ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি পর্যবেক্ষণমূলক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কিছু বিস্ময়কর তথ্য। রির্পোটে জানা যাচ্ছে, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে জুলাই, এই চার-পাঁচ মাসের মধ্যে ভারত সরকার বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া সংস্থাকে প্রায় ১.৯৫ লক্ষ কনটেন্ট ব্লকিং নির্দেশ পাঠিয়েছে, যা গড়ে প্রতি ৬৮ সেকেন্ডে একটি নির্দেশের সমান। দৈনিক হিসেবে এই সংখ্যা প্রায় ১,২৭৫। এই তিনটি প্ল্যাটফর্মের মধ্যে ইনস্টাগ্রাম সবচেয়ে বেশি নির্দেশ পেয়েছে, প্রায় এক লক্ষ, যা মোট নির্দেশের অর্ধেকের বেশি। ফেসবুক পেয়েছে প্রায় আশি হাজার, আর ইউটিউব পনেরো হাজারের কাছাকাছি। মেটার দুটি প্ল্যাটফর্ম একসঙ্গে মোট নির্দেশের প্রায় নব্বই শতাংশ পেয়েছে।
এই সংখ্যাটা যে কতটা অস্বাভাবিক, তা বোঝা যায় আগের বছরের হিসেবের সঙ্গে তুলনা করলে। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত, উনিশটি প্ল্যাটফর্ম মিলিয়ে সরকার পাঠিয়েছিল মাত্র ২,৩১২টি নির্দেশ ‘সহযোগ’ পোর্টালের মাধ্যমে, যা তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের অধীনে ব্লকিং নোটিশ পাঠানোর কাজ সহজ করার জন্য তৈরি। সেই হিসেবে দৈনিক গড় ছিল মাত্র ছয়টি নির্দেশ। অর্থাৎ, মার্চ-জুলাই পর্বে এই সংখ্যা প্রায় দুইশো গুণ বেড়ে গেছে।
পর্যবেক্ষণ করে জানা যায়, উল্লিখিত কন্টেন্ট ব্লকিংয়ে বৃদ্ধি যে সময় লেগেছিল, সেই সময় দেশে NEET পরীক্ষা প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে যন্তর মন্তরে আন্দোলন চলছিল। দিল্লির যন্তর মন্তরে জুন মাসে শুরু হওয়া এই ছাত্র আন্দোলন জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত চলেছিল। সরকারের এক নাম-না-প্রকাশিত আধিকারিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে জানায় ব্লকিং নির্দেশের একটা ‘উল্লেখযোগ্য অংশ’ এই আন্দোলন চলাকালীনই জারি হয়েছে।
বেশিরভাগ নির্দেশ কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সংস্থাগুলি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ‘সহযোগ’ পোর্টালের মাধ্যমে পাঠিয়েছে। মেটা তাদের অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস (API) এই পোর্টালের সঙ্গে যুক্ত করেছে সরকারি নির্দেশ মেনে চলার জন্য। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ২০২১ সালের তথ্যপ্রযুক্তি বিধি সংশোধন করে বলা হয়, সোশ্যাল মিডিয়া মধ্যস্থতাকারী সংস্থাগুলিকে উপযুক্ত সরকার বা আদালতের নির্দেশ পাওয়ার তিন ঘণ্টার মধ্যে ‘বেআইনি কনটেন্ট’ সরাতে হবে, যেখানে আগে এই সময়সীমা ছিল অনেক বেশি। এই সংযুক্তির ফলে সরকারি নির্দেশে চিহ্নিত কনটেন্ট এখন আলাদা কোনো মনুষ্য নির্ভর পর্যালোচনা ছাড়াই মেটার প্ল্যাটফর্ম থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরে যাচ্ছে।
এত বিপুল সংখ্যক নির্দেশ এত অল্প সময়ে প্রক্রিয়া করা হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, কতটা যাচাই হচ্ছে, কতটা ধারাবাহিকতা বজায় থাকছে, এবং বৈধ বাক-স্বাধীনতার বিষয়বস্তুও সত্যিকারের বেআইনি উপাদানের সঙ্গে মুছে যাচ্ছে কি না। কিছু ব্যবহারকারীর অভিযোগ অনুযায়ী, ছাত্র আন্দোলনের সমর্থনে করা পোস্ট, সরকারের ইথানল জ্বালানি-মিশ্রণ নীতির সমালোচনা, এবং পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন সংক্রান্ত কিছু কনটেন্টও এই তালিকায় পড়েছে বলে জানা গেছে, ডিপফেক ও অন্যান্য প্রকৃত বেআইনি উপাদানের পাশাপাশি।
এই তিন ঘণ্টার সময়সীমা ঠিক কতটা ক্ষতিকারক তা অন্যান্য দেশের সথে তুলনা করলেই বোঝা যায়। জার্মানির ‘Network Enforcement Act’ বেআইনি কন্টেন্ট ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এবং অন্যান্য অবৈধ কন্টেন্ট ৭ দিনের মধ্যে মুছে ফেলার সময় দেয়। অস্ট্রেলিয়ার ‘Online Safety Act’ ও সর্বনিন্ম ২৪ ঘণ্টার সময় দেয়। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন শুধুমাত্র সন্ত্রাসবাদী ও সহিংস কন্টেন্ট মুছে ফেলার জন্যে ১ ঘণ্টার সময় দেয় এবং অন্যান্য কন্টেন্টের জন্যে কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করা নেই। কিন্তু ভারতের কন্টেন্ট রোধক নির্দেশিকায় কোনো নির্ধারিত বিভাগ নেই।
মূল প্রশ্নটা হলো, প্রতি ৬৮ সেকেন্ডে একটি নির্দেশ জারি করতে সক্ষম এই ব্যবস্থার মধ্যে যথেষ্ট স্বচ্ছতা এবং প্রক্রিয়াগত নিরীক্ষণ আছে কি না। কোথায় দাঁড়িয়ে আছে বাক স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ?

