ক্রেনশক্তিতে উপড়ে গেলো নেহেরু মূর্তি;কংগ্রেস-বিজেপি-তৃণমূলের ত্রিমুখী তরজা ভারতের শেষ গ্রামে দুর্বিষহ জীবন, পদ্মা নদীর ছন্দেই বাঁচে ওরা! নেই হাসপাতাল, স্কুল, রোজগার! ভাতের বদলে কাফন? ১৯৫৯ সালের যে রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে কেঁপেছিল রাইটার্স! আহমেদাবাদের স্টাডি সার্কেলে হামলা; নিষিদ্ধ আনা ফ্রাঙ্ক,মালালা ইউসুফজার! কেন বুদ্ধবাবু পারেননি তসলিমাকে নিরাপত্তা দিতে? কেন বিজেপি ফেরাল? কার দখলে বাংলার বিরোধী রাজনীতি? তৃণমূলের শেষে আশার আলো দেখছে CPIM? কার দখলে বাংলার বিরোধী রাজনীতি? তৃণমূলের শেষে আশার আলো দেখছে CPIM? ককরোচদের (CJP) আন্দোলনে জেরবার BJP! কোন পথে ঐতিহাসিক জয় প্রশান্ত কিশোরের? নেপথ্যে ছাত্র আন্দোলন! BJP-র বিরুদ্ধে একজোট হচ্ছে মানুষ? বাঁকিপুর ভাবাচ্ছে নরেন্দ্র মোদীকে নেপথ্যে ছাত্র আন্দোলন! BJP-র বিরুদ্ধে একজোট হচ্ছে মানুষ? বাঁকিপুর ভাবাচ্ছে নরেন্দ্র মোদীকে

গ্রামবাংলার মাটিতে নারীর মুক্তি ও কাঠামোগত রাজনৈতিক প্রশ্ন:-

৫ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন


​ভোরের প্রথম আলো যখন কুয়াশা চিরে গ্রামের মেঠোপথে এসে পড়ে, তখন ঘুম ভাঙে এক অলিখিত বিপ্লবের। যে বিপ্লবের কোনো কোলাহলপূর্ণ স্লোগান নেই, কোনো রক্তলাল ঝান্ডা নেই, কিন্তু রয়েছে ঘামরক্তে ভেজা এক দীর্ঘশ্বাস এবং স্বনির্ভরতার নিঃশব্দ পদচারণা। আধুনিক শ্রম বাজারের অর্থনীতি আজ এক অদ্ভুত রূপান্তরের সাক্ষী। পরিসংখ্যানের আয়না বলছে, দেশের শ্রম বাজারের নারীর অংশগ্রহণ আগের চেয়ে অনেকটাই বেড়েছে; আর এই ঊর্ধ্বমুখী রেখাটি শহুরে কংক্রিটের অপেক্ষা গ্রামবাংলার কাঁচা মাটি ও খেতের আলেই বেশি স্পষ্ট।


​ফসলের মাঠে, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর (Self-Help Groups) চাকার ঘুরপাক খাওয়া আঙিনায়, দুধ উৎপাদন কিংবা কুটিরশিল্পের কুটিরে নারীর শ্রম আজ এক বিরাট সামাজিক অনুঘটক হয়ে উঠেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই রূপান্তর কি সত্যিই নারীর পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক মুক্তি এবং অর্থনৈতিক স্বাধিকারের বার্তা বহন করে, নাকি এটি গভীর কাঠামোগত সংকট এবং চরম দারিদ্র্যের তাড়নায় তৈরি হওয়া এক কাঠামোগত বাধ্যবাধকতা?


​ একদিকে, গ্রামীণ নারী যখন নিজের উপার্জনের টাকায় সন্তানের মুখে অন্ন তুলে দেন বা গ্রামীণ অর্থনীতির রুগ্ন চাকা সচল রাখেন, তখন তা পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতার ভিত্তিমূলে এক মস্ত ধাক্কা দেয়। এটি ক্ষমতার রাজনীতির চিরাচরিত সমীকরণ বদলে দেয়। গ্রামের মোড়লের মোসাহেবি কিংবা পারিবারিক জাঁতাকলের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা এই নারীরা আজ কেবল অর্থনীতির কর্মী নন, তাঁরা গ্রামীণ রাজনীতির এক নীরব চালিকাশক্তি। স্বনির্ভর গোষ্ঠী, পঞ্চায়েত স্তর কিংবা সমবায় সমিতিতে তাঁদের উপস্থিতি আজ আর নিছক প্রতীকী নয়, বরং নীতি নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এক অনিবার্য দাবি। তাঁদের এই অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন পরিবার ও সমাজে তাঁদের কণ্ঠস্বরকে জোরালো করে তুলেছে, যা ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে দীর্ঘকাল ধরে জমে থাকা পুরুষতান্ত্রিক একাধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়।


