ক্যাম্পাসে গ্রাফিতিতে চুনকাম ও রাষ্ট্রের ছায়া বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় বন্ধ করে সার্বিক হোক নির্বাচন! তবেই সাপমুক্তি হবে পশ্চিমবঙ্গের? বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটে জিতে মোদীর সঙ্গে ব্রেকফাস্ট! সায়নী, কাকলীরা আর জিতবেন? প্রতিবাদী মানেই ‘অ্যান্টিন্যাশনাল’ নয়, ভাগবতের কথা কি মাথায় রাখবে তথাকথিত ‘দেশভক্ত’রা? বাঁকিপুরের ঝাঁকি, সঙ্গে CJP! ঘুরে দাঁড়াতে পারবে BJP? গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কাঁটা মোদী-শাহ’র CPIM থেকে BJP হয়ে তৃণমূল! বিরোধী হলেই কাদা-ডিম্ ছোঁড়ার রাজনীতি বাংলায়, কবে বদলাব আমরা? জমিতেও হিন্দু-মুসলমান? মুখ্যমন্ত্রীর ‘ল্যান্ড জিহাদ’ মন্তব্যে শোরগোল বঙ্গ রাজনীতিতে রেখা পাত্রের বিরুদ্ধে বাড়ি দখলের অভিযোগ, শর্বরীর বিরুদ্ধে দোকান! তোলাবাজির TMC-BJP হয়?

বিহারের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ছাত্র বিক্ষোভ এবং প্রশাসনিক সংকট:

৬ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন


​ভারতের রাজনীতিতে যুবসমাজ এবং কর্মসংস্থানের প্রশ্নটি বরাবরই একটি নির্ণায়ক চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে পাটনার রাজভবন অভিমুখী ছাত্র আন্দোলন এবং পুলিশি সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে বিহারের রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এই আন্দোলন কেবল একটি নির্দিষ্ট প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার বিরোধিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি বিহারের সামগ্রিক প্রশাসনিক পরিকাঠামো, শিক্ষাব্যবস্থা এবং যুব সমাজের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের এক বিস্ফোরক বহিঃপ্রকাশ।


বিহারের লাখ লাখ তরুণ-তরুণী নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য সরকারি চাকরির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বিপিএসসি (BPSC) সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ক্ষেত্রে অনিয়ম, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং বারবার পরীক্ষা স্থগিত বা বাতিল হওয়ার ঘটনা নিয়মে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক ৭০তম বিপিএসসি পরীক্ষা এবং শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা (TRE 4.0)-এর বিভিন্ন ত্রুটিপূর্ণ নীতি, যেমন—একাধিক ধাপে পরীক্ষা পরিচালনা এবং নেতিবাচক মূল্যায়নের (Negative Marking) মতো বিষয়গুলো শিক্ষার্থীদের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। বছরের পর বছর ধরে প্রস্তুতি নেওয়ার পর যখন পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন তা কেবল শিক্ষাগত সমস্যা থাকে না, বরং তা একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নেয়। পাটনার রাজভবন অভিমুখে শিক্ষার্থীদের এই মার্চ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এই গভীর আস্থার সংকটেরই সরাসরি ফল।

বিহারে পুলিশের জলকামানের সামনে ছাত্ররা। ছবি:সংগৃহিত


এই ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিহারের রাজনৈতিক ময়দান অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিরোধী দলগুলো এই পরিস্থিতিকে বর্তমান রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। রাষ্ট্রীয় জনতা দল (RJD) এবং কংগ্রেসের মতো বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সরাসরি সরকারের নীতি ও প্রশাসনের কঠোর সমালোচনা করেছে। বিরোধী শিবিরের পক্ষ থেকে দাবি তোলা হয়েছে যে, সরকারের উদাসীনতার কারণেই রাজ্যের যুবসমাজ আজ পথে নামতে বাধ্য হয়েছে। বিরোধী নেতারা আহত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো এবং সরকারের স্বৈরাচারী আচরণের অভিযোগ তোলার মাধ্যমে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার পাশাপাশি সরকারের ওপর নৈতিক চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই আন্দোলন প্রমাণ করে যে, সাধারণ জনগণের মৌলিক সংকটগুলো কীভাবে দ্রুত বিরোধী দলগুলোর প্রধান রাজনৈতিক এজেন্ডায় পরিণত হয়।


এই ধরনের গণআন্দোলনে প্রশাসনের ভূমিকা সবসময়ই অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়। পাটনায় বিক্ষোভ দমনে পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙা, জলকামান ব্যবহার এবং ধস্তাধস্তির ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সাধারণ নাগরিকের মধ্যকার দূরত্বকে স্পষ্ট করে তোলে। সরকারের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার যুক্তি দেওয়া হলেও, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানোর সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্নটিও সমান্তরালভাবে উঠছে। যখনই হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান, তখন সরকারের পুলিশি শক্তি প্রয়োগের কৌশল রাজনৈতিক মহলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। এটি একদিকে যেমন প্রশাসনের দমনমূলক নীতির প্রকাশ, অন্যদিকে তেমনি সরকারের রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাবকেও ফুটিয়ে তোলে।



বিহারের রাজনীতিতে জাতিগত সমীকরণের পাশাপাশি গত কয়েক নির্বাচন ধরে ‘বিকাশ’ এবং ‘রোজগার’ বা কর্মসংস্থানের বিষয়টি কেন্দ্রীয় এজেন্ডায় পরিণত হয়েছে। রাজ্যের অর্থনীতিতে বড় কোনো শিল্পায়ন না থাকায় সরকারি চাকরি বা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোই যুবসমাজের কাছে একমাত্র অর্থনৈতিক মুক্তির পথ। ফলে, পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস বা নিয়োগে দীর্ঘসূত্রিতা সরাসরি সরকারের জনপ্রিয়তাকে প্রভাবিত করে। বর্তমান প্রশাসন যখনই চাকরির পরীক্ষা সংক্রান্ত জটিলতাগুলো দ্রুত সমাধান করতে ব্যর্থ হয়, তখন তা সরাসরি শাসক জোটের রাজনৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। আসন্ন রাজনৈতিক লড়াইয়ের আগে এই বেকারত্ব এবং নিয়োগ দুর্নীতি বিরোধী দলগুলোর হাতে অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।


সর্বোপরি, পাটনার রাজভবন অভিমুখে শিক্ষার্থীদের এই বিক্ষোভ ও সংঘাত কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি বিহারের প্রশাসনিক ব্যর্থতা, শিক্ষাব্যবস্থার ভঙ্গুর দশা এবং কর্মসংস্থানের চরম সংকটের এক সম্মিলিত রাজনৈতিক চিত্র। সরকার যতই সান্ত্বনা মূলক পদক্ষেপ বা আলাপ-আলোচনার বার্তা দিক না কেন, যতক্ষণ না পর্যন্ত নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পূর্ণ স্বচ্ছতা ফিরছে এবং আস্থার সংকট দূর হচ্ছে, ততক্ষণ এই অসন্তোষ থামার নয়। বিহারের রাজনৈতিক ভবিষ্যতে এই আন্দোলন এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে এবং তরুণ প্রজন্মের এই ক্ষোভ আগামী দিনে ভোটবাক্সেও গভীর রেখাপাত করতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের অভিমত।

অন্যান্য প্রতিবেদন.