সমাজমাধ্যমে এখন বিহারের ছয় বছরের আদিত্যকুমার ভাইরাল। যার ওপর বিহার পুলিশ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দাপট দেখিয়েছে। সারা বিশ্ব দেখেছে, কীভাবে ঐ ছয় বছরের বাচ্চাটিকে বিহার পুলিশ নিয়ে গিয়ে তাঁদের হেফাজতে রেখেছিল। সেই আদিত্য কুমার যখন ছাড়া পায়, তখন তাকে দেখা যায় বিভিন্ন সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করছেন। অবলীলায় সেই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে সে।
সাংবাদিক: প্রতিবাদের জন্য তোমার বয়স তো খুব কম। তোমার কি ভয় লাগছিল না?
আদিত্য: আমি সতর্ক ছিলাম। ভিড় আসার আগেই আমি ব্যারিকেড পার হয়ে গিয়েছিলাম।
সাংবাদিক: তুমি কেন গিয়েছিলে? তুমি কি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও চিন্তিত?
আদিত্য : হ্যাঁ। আমি যদি মন দিয়ে পড়াশোনা করি আর তারপর পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যায়, তবে আমার পুরো পড়াশোনাই বৃথা যাবে। তাই আমিও আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত।
সাংবাদিক: তুমি কোন ক্লাসে পড়ো? এত সব খবর তুমি কোথা থেকে পাও?
আদিত্য: আমার বয়স ৬ বছর, আমি প্রথম শ্রেণিতে পড়ি। আমি খবর দেখি নিউজ চ্যানেল থেকে।
সাংবাদিক: পুলিশ কী বলেছিল?
আদিত্য: ওরা আমাকে ৭ ঘণ্টা আটকে রেখেছিল আর বলেছিল যে আমি যদি আবার যাই, তবে ওরা আমাকে মারধর করবে এবং আমার বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করবে।

ঐ ছেলেটি যখন এই কথাগুলো বলছিল, তখন কি একবারও মনে হয়েছে যে বিহারের একজন সাধারণ শ্রমিকের ছয় বছরের ছেলেটি ভয় পাচ্ছে? মনে হচ্ছে না, সে অকুতোভয়? একবারও মনে হয়েছে এই রাষ্ট্র শক্তি, এই অপরিসীম ক্ষমতাশালী সরকারের আচরণে সে ভয় পেয়েছে? পথ দেখিয়েছিল দিল্লির যন্তরমন্তর, সেই পথে একে একে সামিল হয়েছিল অন্যান্য বিজেপি শাসিত রাজ্য। বাদ যায়নি, অবিজেপি শাসিত রাজ্য ঝাড়খন্ড, কিংবা কর্ণাটকও। মাথা নত করতে হয়েছে প্রবল ক্ষমতাধর কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভাকে। ইস্তফা দিতে বাধ্য হয়েছেন, তাঁদের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। নিজেদের নানান অপ্রাপ্তি নিয়ে পথে নামতে দেখা গেছে বিভিন্ন রাজ্যের স্কুল ছাত্রদের। ককরোচ জনতা পার্টির পক্ষ থেকে তাঁদের আগামী কর্মসূচী নেওয়া হয়েছে ‘স্কুল ঠিক করো’, এই প্রচারাভিযান চালানো হবে। অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সর্বভারতীয় সভাপতি নেহা বোরা সারা ভারতে ‘জেন জি রাইজিং’ এই শ্লোগানকে সামনে রেখে লড়াইয়ের বার্তা দিচ্ছেন। সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা নেওয়ার সংস্থা এনটিএ বাতিল এবং কেন্দ্রীয় জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ বাতিলের দাবীতে ভারতের নানান শহরে সভা করছেন নেহা বোরা। কংগ্রেসও পিছিয়ে নেই, বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী ‘ছাত্র কি গুঞ্জ’ অনুষ্ঠানে বিপুল সারা পাচ্ছেন। পিতৃতন্ত্র বিরোধী আওয়াজ উঠছে তাঁর সভা থেকে। বোঝা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর ভাবগম্ভীর ভাবমূর্তিকে আর নতুন প্রজন্ম ভয় পেতে রাজি নয়। শুধু প্রধানমন্ত্রী নয়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকেও তাঁরা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে পিছপা নয়, যে যন্তরমন্তরের আন্দোলনে কে নির্দেশ দিয়েছিল দিল্লি পুলিশকে, ছাত্রযুবদের বিরুদ্ধে ছররা বন্দুক চালাতে।
