“কথা বলতে শিখুন, কারণ শান্ত বা নীরব থাকা মানুষের ওপরই সবসময় অন্যায় হয়। আর এটা প্রকৃতির নিয়ম — ছাগলকেই সবসময় বলি দেওয়া হয়, বাঘকে নয়।”— বাবাসাহেব ডঃ বি. আর. আম্বেদকর।
বাবা সাহেবের এই ঐতিহাসিক ডাককে সাথে নিয়েই দিল্লির যন্তরমন্তর চত্বর আজ এক নতুন ইতিহাসের জন্ম আমরা দেখতে পাচ্ছি। যদিও আন্না হাজারের দুর্নীতি-বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলন— দেশের বুক চিরে যখনই কোনো বড় ক্ষোভের জন্ম হয়েছে, তার ভরকেন্দ্র হয়ে উঠেছে এই জায়গাটা। কিন্তু গত কয়েকদিনে দিল্লির এই চত্বর যা দেখছে, তা এককথায় নজিরবিহীন। ভারতের ইতিহাসে সম্ভবত এই প্রথমবার, তথাকথিত ‘ডিজিটাল প্রজন্ম’ বা ‘জেন-জি’ (Gen Z) কোনো একটা নির্দিষ্ট দাবিকে কেন্দ্র করে এমন সুসংগঠিত, জোরালো আর রাষ্ট্র কাঁপানো গণ-আন্দোলন গড়ে তুলতে চলেছে।
ঘটনার মূল কেন্দ্রে রয়েছে ‘নিট’ (NEET) পরীক্ষার নজিরবিহীন প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারি। যে পরীক্ষার ওপর ভরসা করে দেশের লাখ লাখ মধ্যবিত্ত আর নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন, অথচ সেই পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে সামনে এসেছে দুর্নীতির বিশাল পাহাড় যা থমকে দিয়েছে আজকের যুবসমাজকে। তবে এই থমকে যাওয়াটা কোনো হতাশার নয়, বরং এই স্তব্ধতা আসলে এক মহাবিস্ফোরণের আগের নীরবতা। আর আজই সেই দিন যেখানে বিস্ফোরণটা ঘটেছে যন্তরমন্তরের বুকে। হাজার হাজার তরুণ-তরুণী, যাদের হাতে এতদিন স্মার্টফোন আর ল্যাপটপ দেখা যেত, তারা আজ প্ল্যাকার্ড আর স্লোগান হাতে দখল করেছে রাজধানীর রাজপথ।
এটি আর পাঁচটা চেনা রাজনৈতিক দলের তথাকথিত ‘স্পনসর্ড’ আন্দোলন নয়। এই আন্দোলন স্বতঃস্ফূর্ত, তীব্র এবং আপোসহীন। এই আন্দোলনের একমাত্র লক্ষ্য— দেশের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের নিঃশর্ত পদত্যাগ আর দেশের পুরো শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার।
যে কোনো বড় আন্দোলনের একটা প্রতীকী মুহূর্ত থাকে, যা সেই লড়াইয়ের গভীরতা আর নৈতিক দিকটাকে স্পষ্ট করে তোলে। এই আন্দোলনের ক্ষেত্রে সেই প্রতীকী চরিত্রটি হলেন অভিজিৎ দিপকে। সুদূর আমেরিকার নিরাপদ, গোছানো আর জাঁকজমকপূর্ণ জীবন ছেড়ে অভিজিৎ যখন দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পা রাখলেন, তখন তাঁর কাঁধে কোনো দামি ট্রাভেল ব্যাগ ছিল না, তাঁর ডান হাতে শক্ত করে ধরা ছিল বাবাসাহেব আম্বেদকরের লেখা ভারতের সংবিধান।
বিমানবন্দরে নেমেই অভিজিৎ সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে যা বললেন, তাতে এই আন্দোলনের আসল সুরটা বোঝা গেল। তিনি বলেন, “আমি কোনো রাজনৈতিক স্বার্থে আসিনি। আমি এসেছি কারণ আমার দেশের মেধা আজ বিক্রি হয়ে যাচ্ছে টাকার কাছে। যখন দেশের সংবিধানে সবার জন্য সমান অধিকারের কথা বলা আছে, তখন টাকার জোরে প্রশ্ন কিনে ডাক্তার হওয়ার এই নোংরা খেলা বন্ধ হওয়া দরকার। ইনক্লুসিভিটি বা সবাইকে সাথে নিয়ে চলা ছাড়া কোনো দেশ এগোতে পারে না।”