​তবে এর অন্য পিঠেই রয়েছে এক অন্ধকার ও শাসকশ্রেণির শীতল উদাসীনতা। রাষ্ট্র যখন মুদ্রাস্ফীতি, কৃষির অবক্ষয় এবং গ্রামীণ অর্থনীতির পরিকাঠামোগত সংকটের মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়, তখন পেটের টানে নারীদের এই শ্রমবাজারে প্রবেশ এক কাঠামোগত বাধ্যবাধকতায় রূপ নেয়। একে কোনোক্রমেই স্বেচ্ছায় নির্বাচিত অর্থনৈতিক মুক্তি বলা যায় না। এটি বেঁচে থাকার লড়াই—যাকে অর্থনীতির ভাষায় বলা চলে ‘সারভাইভাল স্ট্রাগল’। সামাজিক সুরক্ষার চরম অভাব, সমান কাজের সমান মজুরি না পাওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক বঞ্চনা এবং দ্বিমুখী শোষণের শিকার হন এই গ্রামীণ নারীরা। ঘরে রান্নার হাঁড়ি টানার পর বাইরে রোদে পুড়ে হাড়ভাঙা কায়িক শ্রম—তাঁদের জীবনে বিশ্রামের বা অবকাশের কোনো বিলাসিতা নেই। রাষ্ট্রের কল্যাণমূলক নীতির ব্যর্থতা যখন গ্রামীণ পুরুষদের কর্মহীন বা প্রান্তিক করে তোলে, তখন পরিবারের সম্মান ও গ্রাস জোগাতে বাধ্য হয়ে নারীকেই হাল ধরতে হয়। এখানেই লুকিয়ে আছে পুঁজিবাদী ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার এক সুপ্ত সুবিধাভোগী কৌশল—যেখানে নারীর সস্তা ও নমনীয় শ্রমকে ব্যবহার করে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা হয়, অথচ তাঁদের সামাজিক সুরক্ষা, মাতৃত্বকালীন সুযোগ-সুবিধা বা কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় না। উন্নয়নের বুলি আওড়ানো রাজনৈতিক মঞ্চগুলো গ্রামবাংলার এই নারী শ্রমের ওপর ভর দিয়ে নিজেদের সাফল্যের ফানুস ওড়ায়, অথচ তাঁদের পেছনের দীর্ঘশ্বাসগুলো ঢাকা পড়ে যায় প্রচারের কোলাহলে।

​ শ্রম বাজারে গ্রামীণ নারীর এই উত্থান একাধারে যেমন চরম আশার আলো, তেমনই অন্যদিকে রাজনৈতিক ও সামাজিক অবহেলার এক দীর্ঘ দলিল। যতক্ষণ না এই উত্থান কেবল বেঁচে থাকার বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত হয়ে পূর্ণাঙ্গ অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা ও সমমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়, ততক্ষণ এই শ্রমের জয়গান অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। গ্রামবাংলার ধুলোমাখা পথ বেয়ে যে নারী আজ কর্মের দুনিয়ায় পা রেখেছেন, তাঁর এই যাত্রাকে শুধু অর্থনৈতিক সূচক দিয়ে মাপলে চলবে না; দেখতে হবে ইতিহাসের দীর্ঘতম বঞ্চনা থেকে তাঁর এই মুক্তির আকুতি কতটা গভীর এবং তা আমাদের রাজনৈতিক কাঠামোকে কীভাবে আমূল নাড়া দিচ্ছে। এই নীরব বিপ্লবই একদিন রচনা করবে এক নতুন সমতার ইতিকথা, যেখানে শ্রমের মুক্তিই হবে মানুষের প্রকৃত মুক্তি।

অন্যান্য প্রতিবেদন.