বাংলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট চিরকালই এক অদ্ভুত দ্বান্দ্বিকতার ঘূর্ণাবর্তে ঘূর্ণায়মান। ক্ষমতার অলিন্দে লালদুর্গের যে লৌহকপাট সুদীর্ঘ সাড়ে তিন দশক ধরে অবিচল দাঁড়িয়েছিল, তাকে চূর্ণ করার ইতিহাস কেবল কোনো সাধারণ রাজনৈতিক পালাবদল নয়; তা ছিল রাজনীতির অলৌকিক রূপান্তরের এক মহাকাব্য। রাজনৈতিক সমীকরণের চোরাস্রোতে নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে বিজেপি-র Natural Ally হিসেবে উঠে আসা এক অগ্নিকন্যা কীভাবে পরবর্তীকালে নিজেই বামপন্থার চিরাচরিত জনমোহিনী চরিত্রটিকে আত্মস্থ করে বামশাসনকে ধূলিসাৎ করলেন, তা সমকালীন ইতিহাস ও রাজনীতির এক অনন্য বিস্ময়।
নব্বইয়ের দশকের শেষে কেন্দ্রে অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্তর্ভুক্তি এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বঘোষিত ‘স্বাভাবিক মিত্রতা’ ছিল রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার এক সুচতুর রণকৌশল। সিপিএমের সুসংগঠিত ক্যাডার বাহিনীর বিরুদ্ধে একক লড়াই যখন প্রায় অসম্ভব ঠেকছিল, তখন দিল্লির কেন্দ্রীয় রাজশক্তিকে পাশে পাওয়াটা ছিল সময়ের দাবি। কিন্তু কেবল ডানপন্থী মিত্রতায় যে বাংলার সাধারণ শ্রমজীবী ও কৃষকশ্রেণীর মণিকোঠায় স্থান পাওয়া সম্ভব নয়, তা বুঝতে ভুল করেননি এই দূরদর্শী রাজনীতিক।

সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের রক্তাক্ত জমি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের রাজনৈতিক অবয়বে এক আমূল রূপান্তর আনলেন। সিপিএমের হাত থেকে তিনি কেড়ে নিলেন তাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার—‘কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের মসিহা’ হওয়ার বামপন্থী ব্যাচটি। এটি কেবল মতাদর্শের পরিবর্তন ছিল না, এটি ছিল কৌশলী আত্মস্থকরণ।
তিনি লাল পতাকার বামপন্থাকে সরিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন এক নিজস্ব ‘জনমুখী বামপন্থা’, যেখানে রাজপথের লড়াই ছিল, কিন্তু পার্টির লৌহশৃঙ্খলা ছিল না। বিজেপি-র সঙ্গে অতীতের সখ্যকে একপাশে সরিয়ে তিনি নিজেকে উপস্থাপন করলেন শোষিত ও বঞ্চিতের একচ্ছত্র নেত্রী হিসেবে। ফলস্বরূপ, ২০১১ সালের মহাকরণ দখলের মাধ্যমে পতন ঘটলো ৩৪ বছরের লালদুর্গের।
লালদুর্গ ভাঙার এই লড়াইয়ে মমতার রণকৌশল প্রমাণ করেছে—রাজনীতি আসলে এক প্রবাহমান নদী। স্বাভাবিক মিত্রতার আশ্রয় থেকে শুরু করে বামপন্থার মৌলিক সুরটিকে ছিনিয়ে নিয়ে শাসককে পরাস্ত করার এই যাত্রা বঙ্গ রাজনীতির ইতিহাসে এক চিরস্থায়ী সাহিত্যিক রূপক হয়ে থাকবে।