একটা নিরাপদ আর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত থাকার পরেও অভিজিতের মতো তরুণদের এই অনিশ্চিত আর কণ্টকাকীর্ণ আন্দোলনের পথে পা বাড়ানো প্রমাণ করে যে, জেন-জি প্রজন্মকে যেভাবে ‘উদাসীন’ বা ‘রাজনীতি-বিমুখ’ বলে দেগে দেওয়া হয়েছিল, তা কত বড় ভুল ছিল। রাষ্ট্রের দমনপীড়নের রক্তচক্ষুকে পরোয়া না করে সরাসরি মুখোমুখি লড়াইয়ের এই সিদ্ধান্ত তাঁদের গভীর সামাজিক অঙ্গীকারেরই অকাট্য প্রমাণ।
আর যদি আপনি যন্তরমন্তর চত্বরে পা রাখেন তাহলে আপনার গায়ে লাগবে অদ্ভুত রোমাঞ্চ, গায়ে কাঁটা দেবে। আর দেখবেন বাতাসের গায়ে কোনো বারুদের গন্ধ পাবেন না, বরং পাবেন অধিকার আদায়ের তীব্র জেদ। চারপাশ থেকে ধেয়ে আসছে স্লোগান। একদিকে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের কর্মীদের গলা চিরে বেরোচ্ছে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, অন্যদিকে দলিত ও অনগ্রসর শ্রেণীর অধিকার রক্ষার স্লোগান ‘জয় ভীম’। আর এই সবকিছুর সমান্তরালে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ আর গণতান্ত্রিক কাঠামো রক্ষার উদ্দেশ্যে ধ্বনিত হচ্ছে ‘সংবিধান জিন্দাবাদ’।
সাধারণত ভারতীয় রাজনীতিতে এই স্লোগানগুলোর একসাথে থাকা খুব একটা দেখা যায় না। কিন্তু জেন-জি প্রজন্ম এই সমস্ত রাজনৈতিক আর আদর্শগত বিভাজনকে এক লহমায় মুছে দিয়েছে। জমায়েতে আসা আঠারো-উনিশ বছরের তরুণদের কাছে এই স্লোগানগুলো কোনো নির্দিষ্ট দলের সম্পত্তি নয় বরং এগুলো হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একেকটা অস্ত্র। তারা প্রতিটি স্লোগানকে সমান আবেগে আপন করে নিয়েছে।
এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, আজকের তরুণ প্রজন্ম কেবল নীরব দর্শক বা সোশ্যাল মিডিয়ার ‘কি-বোর্ড ওয়ারিয়র’ নয়। তারা তাদের ভবিষ্যৎ আর দেশের ভবিষ্যৎ নিজেদের হাতে গড়তে চায়। তারা বোঝে, আজ যদি তারা চুপ করে থাকে, তবে আগামী দিনে মেধার কোনো মূল্য থাকবে না, দেশ পরিচালিত হবে কর্পোরেট আর দুর্নীতিবাজদের অঙ্গুলিহেলনে।এই আন্দোলনের আরেকটি ঐতিহাসিক দিক হল বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের অভূতপূর্ব মহাসংঘবদ্ধতা। দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (JNUSU) আর দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় (DU)-র ছাত্র সংসদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এক মঞ্চে এসে দাঁড়িয়েছে দেশের প্রধান প্রধান ছাত্র সংগঠনগুলো।
ঐতিহাসিকভাবে ক্যাম্পাস রাজনীতিতে এই সংগঠনগুলো একে অপরের চরম প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু নিট কেলেঙ্কারি তাদের বাধ্য করেছে এক ছাতার তলায় আসতে। AISA (All India Students’ Association)-বামপন্থী মতাদর্শের এই সংগঠনটি মূলত তৃণমূল স্তরে সাধারণ পড়ুয়াদের লড়াইয়ের ময়দানে সংগঠিত করতে আর আন্দোলনের তাত্ত্বিক রূপরেখা তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা নিচ্ছে। SFI (Students’ Federation of India): নিজেদের বিশাল