“বাবুরাম সাপুড়ে, / কোথা যাস্ বাপুরে? / আয় বাবা দেখে যা, / দুটো সাপ রেখে যা”
বাংলা ভাষার সবচেয়ে পরিচিত সাপটি কোনো গভীর অরণ্যে নয়, বরং আশ্রয় নিয়েছে সুকুমার রায়ের ছড়ায়। সেখানে সাপ মূলত হাস্যকৌতুকের চরিত্র; কিন্তু গ্রামীণ বাস্তবে সে ভয়, বিশ্বাস ও সহাবস্থানের এক প্রাত্যহিক প্রতীক।
বাংলার অন্য প্রান্তে, শ্রাবণের ভেজা দুপুরে, ধানের খেত কিংবা পুরোনো ভাঙা ভিটেয় ফণা তোলা কেউটে, গোখরো, কালাচ বা চন্দ্রবোড়ার সামনে দাঁড়িয়ে কৃষিজীবী ও লোকায়ত সমাজকে দুই হাত জোড় করে উচ্চারণ করতে হয়—”জয় মা বিষহরি।”
এই দুই জগতের মাঝখানেই আসলে লুকিয়ে রয়েছে এক দীর্ঘ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস—যেখানে পরিবেশ, শ্রম, ভয় ও বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলো বেঁচে থাকার পথ খুঁজে পেয়েছে।

বাংলার জলবায়ু ও ভৌগোলিক পরিবেশ সাপের আদর্শ আবাস্থল। নদী, বিল, জলাভূমি, ধানখেত ও বাঁশবন মিলিয়ে এই ভূখণ্ডে বহু প্রজাতির সাপের বাস। বর্ষাকালে জল বাড়লে সাপ মানুষের বসতিতে ঢুকতে শুরু করে। প্রতিদিনের এই চরম বিপদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষ কেবল অস্ত্রের ওপর ভরসা করতে পারেনি। তখন আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বা প্রতিষেধকের সহজ সুযোগই বা কোথায়? ফলে মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল সামাজিক রীতি নীতির উপর যাতে সে ভয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে বাঁচতে পারে।
ইতিহাসবিদ নীহাররঞ্জন রায় দেখিয়েছেন, বাংলার বহু লোকদেবতার উৎস ব্রাহ্মণ্য ধর্মতন্ত্রের বাইরে, গ্রামীণ সমাজের নিজস্ব সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতায়। পরবর্তীতে ধর্মীয় ও সামাজিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে সেই দেবতারা ধীরে ধীরে বৃহত্তর হিন্দু ধর্মব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।আধুনিক সমাজ বিজ্ঞানীরা একে ‘সংস্কৃতায়ন’বা Sanskritisation বলে ব্যাখ্যা করলেও, এটি ছিল একটি দ্বিমুখী আদান-প্রদান। লোকসংস্কৃতি গবেষক আশুতোষ ভট্টাচার্যের মতে, বাংলার সর্পবিশ্বাস বিচ্ছিন্ন কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছিলনা; এটি লোকসাহিত্য, কৃষিজীবন, ঋতুচক্র ও পরিবেশগত অভিযোজনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। পাশাপাশি মানুষ এটাও বুঝেছিল ভয়কে নির্মূল করা কার্যত অসম্ভব, তাই মানুষ এই ভয় কেই সংস্কৃতির অংশে রূপান্তরিত করে জন্ম দিয়েছে বিষহরি বা মা মনসার পূজা অর্চনায় এবং তারই জনউৎসব—’ঝাঁপান’।
‘ঝাঁপান’ শব্দটির অর্থ বা মানে নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ একে ‘ঝাঁপি’ (যে পাত্রে সাপুড়েরা সাপ রাখে) শব্দের সঙ্গে যুক্ত করেন, আবার কেউ উঁচু মঞ্চ বা ‘ঝাঁপ’ থেকে এর উৎপত্তি বলে মনে করেন। তবে শব্দমূল যা-ই হোক না কেনো , এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কিন্তু মানুষ, প্রকৃতি ও সাপের দীর্ঘ সহাবস্থানের ইতিহাস।
