হেমাঙ্গ-সলিলের দেশে, প্রতিবাদের গান যখন ‘শাসকপন্থী’

১৩০ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

“ফসল কাটার সময় হলে কাটবে সোনার ধান
দস্যু যদি লুটতে আসে কাটবে তাহার জান-রে।।”


সমাজ ও সময়ের দাবিতে পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো দেশের কোনো যুগের সাহিত্য শিল্প কেবলমাত্র বিনোদনের কাঁচের বাক্সে সুসজ্জিত থাকেনি৷ স্থান কাল পাত্র নির্বিশেষে শিল্প হয়ে উঠেছে জনগণের ভাষা৷ কখনও তা ব্যক্তিগত শোকতাপ আনন্দ আকাঙ্খা বিচ্ছেদ শঙ্কার, কখনও তা হয়ে উঠেছে সম্মিলিত ঐক্যতান৷ আপামর জনতা সোচ্চারে বলে উঠেছে “আমার প্রতিবাদের ভাষা”৷ আর এই শিল্প তার রূপ প্রকাশ করেছে গানে-নাটকে-সিনেমায়-ছবিতে কখনও বা দৃপ্ত স্লোগানে। যখনই রাজ্য রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি যন্তরমন্তরের ঘর, যখনই তাতে টারবাইনের চাকার মতন ঘুরতে থাকে মগজধোলাই, তখনই শিল্পের অবগুণ্ঠনের ছায়া পড়ে শিল্পীর ওপর৷ আর সেই মগজধোলাইয়ের সামনে বারবার ফিরে ফিরে আসে গুপিবাঘারা৷ কন্ঠ আর সুর হয়ে ওঠে প্রতিবাদের হাতিয়ার, সমাজ পরিবর্তনের চালিকাশক্তি।


আমাদের বাংলার গানের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা সহজেই সন্ধান পাব সেই সব রক্ত মাংসের গুপিবাঘাদের৷ বিশ শতকের প্রথমার্ধে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং পরবর্তীতে গণআন্দোলনের সমান্তরালে বিকশিত হয়েছিল প্রতিবাদের গান। অতুলপ্রসাদ সেনের ‘মোদের গরব, মোদের আশা, আমরি বাংলা ভাষা’ কিংবা ‘বল বল বল সবে, শত বীণা-বেণু রবে’ -গানগুলি কেবল সুরের মূর্ছনা ছিল না, ছিল পরাধীনতার বিরুদ্ধে জাতিকে জাগিয়ে তোলার মন্ত্র। সেই মহামন্ত্র আপামর দেশবাসীর মধ্যে যে তরঙ্গ উৎসারিত করেছিল, তার ধারা আজও বহমান৷


পরবর্তী চল্লিশের দশকে ভারতীয় গণনাট্য সংঘ (IPTA)-এর হাত ধরে হেমাঙ্গ বিশ্বাস, সলিল চৌধুরী, বিনয় রায়ের মতন প্রমুখ শিল্পীরা গণসঙ্গীতকে তুলে ধরেন মেহনতি মানুষের আন্দোলনের অবিচ্ছেদ্য অংশ রূপে। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের ‘শঙ্খচিল’, ‘মাউন্টব্যাটেন মঙ্গলকাব্য’ বা ‘আমরা তো ভুলব না’ গানগুলি শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে সরাসরি ছিল এক যুদ্ধবার্তা। যে বাংলা গান পরবর্তীতে স্লোগান হয়ে নান্দনিকতার রাংতায় সাজানো, ড্রয়িংরুমের বিলাসিতা থেকে উঠে এসে দাঁড়ায় চটকলে, চা-বাগানে, কৃষকের ধানখেতে। আকাশের আধফালি চাঁদ যেন হয়ে ওঠে কাস্তে৷


তেভাগা আন্দোলন থেকে শুরু করে অসমের ভাষা আন্দোলন—প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান মাঠে জেগে থেকেছে অতন্দ্র প্রহরীর মতো৷ আর এই জাগরণের পথে শাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে, চরম দারিদ্র্যকে সঙ্গী করেও গণসঙ্গীত শিল্পীরা কখনও কোনো সরকারের বা পুঁজিপতির তল্পিবাহক হননি। জীবনের জয়গান গাইতে গিয়ে তাদের আদর্শের পাশা খেলায় অবগাহন করতে হয়নি কখনও৷ দিনবদলের স্বপ্ন আর গণতন্ত্রের বীজমন্ত্র আজীবন নিজেদের পেশায় লালন পালন করে গেছেন তাঁরা৷ গান তাঁদের কাছে হয়ে উঠেছিল সমাজ পরিবর্তনের এক রাজনৈতিক হাতিয়ার। বিনোদনের শুল্ক নয়৷


গণসঙ্গীতের এই দ্রোহ চেতনাকে গণমানুষের আরও কাছে পৌঁছে দিয়েছিল তৎকালীন বাংলা চলচ্চিত্র। ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন এবং সত্যজিৎ রায়ের মতো পরিচালকেরা তাঁদের চলচ্চিত্রে সঙ্গীতকে প্রতিবাদের মোক্ষম ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেন।
‘মেঘে ঢাকা তারা’ বা ‘কোমল গান্ধার’-এ হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান, ‘পদাতিক’ বা ‘কলকাতা ৭১’-এ সলিল চৌধুরীর সুর —
চলচ্চিত্রে এই গানের ব্যবহার সমাজমানসকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। রুপোলি পর্দার মাধ্যমে প্রতিবাদের গান হয়ে উঠেছিল যৌথ স্মৃতির অংশ।


নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ‘তোমাকে চাই’ অ্যালবামের মাধ্যমে বাংলা গানের ধারায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন সুমন চট্টোপাধ্যায় (পরবর্তীতে কবীর সুমন)। নাগরিক জীবন, রাজনৈতিক অনাচার, ক্ষোভ প্রভৃতি অসন্তোষকে তিনি জীবনমুখী গানের আদলে তুলে ধরেন। তাঁর ‘হাল ছেড়ো না বন্ধু’, ‘পেত্রা’ বা ‘তুমি গান গেও না’-র মতো গানগুলি একসময় চ্যালেঞ্জ করেছিল শাসকের রক্তচক্ষুকে৷ কিন্তু, হায় সমাপতন৷ সময়ের গতিজাড্যে শিল্পীসত্তার স্বরুপ ম্রিয়মান৷ পরবর্তীতে তাঁর প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে অংশগ্রহণ, শাসকদের প্রতি একপাক্ষিকতা এবং ক্ষমতার পালাবদলের পর শাসকের বন্দনা তাঁর সেই আপসহীন ভাবমূর্তিকে এনে দাঁড় করায় প্রশ্ন চিহ্নের সামনে । যে কণ্ঠ একসময় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল, তা যেন হয়ে পড়ে ক্ষমতার বশংবদ। অপরদিকে নজরে পড়ে বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগের শিল্পী মৈথিলী ঠাকুর। লোকসঙ্গীত ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে অত্যন্ত প্রতিভাবান হওয়া সত্ত্বেও, তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান এবং ক্ষমতার শীর্ষস্তরের প্রতি প্রকাশ্য আনুগত্য উন্মোচন করে আজকের শিল্প সংস্কৃতির এক নবক্ষেত্র।


একদা যে লোকসংগীত শিল্পীদের কন্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়েছে জনের চেতনা, গণের দাবি সেই শিল্পীরাই আজ শাসকের পদলেহনে খুঁজে পান সার্থকতা! বর্তমান রাষ্ট্র রাজনীতির যে নয়া মোড়ক- পুঁজিবাদ ও নব্য-ফ্যাসিবাদ, তা শিল্পীকে করে তোলে ক্ষমতার অনুগত৷ নচেৎ সেই শিল্পীর ওপর নেমে আসে প্রান্তিকীকরণ( ব্যান কালচার)। অনেক শিল্পীই তাই আদর্শের চেয়ে রাষ্ট্রীয় অনুদান, পুরস্কার এবং দৃশ্যমানতাকে বেছে নিয়েছেন সানন্দে৷ শাসক দল বোঝে যে, একজন জনপ্রিয় শিল্পীকে নিজেদের শিবিরে টানতে পারলে এক বিশাল জনমতকে প্রভাবিত করা সহজ হয়। সুমন চট্টোপাধ্যায়ের মতো ক্ষুরধার ব্যক্তিত্ব বা মৈথিলী ঠাকুরের মতো তরুণ প্রজন্মের আইকনদের যখন শাসকের স্তুতি গাইতে দেখা যায়, তখন তা আসলে ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্যকেই পোক্ত করে। গান তখন আর পরিবর্তনের হাতিয়ার থাকে না, তা হয়ে ওঠে স্থিতাবস্থা (Status Quo) বজায় রাখার তন্ত্রী। স্বাভাবিক ভাবেই দেখা দেয় শিল্পের প্রতি মানুষের আস্থা সংকট। সাধারণ মানুষ যখন দেখেন যে শিল্পী একসময় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গান গেয়েছিলেন, তিনিই ক্ষমতার অলিন্দে গিয়ে সুর মেলাচ্ছেন, তখন সামগ্রিক প্রতিবাদী সংস্কৃতির ওপর থেকেই জনগণের আস্থা কমতে শুরু করে।শিল্পের এই আদর্শগত চ্যুতি বা বিবর্তন সমাজমানসে জন্ম দেয় এক গভীর শূন্যতাবোধ।


আদর্শের অবক্ষয় একটা জাতি তথা দেশকে কালগর্ভের ঘূর্ণাবর্তে নিয়ে এসে দাঁড় করায় খাদের কিনারে। শিল্পী সত্তার আদর্শ বজায় রাখতে দুবার কারাবন্দি হন হেমাঙ্গ বিশ্বাস৷ হয় তিনবছরের কারাবাস৷ অথচ, আজকের যুগে দাঁড়িয়ে যখন সুমন চট্টোপাধ্যায় বা মৈথিলী ঠাকুরের মতো শিল্পীদের ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার আকুলতা দেখা যায়, তখন একথা আর প্রমাণের দাবি রাখে না যে শিল্পের অভিমুখ জনতা থেকে সরে এখন ক্ষমতার দিকে যাত্রা শুরু করেছে। যা ফ্যাসিবাদের সহজাত প্রবৃত্তি৷


তবু, আমরা যারা আস্থা রাখি ‘জণগণমণঅধিনায়ক’-এ, তারা জানি ইতিহাস সাক্ষী—শাসকের স্তাবকতায় সাময়িক হাততালি মিললেও কালজয়ী সিংহাসনে আরোহন করা যায় না। মেহনতি মানুষের ঘামে ভেজা শরীর আর লড়াইয়ের মাটি থেকেই আবার জন্ম নেয় প্রতিবাদের গান। শিল্প সাময়িকভাবে পথ ভুললেও, গণচেতনার স্রোত তাকে আবার ফিরিয়ে আনে অভ্যুদয়ের পথে৷ সেই পথের শেষে আসমুদ্রহিমাচল গেয়ে ওঠে কোরাস-
” আহ্বান শোনো আহ্বান আসে মাঠঘাট বন পেরিয়ে
দুস্তর বাধা প্রস্তর ঠেলে বন্যার মতো এগিয়ে…. “

অন্যান্য প্রতিবেদন.