সুশৃঙ্খল কর্মী বাহিনী নিয়ে যন্তরমন্তরের রাজপথে ব্যারিকেড ভাঙার লড়াইয়ে একদম প্রথম সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে এই বামপন্থী ছাত্র সংগঠন। NSUI (National Students’ Union of India): জাতীয় কংগ্রেসের এই ছাত্র শাখাটি আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়ে মূলধারার রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে আর আন্দোলনকারীদের প্রয়োজনীয় আইনি লড়াইয়ে পেছন থেকে শক্তি জোগাচ্ছে।
এই ঐক্যবদ্ধ উপস্থিতি আন্দোলনের ক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। শিক্ষার শত্রুদের রুখতে আজ লাল, নীল আর তেরঙা পতাকা একাকার হয়ে গেছে যন্তরমন্তরের আকাশে। এই আন্দোলন কেবল কিছু নম্বর কম-বেশি পাওয়ার ক্ষোভ নয়। এই আন্দোলন পাঁচটি তাজা প্রাণের অকালমৃত্যুর বিচার চাওয়ার লড়াই। নিট পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর, প্রশ্নফাঁস আর দুর্নীতির কারণে মানসিক অবসাদে ভুগে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঁচজন পরীক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। সেই তরুণ প্রজন্মের কথা ভেবে মনে পড়ে শঙ্খ ঘোষের কবিতার কয়েকটা লাইন- “আমাদের পথ নেই কোনো/ আমাদের ঘর গেছে উড়ে/ আমাদের ডানপাশে ধস/ বাঁ-পাশে গিরিখাদ…”যে বাবা-মা তাঁদের সন্তানকে ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন নিয়ে নিজেদের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে দিয়েছিলেন, আজ তাঁদের কোল খালি। এই পাঁচটি মৃত্যুর দায় কার? যে দেশের রেল দুর্ঘটনায় রেলমন্ত্রীর পদত্যাগের উদাহরণও আছে, সেই দেশে পাঁচ-পাঁচটি তরুণ প্রাণের আত্মহননের পরেও কেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান চেয়ার আঁকড়ে বসে থাকবেন— এই প্রশ্নই এখন ছুঁড়ে দিচ্ছে যন্তরমন্তর।
এই ক্ষোভ আজ আর শুধু রাজধানীতে আটকে নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের প্রতিটি প্রান্তে আর সাধারণ মানুষের মনে জন্ম দিচ্ছে তীব্র বিজেপি-বিরোধী হাওয়া। আজকের এই ঐতিহাসিক জমায়েত প্রমাণ করে দিল, নতুন প্রজন্ম শুধুই রিলস সস্তা বিনোদনে মত্ত নয়। এই জেন-জি প্রজন্ম যখন রুখে দাঁড়ায়, তখন তারা রাষ্ট্রশক্তির ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। কোটি কোটি মানুষ আজ আশার আলো দেখছেন এই যন্তরমন্তরের তরুণদের চোখে। এই আন্দোলনের কাঁধে আজ এক বিরাট দায়িত্ব। এই প্রজন্মের তরুণরা শুধু অধিকার চেয়েছে, আলো চেয়েছে, আর রাষ্ট্রশক্তি দিয়েছে অন্ধকার।
এটি আর কেবল একটা নির্দিষ্ট পরীক্ষার ফল বাতিলের সংকীর্ণ দাবি নয়; এটি ভারতের জীর্ণ, পচনশীল শিক্ষা আর প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে পুরোপুরি বদলে দেওয়ার এক বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের শুভ সূচনা। জেন-জি যে চেতনার মশাল জ্বেলে দিল, তা নেভানো সহজ হবে না। এই লড়াই দীর্ঘ, কিন্তু জয় যে অবশ্যম্ভাবী, তা যন্তরমন্তরের স্লোগানগুলোই চিৎকার করে বলে দিচ্ছে।