ঐ সময়ে যখন নানান রাজ্যে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্ত আন্দোলন তখন বিহারের আন্দোলনকারীদের নানান কর্মকান্ড দেখা গিয়েছিল। সেই বিহার আবার পথে নেমেছে। এবার ৭০ তম বিহার পাবলিক সার্ভিস কমিশনের ব্যাপক দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছে তাঁরা। যখন শূন্যপদ থাকা সত্ত্বেও, সরকারি চাকরিতে নিয়োগ হচ্ছে না, তখন একটি চাকরির পরীক্ষার দুর্নীতি নিয়ে বিহারের ছাত্রযুবদের রাস্তায় নামা একেবারেই স্বাভাবিক। সারা দেশে স্বাধীনতার পরবর্তীতে এই সময়ে বেকারত্বের হার উদ্বেগজনক, তাই ছাত্রযুবদের মধ্যে এই সংক্রান্ত ক্ষোভও অত্যন্ত প্রত্যাশিত। সুতরাং বিক্ষোভকারীদের আন্দোলনের ধরণটি আইনসম্মত নয় বললে সমস্যার সমাধান হবে না। ছাত্রযুবদের ক্ষোভের কারণকে যদি প্রশমিত না করা যায় এবং তাঁদের ক্ষুব্ধ হওয়ার কারণগুলোকে যদি মান্যতা না দেওয়া যায়, তাহলে সমস্যা বাড়বে ছাড়া কমবে না। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই মূহুর্তে ভারতের ছাত্রযুবরা নিজেরাই দেখতে পাচ্ছে, সরকারি স্কুলের পরিকাঠামো স্বাধীনতার ৮০ বছরে প্রায় ধ্বংসের মুখে।
যাঁরা এই ন্যায়সঙ্গত কারণকে দেখেও না দেখার ভান করে শুধু দেশাত্মবোধ এবং জাতীয়তাবাদের চর্চা করাতে চাইছেন, তাঁদেরকেও যদি প্রশ্ন করা যায়, যে তাঁদের সন্তানেরা কোথায় পড়েন, সরকারি না বেসরকারি, তাহলে দেখা যাবে শহরের বেশীরভাগ মানুষই বলছেন, তাঁদের সন্তানেরা বেসরকারি ব্যবস্থাপনাতে পড়ছে। তখনই দ্বিতীয় প্রশ্ন উঠবে, সেখানে খরচ কত? কেন সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাকে আজও ঠিক করা গেল না? কেন উচ্চশিক্ষা ক্রমশ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে, কেন শিক্ষান্তে কাজের ক্ষেত্র এত অন্ধকারাচ্ছন্ন? কোনও উত্তর কিন্তু পাওয়া যাবে না। শুধুমাত্র লক্ষ কন্ঠে গীতা পাঠ বা ১০ হাজার কন্ঠে বন্দেমাতরমের ছয় স্তবক গাইলেও কিন্তু এই সমস্যার সমাধান করা জরুরি। আশার আলো এইটুকুই, যে নতুন প্রজন্ম কিন্তু বিনা প্রশ্নে সরকারের এই নীতি মেনে নিতে নারাজ। তাই জেন জি পথে নামছে, সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে জেন আলফা, অর্থাৎ স্কুলে যাওয়া বাচ্চারা। ছয় বছরের আদিত্যকুমার কিন্তু কারো কথায় প্ররোচিত হয়ে নয়, নিজের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই পথে নামছে। তাঁদেরকে শারীরিকভাবে আঘাত করা হলেও, গ্রেপ্তার করা হলেও তাই আদিত্য কুমারদের আর দমানো যাচ্ছে না। অন্ধকারাচ্ছন্ন বর্তমানের শেষে তাই এরাই আশার আলো।
যন্তর মন্তরের অনশন আন্দোলন এবং তার পরবর্তী সংসদ অভিযানের পরেই একাধিক রাজ্যে পথে নামতে দেখা গিয়েছিল স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের। কোথাও তাদের দাবি হিসেবে উঠে আসছে, উন্নত রাস্তা, পর্যাপ্ত শিক্ষক, শৌচালয় পরিষেবা এবং অন্য সাধারণ কিছু মৌলিক পরিষেবা। এই জন্য তারা সরকারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলছে। কোথাও সরকারি আধিকারিক কে ঘেরাও করা হচ্ছে, কোথাও নিজেরা ভিডিও তুলছে এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে তাদের লড়াই। উত্তরপ্রদেশের হামিরপুরে একদল স্কুল পড়ুয়া তাদের স্কুলে যাওয়ার রাস্তা ঠিক করার জন্য জেলা শাসকের দপ্তরে মিছিল করে যাচ্ছে তাদের সবার হাতে জাতীয় পতাকা। সঙ্গে তাদের বাবা মায়েরাও মিছিলে হাঁটছে। এই দৃশ্য কবে দেখা গেছে এর আগে হয়ত অনেকেই মনে করতে পারবেন না। ঐ রাজ্যেরই ফতেপুর জেলার কিশানপুরে সম্প্রতি আরো একটি ছাত্র বিক্ষোভ হয়। সরস্বতী ইন্টারমিডিয়েট কলেজের প্রায় ১৫০০ ছাত্রছাত্রী গত ২৮ শে জুলাই ৪ ঘন্টা শান্তিপূর্ণ অবস্থান বিক্ষোভ করে তাদের দাবি ছিল পরিষ্কার পানীয় জলের ব্যবস্থা করতে হবে স্কুলে । খারাপ হয়ে যাওয়া পাখাগুলো সারাতে হবে, স্কুলের শ্রেণিকক্ষের পরিকাঠামাগুলোকে মেরামত করতে হবে এবং সঠিকভাবে মিড ডে মিল সরবরাহ করতে হবে। তাদের এই আন্দোলনের ফলে জেলা শিক্ষা দপ্তরের আধিকারিক এবং জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক তড়িঘড়ি কলেজে পৌঁছে লিখিত প্রতিশ্রুতি দেন তাদের সমস্ত দাবি মেনে নেওয়া হবে।
শুধু উত্তরপ্রদেশে নয়, রাজস্থান মধ্যপ্রদেশ এবং বিভিন্ন বিজেপি শাসিত রাজ্য গুলিতে এই ধরনের ছোটখাটো আন্দোলনের খবর এখন নিয়মিত আসছে। গোদি মিডিয়া চেষ্টা করেও সেই খবর চেপে রাখতে পারছে না। একেক জায়গায় তো পড়ুয়াদের দাবী ‘হয় শিক্ষক দাও নয় আমাদের স্কুল থেকে বার করে দাও’। জয়পুরে মূক ও বধির শিক্ষার্থীরাও স্কুলের নিম্নমানের পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে তাদের সাংকেতিক ভাষায় প্রতিবাদ করছে এই ছবিও এসেছে। রাজস্থানে হয়ত সরকারের সমর্থকেরা একজোট হয়ে এই ‘স্কুল ঠিক করো’ আন্দোলনের কর্মীদের শারীরিকভাবে আক্রমণ করেছে, কিন্তু সরকার বাধ্য হয়েছে, স্কুলের পরিকাঠামো ঠিক করার জন্য ব্যয় বরাদ্দ বাড়াতে। বোঝা যাচ্ছে, আন্দোলনকারী ছাত্রযুবদের বিষয়ে ভুল নেই, এবং সব সরকারই তা মেনেই নিতে বাধ্য হচ্ছে। ঝাড়খন্ডে পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে, তো রাজস্থানে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে রাতারাতি। পূর্বতন সরকারের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে আর দিন কাটবে না নিশ্চিন্তে তা সরকারকে দ্রুত বুঝতে হবে। ছয় বছরের আদিত্য কুমাররা এই কথাগুলো রোজ মনে করিয়ে দিচ্ছে সরকারকে।
কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সেই শিশুটি যেন কবিতা থেকে বাস্তবের মাটিতে পা রেখে বলছে, ‘রাজা তোর কাপড় কোথায়?’ ১৯১১ সালে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, তাঁর ‘জনগণমন’ গানটি। ১৯৫০ সালে সংবিধান গৃহীত হওয়ার আগে ঐ গানটাই ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তার একটি স্তবকের কথা বলা উচিৎ আজকে।
‘রাত্রি প্রভাতিল, উদিল রবিচ্ছবি পূর্ব-উদয়গিরিভালে—
গাহে বিহঙ্গম, পুণ্য সমীরণ নবজীবনরস ঢালে।
তব করুণারুণরাগে নিদ্রিত ভারত জাগে
তব চরণে নত মাথা’…
অনেকে বলে থাকেন, মহাত্মা গান্ধীর ডাকে যখন সারা দেশের মানুষ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিল তখন হয়ত তা দেখেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঐ কথাগুলো লিখেছিলেন। আজকে ছয় বছরের আদিত্য কুমার বিহারের প্রতিবাদের মুখ হয়ে উঠেছে। এখন কি আবার বলার সময় হয়নি, ‘নিদ্রিত ভারত জাগে’।

