্ডে অস্তিত্বই রইল না, তাঁদের কল্যাণের পথটুকুা চেনাবে কে?