প্রসঙ্গত মনসামঙ্গল কাব্য এই লোক বিশ্বাস কে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ও সাহিত্যিক গভীরতা দিয়েছে। তাই চাঁদ সদাগর, বেহুলা ও লখিন্দরের কাহিনি শুধু মাত্র ধর্মীয় আখ্যান নয়; এই কারণে অধ্যাপক সুকুমার সেন মনসামঙ্গল কে মধ্যযুগীয় বাংলার কৃষিজীবন, নদীপথের বাণিজ্য ও regional সামাজিক জীবন বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক উৎস হিসেবে বিবেচনা করেছেন।মনসামঙ্গলের দেবী মনসা পুজো চান, কিন্তু বণিক চাঁদ সদাগর সেই পুজো দিতে অস্বীকার করেন। এটি আসলে দুটি সামাজিক মূল্যবোধের সংঘাত—শাস্ত্রসমর্থিত সামাজিক মর্যাদা বনাম লোকসমাজের নিজস্ব বিশ্বাসের বৈধতা।অন্যদিকে বেহুলার ভাসমান ভেলার যাত্রা পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরেই নারীর এক ব্যতিক্রমী ও সক্রিয় সংগ্রামের প্রতীক। ঝাঁপানের মঞ্চে আজও সেই আখ্যান বইয়ের পাতা ছেড়ে মানুষের জীবন্ত কণ্ঠে ফিরে আসে।
ঝাঁপানের মূল শক্তি কিন্তু লুকিয়ে রয়েছে এর সামাজিক বিন্যাসে। এই উৎসবের প্রধান বাহক ও রূপকার কিন্তু বেদে, মাল, বাউড়ি, ডোম, সাপুড়ে, মৎস্যজীবী, কৃষিশ্রমিক ও স্থানীয় বনবাসী সম্প্রদায়।
ঐতিহাসিক রণজিৎ গুহের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলা যায়, ইতিহাস কেবল শাসক বা বিজয়ীদের আখ্যান নয়; প্রান্তিক মানুষেরও নিজস্ব রাজনৈতিক-সাংশ্কৃতিক ভাষা থাকে। ব্রাহ্মণ্য শাস্ত্র নির্ভর ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের বাইরে ঝাঁপান লোক সমাজের নিজস্ব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসর নির্মাণ করেছে।
এই প্রসঙ্গে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ উপন্যাসের সেই ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির কথা স্মরণ করা যেতে পারে, যেখানে বিভূতিভূষণ লিখছেন:
“বিজিত অনার্য জাতিদের ইতিহাস কোথাও লেখা নাই… সে লিপির পাঠোদ্ধার করিতে বিজয়ী আর্যজাতি কখনো ব্যস্ত হয় নাই। আজও বিজিত হতভাগ্য আদিম জাতিগণ তেমনই অবহেলিত, অবমানিত, উপেক্ষিত… সভ্যতাদর্পী আর্যগণ তাহাদের দিকে কখনো ফিরিয়া চাহে নাই, তাহাদের সভ্যতা বুঝিবার চেষ্টা করে নাই, আজও করে না।” ঝাঁপানের সামাজিক প্রেক্ষাপটের ওপর দাঁড়িয়ে আমরা ঠিক একই ধরনের ঐতিহাসিক প্রবণতা দেখতে পাই। মূলধারার সমাজ যাঁদের অবহেলিত করে এসেছে, সেই নিম্নবর্গের মানুষরাই প্রকৃতপক্ষে প্রকৃতি ও প্রাণী বিষয়ক দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানকে জিইয়ে রেখেছেন।
জেমস সি. স্কটের (James C. Scott) ‘Everyday Forms of Resistance’-এর দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ঝাঁপানের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে লোক সমাজের সাংস্কৃতিক আত্মরক্ষার এক অন্তঃসলিলা প্রবণতা কে।
