ক্যাম্পাসে গ্রাফিতিতে চুনকাম ও রাষ্ট্রের ছায়া বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় বন্ধ করে সার্বিক হোক নির্বাচন! তবেই সাপমুক্তি হবে পশ্চিমবঙ্গের? বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটে জিতে মোদীর সঙ্গে ব্রেকফাস্ট! সায়নী, কাকলীরা আর জিতবেন? প্রতিবাদী মানেই ‘অ্যান্টিন্যাশনাল’ নয়, ভাগবতের কথা কি মাথায় রাখবে তথাকথিত ‘দেশভক্ত’রা? বাঁকিপুরের ঝাঁকি, সঙ্গে CJP! ঘুরে দাঁড়াতে পারবে BJP? গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কাঁটা মোদী-শাহ’র CPIM থেকে BJP হয়ে তৃণমূল! বিরোধী হলেই কাদা-ডিম্ ছোঁড়ার রাজনীতি বাংলায়, কবে বদলাব আমরা? জমিতেও হিন্দু-মুসলমান? মুখ্যমন্ত্রীর ‘ল্যান্ড জিহাদ’ মন্তব্যে শোরগোল বঙ্গ রাজনীতিতে রেখা পাত্রের বিরুদ্ধে বাড়ি দখলের অভিযোগ, শর্বরীর বিরুদ্ধে দোকান! তোলাবাজির TMC-BJP হয়?

​বাংলা ভাষার সাথে ইসলামি প্রভাবের সম্পর্ক: হিন্দুত্ববাদীদের অস্বীকার বনাম ইতিহাস

৩৮ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

ভারতের বাংলা ভাষাকে বাংলাদেশের বাংলা থেকে আলাদা করে দেখানোর প্রচেষ্টায় শাসক দল বিজেপি কার্যত একটি নতুন ভাষার নাম চালু করেছে— ‘বাংলাদেশি’। এমনই বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে দিল্লি পুলিশের একটি চিঠিকে কেন্দ্র করে।
বাংলা ভারতের দ্বিতীয় সর্বাধিক কথিত ভাষা এবং সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত ২২টি স্বীকৃত ভাষার অন্যতম। ভারতে প্রায় ১০ কোটি এবং বাংলাদেশে প্রায় ১৬ কোটি মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত এবং বিশ্বের অন্যতম প্রধান ভাষা হিসেবেও বাংলার স্বীকৃতি রয়েছে। ভারত, বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে ভাষাটির পরিচিত নাম একটাই— বাংলা।

কিন্তু ২৯ জুলাই দিল্লি পুলিশ একটি চিঠিতে বাংলা ভাষাকে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ বলে উল্লেখ করার পরই শুরু হয় বিতর্ক। সেই মন্তব্যের পক্ষেই প্রকাশ্যে সওয়াল করেন বিজেপির তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের প্রধান ও মুখপাত্র অমিত মালব্য। ৪ অগস্ট সোশ্যাল মিডিয়ায় মালব্য দাবি করেন, অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে দিল্লি পুলিশের ‘বাংলাদেশি ভাষা’ শব্দপ্রয়োগ একেবারেই সঠিক। তাঁর যুক্তি, বাংলাদেশের বাংলা কেবল উচ্চারণেই নয়, উপভাষাগত দিক থেকেও ভারতের বাংলা থেকে আলাদা। তিনি সিলেটি উপভাষার উদাহরণ টেনে বলেন, সেটি নাকি ভারতের বহু বাঙালির কাছেই প্রায় দুর্বোধ্য। আরও এক ধাপ এগিয়ে মালব্য দাবি করেন, “সমস্ত বৈচিত্র্যকে একত্রে ধারণ করে এমন কোনও ‘বাংলা’ ভাষা আসলে নেই।” তাঁর কথায়, “বাঙালি একটি জাতিগত পরিচয়, ভাষাগত একরূপতা নয়।”


ভাষাবিদদের মতে, দাবি কতটা সঠিক?

