রাষ্ট্রের নীতিমালার চকচকে আয়নায় যখন বেকারত্বের হার কমার গল্প শোনানো হয়, তখন তা কেবলই গাণিতিক সান্ত্বনা হয়ে দাঁড়ায়। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, ভারতের প্রকৃত কর্মসংস্থানের সংকট কেবল পরিসংখ্যানের মারপ্যাঁচে ঢাকা পড়ে থাকা কোনো সাময়িক বিচ্যুতি নয়; এটি এক গভীর কাঠামোগত ব্যাধি ।
কাগজে-কলমে যেখানে বেকারত্বের হার ৩.১ শতাংশে নেমে আসার কথা বলা হয়, সেখানে সমাজের তলায় লুকিয়ে থাকে এক নীরব আর্তনাদ ।
সরকারি নথিতে ‘আনএম্প্লয়মেন্ট রেট’ বা ‘ইউইআর’ (UER)-এর ওপর ভিত্তি করে দেশের চাকরির বাজার মাপা হয়। এই হিসেব অনুযায়ী, কর্মক্ষম জনসংখ্যার মধ্যে যাঁরা সক্রিয়ভাবে কাজ খুঁজছেন এবং কাজ পাচ্ছেন না, কেবল তাঁদেরই বেকার হিসেবে গণ্য করা হয় । কিন্তু সমস্যা শুরু হয় ঠিক এখানেই। যখন কোনো চাকরিপ্রার্থী বছরের পর বছর ইন্টারভিউ দিয়ে, নিয়োগ দুর্নীতির শিকার হয়ে, বা প্রশ্নপত্র ফাঁসের যন্ত্রণায় ক্লান্ত হয়ে হাল ছেড়ে দেন, তখন তিনি আর ‘সক্রিয় চাকরিপ্রার্থী’ থাকেন না । পরিসংখ্যানের খাতা থেকে তাঁর নাম মুছে যায়, আর রাষ্ট্র উল্লাসে ঘোষণ করে বেকারত্বের হার কমে গেছে ।
ভারতের মতো বিশাল যুব জনগোষ্ঠীর দেশে, যেখানে প্রায় ৩৬.৮ কোটি মানুষ যুব বয়সের সীমায়, সেখানে ২৫ শতাংশ মানে প্রায় ৯.২ কোটি তরুণ-তরুণী সম্পূর্ণ বেকার। ।
এই সংকটের অন্দরে প্রবেশ করলে দেখা যায় এই বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি মেয়েদের ক্ষেত্রে। গ্রামীণ কিংবা শহুরে রক্ষণশীল সামাজিক রীতিনীতি, শিক্ষার সুযোগের অভাব এবং নিরাপত্তার ঘাটতি বহু মেধাবী তরুণীকে কর্মক্ষেত্রের বাইরে ঠেলে দেয় । তাঁরা প্রাতিষ্ঠানিক চাকরির বাজারে নিজেদের দাবি জানাতে পারেন না, ফলে তাঁরা সরকারি বেকারত্বের পরিসংখ্যানেও স্থান পান না । এটি কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, এটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় ভারতবর্ষের লিঙ্গবৈষম্যকে৷
রাজনীতি কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, রাজনীতি হলো ভবিষ্যৎ নির্মাণের বুনিয়াদ। কিন্তু গত এক দশকে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য স্তরের বাজেটে শিক্ষার অংশীদারিত্ব ক্রমাগত কমেছে । যেখানে চীন তাদের বার্ষিক বাজেটের প্রায় ১২ শতাংশ এবং ব্রাজিল প্রায় ২০ শতাংশ শিক্ষায় ব্যয় করে, সেখানে ভারতের কেন্দ্রীয় বাজেটে শিক্ষার অংশ নামতে নামতে মাত্র ২.৫ শতাংশে ঠেকেছে ।
শিক্ষার এই অবমূল্যায়নের সরাসরি প্রভাব পড়ছে তরুণ প্রজন্মের ওপর। প্রতি বছর দেশ থেকে প্রায় ৫০ লাখ স্নাতক বের হচ্ছেন , কিন্তু তাঁদের জন্য নেই কোনো স্থায়ী বা মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান।
দেশের জিডিপি (GDP) বৃদ্ধির হার যতই আকাশছোঁয়া হোক না কেন, সাধারণ মানুষের জীবনে তার সুফল পৌঁছাচ্ছে কি না—সেটি আজ এক বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন । অর্থনীতিবিদদের মতে, জিডিপি বৃদ্ধি উন্নয়নের একটি প্রয়োজনীয় শর্ত হতে পারে, কিন্তু তা পর্যাপ্ত শর্ত নয় । গত এক দশকে কর্মসংস্থানের যেটুকু বৃদ্ধি ঘটেছে, তার বড় অংশই মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে কৃষিক্ষেত্রে কিংবা অত্যন্ত নিম্ন আয়ের অস্বস্তিকর স্ব-সংস্থানের চক্রে । ফলে মানুষ কাজ পেলেও তাঁদের প্রকৃত মজুরি ও স্থায়িত্ব বাড়েনি ।
২০২৬ সালের মধ্যভাগে এসে তরুণ প্রজন্মের বেকারত্বের হার ১৬ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যা সাম্প্রতিক রেকর্ডগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ । অথচ এই সময়ে সামগ্রিক যুব শ্রমশক্তি অংশগ্রহণের হার আরও কমেছে । অর্থাৎ, একদিকে কাজের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে, অন্যদিকে হতাশার কারণে মানুষ কাজ খোঁজাটাই বন্ধ করে দিচ্ছে।
রাষ্ট্র যে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতির সুবিধার কথা বলে গলা ফাটায়, তা যদি সঠিকভাবে শাণিত না করা হয়, তবে তা এক বিরাট টাইম বোমায় পরিণত হতে সময় লাগবে না।