এই পূজোর নেতৃত্ব কোনো শাস্ত্রজ্ঞ পুরোহিতের হাতে ছিল না—ছিল গ্রাম্য সেবাইত, ওঝা ও সাপুড়েদের হাতে। তাই ঝাঁপানের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে ধর্মীয় কর্তৃত্ব শাস্ত্রের জ্ঞানতন্ত্রের বদলে বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর প্রতিষ্ঠিত।
পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপানের রূপ, পরিবেশনা এবং লোকছড়ার বিষয়বস্তুতেও স্পষ্ট বৈচিত্র্য দেখতে পাওয়া যায়। যেমন রাঢ় বাংলার বাঁকুড়ায় বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজাদের দীর্ঘ পৃষ্ঠপোষকতায় যে সাংস্কৃতিক আবহ তৈরি হয়েছিল, সেখানে ঝাঁপানের ছড়ায় দেবীর মাহাত্ম্য ও শিবের পরিবার স্থান পেয়েছে:
“পদ্মা বলে শিব শোনেন বসে কৈলাসে। / মর্ত্যলোকে পূজা হবে বারো মাসে॥”
আবার নদীয়া অঞ্চলে ঝাঁপান গানে মনসামঙ্গলের জন্মপালা ও লখিন্দরের উপাখ্যানের সুর বেশি প্রচলিত:
“জাগো গো বিষহরি পদ্মাবতী মাতা। / মর্ত্যে এসে পুজো লও হয়ে ত্রাতা॥”
বর্ধমান ও মেদিনীপুরের গ্রামীণ মেলায় ওঝা-বৈদ্যদের মুখে শোনা যায় বাণিজ্য বিষহরির টান:
“মন্ত্র পড়ে সাপের বিষ করি নিবারণ। / মা বিষহরির কৃপায় বাঁচে ত্রিভুবন॥”

অন্যদিকে হুগলি জেলার বলাগড় ব্লকের ইঞ্চুড়ায় আজও পালিত হয় অন্যতম বৃহৎ বিষহরি ঝাঁপান উৎসব। সেখানে বিশাল মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সাথে চলতে থাকে পুজো-অর্চনা এবং হাজার হাজার পাঁঠাবলির লৌকিক প্রথা—যা বংশপরম্পরায় চলে আসছে।
প্রচলিত লোকগান ও মৌখিক ছড়াতেই এখানকার উৎসবের মূল আকর্ষণ ধরা পড়ে:”শ্রাবণের শেষে ভাদ্রের শুরুতে, / মনসা মা জাগে ইঞ্চুরাতে; / হুগলি জেলার সেরা মেলা, / আমাদের এই ইঞ্চুরার বিষহরি মেলা।”
এই স্থানীয় মৌখিক ছড়া ও ঐতিহ্য ইঞ্চুরার মেলার মূল প্রাণস্পন্দন।
পাশাপাশি নদীয়া ও মুর্শিদাবাদে হিন্দু আচারের সমান্তরালে মুসলিম গায়েনদের মনসামঙ্গল পরিবেশন এই উৎসবের ধর্মীয় সমন্বয় বহুত্ববাদী চরিত্রকে সার্থকভাবে তুলে ধরে।
অনেক গবেষক মনে করেন আসলে, ঝাঁপানের দিন শুধু পূজা হয় না, বরং ঝাঁপানের মেলাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এক সমান্তরাল আচারনির্ভর অর্থনীতি (Ritual Economy)। মেলায় খেলনা, বাঁশের জিনিস, কৃষিজ সরঞ্জাম, মিষ্টি ও নাগর দোলা যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে নতুন প্রাণ দেয়। অন্যদিকে
সারা বছর ধরে অবহেলিত অবস্থানে পড়ে থাকা প্রান্তিক কারিগর ও সাপুড়েরা এই কয়েকটি দিনের জন্য বিশেষ সামাজিক মর্যাদা ও প্রতীকী পুঁজি (Symbolic Capital) অর্জন করেন।এর পাশাপাশি আমাদের ভুললে চলবে না ঝাঁপান এর ভেতর একই সঙ্গে লুকিয়ে আছে গভীর পরিবেশগত প্রজ্ঞা। কৃষিজীবী সমাজ বুঝত, সাপ জমিতে ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ করে ফসল রক্ষা করে। আজকের ভাষায় একে আচার ভিত্তিক পরিবেশ চেতনার (Ritual Ecology) একটি রূপ বলা যেতে পারে।
কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও এটা সত্যি ১৯৭২ সালের বন্যপ্রাণ (সংরক্ষণ) আইন কার্যকর হওয়ার পর থেকে, বিশেষত ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগ ও ২০০০-এর দশক থেকে এর প্রয়োগ কঠোর হওয়ায় ঝাঁপানের মেলায় জীবন্ত সাপ প্রদর্শন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে আজ জীবন্ত সাপের কসরত প্রায় নেই বললেই চলে; তার জায়গায় এসেছে প্রতীকী সর্পপূজা, মনসামঙ্গল গান ও লোকনাট্য। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার তাগিদে এই আইন অত্যন্ত জরুরি হলেও, এর সঙ্গে যুক্ত পেশাগত সংকটটি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বংশানুক্রমিক সাপুড়ে ও সংগ্রাহক সম্প্রদায়ের বিকল্প জীবিকার অভাব আজ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে; বাস্তবে সাপুড়েরা গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। কিন্তু তা সত্ত্বেও ঝাঁপান উৎসব কিন্তু বন্ধ হয়নি। অপরদিকে
ঝাঁপান কে আজকের আধুনিক কিংবা নগরকেন্দ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি অন্ধ কুসংস্কারাচ্ছন্ন প্রথা বা মেলা বললে কিন্তু ভুল হবে এবং তা আপত্তিজনক কারণ এতে সমাজতাত্ত্বিক ইতিহাসটা আড়ালে থেকে যায়।কারণ নৃতত্ত্ববিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা ঝাঁপান এর সংস্কৃতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এক গভীর মানবিক সমাজভাষ্যের কথা তুলে ধরেছেন—মানুষ চিরকাল ‘দুর্যোগকে সমাজে রূপান্তর’ করেছে, অর্থাৎ দুর্যোগের সামাজিকীকরণ করে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।
এই প্রসঙ্গে আমরা যদি শীতলা পুজো কিংবা ওলাইচণ্ডী ও ওলাবিবির উপাখ্যানের দিকে তাকাই, তবে দেখব মহামারী বা বসন্ত রোগ কোনো একক ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিপদ ছিল না; বরং ব্যক্তির অসুস্থতার ভেতরে লুকিয়ে ছিল পুরো সমাজ বা গোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ। ফলে সেই সামাজিক দুর্যোগ ও ভয়ের মুখ থেকেই জন্ম নেয় সমবেত পুজো-অর্চনা ও নানা আচার আচরণ ও সংস্কৃতি; এবং এই নতুন ধাঁচের সংস্কৃতি কার্যত সংকটের দিনে মানুষে মানুষের সামাজিক বন্ধন গড়ে তোলে। এই যৌথ যূথবদ্ধতাই প্রান্তিক মানুষদের নতুন করে বাঁচতে শেখায়। ঝাঁপানের অন্তঃসলিল মনস্তত্ত্বও ঠিক একই লোকায়ত দর্শনে বাঁধা। সাপের কামড় কিংবা প্রকৃতির হিংস্র বিষ কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত দুর্ঘটনা নয়—তা নদী, বিল ও বাঁশবন ঘেঁষা গ্রামীণ ভূখণ্ডের এক সার্বিক দুর্যোগ।আর ঝাঁপান হলো সেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তৈরি হওয়া এক গভীর যূথবদ্ধ সমাজচিন্তা। মূলধারার সমাজ যাঁদের অবহেলিত বা প্রান্তিক করে রেখেছে—সেই বেদে, মাল, সাপুড়ে, বাউড়ি কিংবা কৃষিজীবী মানুষগুলো বিষধর সাপের ভয়কে একা বহন করেনি; তারা তাকে একটি যৌথ লোকউৎসবে রূপ দিয়েছে।সেখানে ফণার সামনে দাঁড়ানোর যে প্রতিদিনের প্রাণপণ লড়াই, তা কোনো একক ব্যক্তির কসরত নয়; তা যৌথভাবে টিকে থাকার এক সামাজিক চুক্তি।