বিশিষ্ট ভাষাবিদদের মতে, এই বক্তব্য তথ্যভিত্তিক নয়। প্রথমত, দিল্লি পুলিশ যে প্রসঙ্গে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ শব্দটি ব্যবহার করেছে, তা ছিল লিখিত বাংলা ভাষা ও বাংলা লিপি নিয়ে। পরিচয়পত্রে ব্যবহৃত বাংলা লিপি ভারত ও বাংলাদেশে মূলত একই। সেখানে উপভাষার প্রশ্নই ওঠে না। দ্বিতীয়ত, পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেই বিভিন্ন অঞ্চলের কথ্য বাংলার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। যেমন পুরুলিয়া-ঝাড়গ্রামের বাংলা এবং জলপাইগুড়ি-কোচবিহারের বাংলা অনেক ক্ষেত্রেই পরস্পরের কাছে বেশি দুর্বোধ্য হতে পারে, অথচ নদিয়ার বাংলা এবং বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার বাংলার মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া তুলনামূলকভাবে সহজ।

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়


সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় কী বলেছিলেন?

ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর ১৯২৬ সালের গ্রন্থ The Origin and Development of the Bengali Language-এ স্পষ্টভাবে লিখেছেন, বাংলা ভাষার একটি সর্বজনীন (Pan-Bengali) ভিত্তি রয়েছে। তাঁর মতে, বাংলা ভাষার বিভিন্ন উপভাষার উৎস ভিন্ন হলেও, তাদের মধ্যে এমন কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা তাদের একই ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত করে। সেই সাধারণ বৈশিষ্ট্যের উপর দাঁড়িয়েই গড়ে উঠেছে বাংলা সাহিত্যভাষা। চট্টোপাধ্যায় আরও জানান, সাহিত্যিক বাংলা মূলত পশ্চিম-মধ্য বাংলার ভিত্তিতে গড়ে উঠলেও, বিভিন্ন উপভাষার বৈশিষ্ট্যও সময়ে সময়ে এতে যুক্ত হয়েছে।


বিরোধীদের আশঙ্কা: ভুল ধারণা ছড়াচ্ছে কি?

সমালোচকদের মতে, অমিত মালব্যের মন্তব্য নিছক ভাষাতাত্ত্বিক বিতর্ক নয়; এর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবও রয়েছে।
গত এপ্রিলের শেষ থেকে বিজেপি-শাসিত একাধিক রাজ্যে বহু বাংলাভাষী ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশি সন্দেহে আটক করা হয়েছে। এমনকি কিছু প্রকৃত ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলা ভাষাকে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ বলে চিহ্নিত করা ভারতের বাংলা ভাষাভাষী নাগরিকদের নিরাপত্তা ও পরিচয় নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকেই।


বিজেপির আরও এক দাবি


বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ সভাপতি তথা রাজ্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্যও দিল্লি পুলিশের ভাষা ব্যবহারের সমর্থন করেছেন।
তাঁর দাবি, বাংলাদেশে ব্যবহৃত বাংলা এবং পশ্চিমবঙ্গের বাংলা স্পষ্টভাবে আলাদা। পশ্চিমবঙ্গের কোনও হিন্দু লেখকের বাংলা এবং বাংলাদেশের কোনও মুসলিম লেখকের বাংলা ভাষার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এখানে মূলত আরবি ও ফারসি শব্দের ব্যবহারকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে।

