প্রথাগত রাজনীতির আঙিনায় জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেকার দূরত্ব বরাবরই এক বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে, সমস্যার কথা জানাতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে দপ্তরে দপ্তরে ঘুরে হয়রানির শিকার হতে হয়। তবে সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ডোমকল বিধানসভা এলাকায় এক অভিনব উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে, যা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে। ডোমকলের বিধায়কের উদ্যোগে চালু হওয়া ‘আমার ডোমকল’ পোর্টাল কেবলমাত্র একটি প্রযুক্তিগত সংযোজন নয়, বরং এটি জনপ্রতিনিধিত্বের এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা।
’আমার ডোমকল’ পোর্টালটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে সাধারণ মানুষ ঘরে বসেই তাদের এলাকার নানাবিধ সমস্যার কথা সরাসরি জানাতে পারেন। রাস্তার সমস্যা, পানীয় জলের সংকট, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, নিকাশি ব্যবস্থা কিংবা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিষয়ক যেকোনো অভিযোগ—সবই এখন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নথিভুক্ত করা সম্ভব। এই পোর্টালটির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো এর স্বচ্ছতা। অভিযোগ জানানোর পর, অভিযোগকারী নিজেই তার অভিযোগের বর্তমান অবস্থা (status) দেখতে পারেন। অর্থাৎ, অভিযোগটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছেছে কি না, তার সমাধানের কাজ কতদূর এগিয়েছে, কিংবা কেন তা আটকে রয়েছে—এই পুরো বিষয়টি এখন আর কোনো গোপন নথি নয়, বরং জনসমক্ষে উন্মুক্ত।

পশ্চিমবঙ্গে বিধায়ক স্তরে এই ধরনের উদ্যোগ একেবারেই প্রথম। প্রথাগত রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে একজন জনপ্রতিনিধি যখন তাঁর দপ্তরের যাবতীয় কাজকর্ম এবং এলাকার প্রতিটি সমস্যার হালনাগাদ তথ্য জনগণের পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত করে দেন, তখন তা সরাসরি জবাবদিহিতার সংজ্ঞাকেই নতুন রূপ দেয়। সিপিয়াই(এম) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের ভাষায়, “একজন জনপ্রতিনিধির আসল পরীক্ষা তিনি কী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তা নয়, বরং মানুষ তাঁর কাছে সমস্যা নিয়ে আসার পর তিনি কী করছেন এবং সেই কাজের খতিয়ান তিনি প্রকাশ্যে আনতে রাজি আছেন কি না, সেই বিষয়টি।” এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, ‘আমার ডোমকল’ পোর্টালটি কেবল উন্নয়নের হাতিয়ার নয়, এটি রাজনীতির নৈতিক স্বচ্ছতার এক দর্পণ।
ডোমকলের মতো এলাকায় যেখানে পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা প্রচুর, সেখানে এই পোর্টালটি এক বড় স্বস্তি হয়ে এসেছে। পরিযায়ী শ্রমিকরা কাজের প্রয়োজনে ভিন রাজ্যে বা বিদেশে থাকলেও, নিজ পরিবারের বা গ্রামের যেকোনো সমস্যার কথা পোর্টালের মাধ্যমে বিধায়কের দপ্তরে জানাতে পারছেন। এছাড়া বয়স্ক নাগরিক, যাদের জন্য বারবার দপ্তরে যাতায়াত করা কষ্টকর, তারাও পরিবারের সদস্য বা প্রতিবেশীদের সহায়তায় অনায়াসেই অভিযোগ দায়ের করতে সক্ষম হচ্ছেন। এই উদ্যোগটি মূলত প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের ক্ষমতায়নের পথ প্রশস্ত করেছে।
প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া। ‘আমার ডোমকল’ পোর্টালের মাধ্যমে বিধায়ক কেবল মানুষের অভিযোগই শুনছেন না, বরং এলাকা জুড়ে একটি ‘অডিট ট্রেইল’ বা তথ্যভাণ্ডার তৈরি করছেন। এর ফলে ভবিষ্যতে জানা যাবে কোন এলাকায় সমস্যার প্রকোপ বেশি এবং সমাধানের জন্য কী ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এটি কেবল অভিযোগ সমাধানের পোর্টাল নয়, বরং এটি এলাকায় উন্নয়নের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের এক বড় ডেটাবেস।
’আমার ডোমকল’ পোর্টালটি ডিজিটাল ইন্ডিয়ার ধারণাকে প্রকৃত অর্থে মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের একটি সার্থক উদাহরণ। রাজনীতি যখন সেবার বদলে কেবল প্রচারসর্বস্ব হয়ে ওঠে, তখন এই ধরনের উদ্যোগ আশা জাগায়। এটি কেবল অভিযোগের নিস্পত্তিই করে না, বরং জনপ্রতিনিধি ও জনগণের মধ্যে যে আস্থার সংকট বিদ্যমান, তা দূর করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠে। ডোমকলের এই মডেল যদি রাজ্যের অন্যান্য বিধানসভা এলাকাগুলোতেও অনুসৃত হয়, তবে তা বাংলার প্রশাসনিক মানচিত্রে এক আমূল পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে। স্বচ্ছতা, সততা এবং প্রযুক্তির এই মেলবন্ধন আগামীর গণতান্ত্রিক লড়াইকে আরও শক্তিশালী এবং জনমুখী করে তুলবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