শ্রাবণের শেষ বিকেলে ঝাঁপানের যে কোনো মেলাপ্রাঙ্গণ থেকে ফেরার সময়, সন্ধ্যার ঘনায়মান ছায়ায় আপনার মনে পড়ে যেতে পারে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ উপন্যাসের সেই বিখ্যাত বিষণ্ণ ঐতিহাসিক প্রজ্ঞা:
“বেলা প্রায় হেলিয়া পড়িয়াছে, হলদে রোদ পত্ররাশির গায়ে… অপরাহ্ণের সেই ঘনায়মান ছায়া এই সুপ্রাচীন রাজসমাধিকে যেন আরো গম্ভীর, রহস্যময় সৌন্দর্য দান করিল।” মেলাপ্রাঙ্গণে নেমে আসা এই ছায়া কেবল একটি উৎসবের সমাপ্তি নয়; রাষ্ট্রীয় আইনি নিয়ন্ত্রণ, জীবিকা হারানো আর আধুনিক সভ্যতার উদাসীনতায় কোণঠাসা হয়ে পড়া এক সুপ্রাচীন প্রথার নিরুচ্চার আত্মপক্ষ সমর্থন।
মেলা ভাঙার বিষণ্ণতার মাঝখানে শূন্য বাঁশি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা প্রান্তিক সাপুড়েদের মুখের দিকে তাকালে কবির সুমনের গানের লাইনগুলি বড় বেশি প্রাসঙ্গিক বলে মনে হবে:
“আমার ঘাঁটিতে আমি শানিয়ে রেখেছি সুরগুলো, / সাপুড়ে কণ্ঠ শুনে ঘাতক ফণাটা তুমি তোলো—”
এই লেখার শেষ প্রান্তে এসে এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—আজকের এই আধুনিক ও প্রযুক্তি নির্ভর সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা কেন ঝাঁপানের ইতিহাস লিখব, আর আপনারাই বা কেন পড়বেন? কী লাভ এতে? শুধুই কি অতীতমুখী নস্টালজিয়া, নাকি কোনো রোমাঞ্চকর লোকপ্রথাকে জনপ্রিয় করে তোলার ব্যক্তিগত তাগিদ?
উত্তরটা অত্যন্ত স্পষ্ট—না। ঝাঁপানের ইতিহাস লেখার মূল তাগিদ লুকিয়ে আছে ইতিহাসচর্চার নিজস্ব মানবিক ও বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গিতে।
ইতিহাস যে কেবল শাসক, বিজয়ী বা রাষ্ট্রযন্ত্রের নথিকে লিপিবদ্ধ করে রেখে দেয় তা নয়; বরং চরম প্রতিকূলতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ যে অস্তিত্ব রক্ষার সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিল, তাকে বিশ্লেষণ ও নথিভুক্ত করাটাই আজকের সময়ের দাবি এবং আধুনিক ইতিহাসচর্চার নতুন গতিপথ।
হাজার হাজার বছরের প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সামাজিক বর্জন আর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও মানুষ যেভাবে তার সংগ্রামশীল সাংস্কৃতিক সত্তাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার গান গেয়েছে—আজকের এই বিচ্ছিন্নতার যুগে সেই অদম্য যৌথ লড়াইয়ের গল্পকে পুনঃপ্রচার করা ভীষণ জরুরি। শুধুমাত্র সমাজের অবহেলাকে জয় করা নয়, বরং তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সমাজবদ্ধভাবে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার এই আদিম রূপটিই প্রকৃতপক্ষে মানবতাবাদ।
তাই ঝাঁপানের সংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত কেবল সর্প প্রদর্শনী বা পাঠাবলি সহ মানুষের মানত পূরণের মেলা নয়; বরং বিশ্বায়নের এই আধুনিক যুগে সব রকমের প্রতিকূলতার মুখে দাঁড়িয়ে, স্বকীয় সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে বাঁচিয়ে রাখার এক অনমনীয় মানবিক আত্মবিশ্বাসের মহাজাগতিক দলিল।