বাংলা বর্ণমালা


ভাষা এক, উপভাষা বহু

ভাষাবিদদের মতে, চট্টগ্রাম থেকে পুরুলিয়া, সিলেট থেকে সুন্দরবন, অসমের কাছাড়, ত্রিপুরা, মেঘালয় কিংবা উত্তরবঙ্গ— সর্বত্র কথ্য বাংলার রূপ ভিন্ন হলেও ভাষাটি একটাই। অসম ও ত্রিপুরার বাংলা অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের বাংলার কাছাকাছি, আবার উত্তরবঙ্গের বাংলা অসমিয়ার প্রভাব বহন করে। মধ্যবঙ্গের বাংলায় রয়েছে মৈথিলির প্রভাব, দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলায় ওড়িয়া, সাঁওতালি ও কুর্মালির ছাপও স্পষ্ট। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বাংলা উপভাষাকে চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করেছিলেন— রাঢ়, পুন্ড্র/বরেন্দ্র, বঙ্গ ও সুহ্ম। তাঁর মতে, উচ্চারণ ও শব্দরীতিতে পার্থক্য থাকলেও এগুলি একই বাংলা ভাষার বিভিন্ন রূপ মাত্র।
‘বাঙালি’ কি শুধু জাতিগত পরিচয়?

অমিত মালব্য যেখানে দাবি করেন, ‘বাঙালি’ কেবল একটি জাতিগত পরিচয়, ভাষাগত নয়— সেখানে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ঠিক উল্টো ব্যাখ্যা দেন। তাঁর মতে, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক উৎস আলাদা হওয়ায় উপভাষায় পার্থক্য এসেছে। কিন্তু সেই সব মানুষকে একসূত্রে বেঁধেছে বাংলা ভাষাই।


বাংলা ভাষায় ইসলামী প্রভাব কি নতুন?

বাংলা ভাষায় আরবি ও ফারসি শব্দের উপস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা হয়েছে। ‘বন্দে মাতরম্’-এর রচয়িতা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর বিবিধ প্রবন্ধ-এ লিখেছিলেন, আধুনিক বাংলা ভাষা সংস্কৃত, দেশজ ভাষা, আরবি এবং ফারসির মিলিত প্রভাবে গড়ে উঠেছে। ইতিহাসবিদ দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর History of Bengali Language and Literature গ্রন্থে দেখিয়েছেন, বাংলা ভাষার বিকাশের বড় অংশ ঘটেছে মুসলিম শাসনামলে। তাঁর মতে, মুসলিম শাসকেরাই বাংলা সাহিত্য ও ভাষার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। মার্কিন ইতিহাসবিদ রিচার্ড ইটন-ও তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, হোসেন শাহী আমলে বাংলা ভাষা রাজদরবারে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে এবং সংস্কৃত ও ফারসির পাশাপাশি বাংলার বিকাশ ত্বরান্বিত হয়।


শব্দ ধার করলেই কি নতুন ভাষা হয়?

১৯২৭ সালে প্রকাশিত The History of the Bengali Language গ্রন্থে ভাষাবিদ বিজয়চন্দ্র মজুমদার স্পষ্ট ভাষায় লিখেছিলেন, কোনও ভাষায় অন্য ভাষার শব্দ যোগ হওয়া মানেই সেই ভাষার নাম বদলে যায় না। তাঁর মতে, একটি ভাষা বিদেশি শব্দ গ্রহণ করলেও সেই শব্দগুলি ধীরে ধীরে ওই ভাষার নিজস্ব ব্যাকরণ ও ধ্বনিগত নিয়মের সঙ্গে মানিয়ে নেয়। ফলে শুধু শব্দভাণ্ডারের পরিবর্তন দিয়ে কোনও ভাষাকে নতুন ভাষা বলা যায় না।

সেই কারণেই ভাষাবিদদের একাংশের মতে, ‘বাংলাদেশি ভাষা’ নামে আলাদা কোনও ভাষার অস্তিত্ব ইতিহাস, ভাষাতত্ত্ব বা একাডেমিক গবেষণার কোথাও স্বীকৃত নয়। বাংলাদেশ ও ভারতের বাংলা ভাষার উচ্চারণ, উপভাষা ও শব্দচয়নে পার্থক্য থাকলেও, ভাষাবিদদের মতে সেগুলি একই বাংলা ভাষার বিভিন্ন আঞ্চলিক রূপ।

(প্রথম প্রকাশ OUTLOOK-এ )

অন্যান্য প্রতিবেদন.