Mein Vaapas Aaunga: ইমতিয়াজ পারলেন, বিবেক হারলেন! “ওরা ভেবেছিল গান্ধীকে মারলেই ভারত হিন্দুরাষ্ট্র হবে”, মোলাকাতের প্রথম পর্বে মুখোমুখি গান্ধীবাদী শিক্ষাবিদ মনীষা বন্দ্যোপাধ্যায় One Nation, One Law: এক দেশ, এক আইন প্রজেক্টের নাম “হিন্দি হিন্দু- হিন্দুস্তান” অশান্ত মণিপুরের নেপথ্যে অবৈধ মাদক কারবার? প্রশাসনের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা ‘বাঙালির সন্তান থাকবে রাজমা চাওলে’, নিরামিষ বাংলা গড়ার প্রথম পদক্ষেপ? Gym Jihad: বাজারে নতুন ট্রেন্ড ‘জিম জিহাদ’, ফের ‘খাত্রে মে’ হিন্দুরা? রাজনৈতিক হিংসার দুই অধ্যায় বাজেটে পার্শ্বশিক্ষকদের নামমাত্র বেতন বৃদ্ধি, যোগ্যতার অমর্যাদা ও আর্থিক বঞ্চনার চালচিত্র!

বাজেটে পার্শ্বশিক্ষকদের নামমাত্র বেতন বৃদ্ধি, যোগ্যতার অমর্যাদা ও আর্থিক বঞ্চনার চালচিত্র!

৩ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সাম্প্রতিক বাজেট ঘোষণা আরও একবার প্রমাণ করল, পার্শ্বশিক্ষকদের প্রশ্নে প্রকৃত মেধা, শ্রম আর ন্যায্য অধিকারের মূল্যায়ন কিন্তু এবারও ঠিকঠাক করে হলো না। কারণ রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা (DA) যখন একলাফে ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেল, তখন দীর্ঘ দেড় দশক ধরে বঞ্চনা আর মূল্যস্ফীতির বাজারে বঞ্চিত হতে থাকা রাজ্যের হাজার হাজার পার্শ্বশিক্ষক ও চুক্তিভিত্তিক শিক্ষা-সহায়কদের মনে হয়েছিল এবার হয়তো একটু সম্মানজনক বরাদ্দ বৃদ্ধি হবে। কিন্তু বাজেট ঘোষণার পর দেখা গেল, সেই আশায় কার্যত ঠান্ডা জল ঢেলে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে মাধ্যমিক স্কুলগুলিতে সাধারণত একজন পার্শ্বশিক্ষক মাইনে পান মাত্র ১৩,০০০ টাকা। তার সাথে যুক্ত হবে আরও ৫,০০০ টাকা—অর্থাৎ মোট ১৮,০০০ টাকা। সারা মাস একই স্টাফরুমে বসে একই কাজ করার পর এই যৎসামান্য ও প্রায় করুণামার্কা বেতন বৃদ্ধি কেবল বৈষম্যমূলকই নয়, চরম দুর্ভাগ্যজনকও।

​অথচ, পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকার সরকারি স্কুলগুলোতে এই পার্শ্বশিক্ষকেরা কোনো অর্থেই ‘খণ্ডকালীন’ বা ‘সহায়ক’ নন, তাঁরা হলেন খাঁটি ‘লোকাল’ শিক্ষক। এলাকার মাটি, ছাত্রছাত্রী আর অভিভাবকদের নাড়ির স্পন্দন স্থায়ী শিক্ষকদের চেয়ে তাঁরাই ভালো বোঝেন। বছরের পর বছর ধরে বিদ্যালয়ের তীব্র শিক্ষক-ঘাটতি কার্যত একহাতে টেনে নিয়ে চলেছেন এই মানুষগুলো। প্রতিদিনের পঠনপাঠন, ক্লাস নেওয়া, পরীক্ষার খাতা দেখা থেকে শুরু করে মিড-ডে মিলের তদারকি কিংবা ভোটের ডিউটি—সব ধরনের সক্রিয় উপস্থিতিতে তাঁরা স্থায়ী শিক্ষকদের চেয়ে কোনো অংশেই কম যান না বরং স্থায়ী শিক্ষকদের চেয়ে অনেক দায়িত্বপূর্ণ কাজ এই পার্শ্বশিক্ষকরাই করে থাকেন। বহু স্কুলে স্থায়ী শিক্ষকের অভাবে বা অনীহায় এই পার্শ্বশিক্ষকেরাই স্বউদ্যোগে অনেক বেশি দায়িত্ব নিয়ে স্কুলের সিংহভাগ কাজ পরিচালনা করেন।

​আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) থেকে শুরু করে দেশের সর্বোচ্চ আদালত—সব জায়গাতেই ‘সমকাজে সমবেতন’ (Equal Pay for Equal Work) নীতিকে একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাজেটে পার্শ্বশিক্ষকদের প্রশ্নে আমাদের এই বাংলায় এই মানবিক আইনটি সম্পূর্ণভাবে লঙ্ঘিত ও অকার্যকর। একই স্টাফরুমে পাশাপাশি বসে, একই পরিশ্রমে এবং অনেক সময় সাধারণ শিক্ষকদের চেয়েও বেশি দায়িত্ব পালন করেও এক-চতুর্থাংশ বা তারও কম বেতন পেয়ে আসছেন। সুতরাং এই বিষয়টি শুধুমাত্র অর্থনৈতিক শোষণ নয়, একজন শিক্ষকের আত্মসম্মানের প্রতি আঘাত।

​প্রসঙ্গত মনে রাখা দরকার পার্শ্বশিক্ষকদের এই বঞ্চনার ইতিহাস দীর্ঘ ১৫ বছরের এক সুপরিকল্পিত ধারাবাহিক অবহেলার দলিল। আজকের আকাশছোঁয়া বাজারের নিরিখে ১৮,০০০ টাকার এই চূড়ান্ত বেতন কাঠামো দিয়ে একটি পরিবারের ন্যূনতম সম্মানজনক জীবনধারণ আজকের বাজারে অত্যন্ত কঠিন। এই বঞ্চনা কেবল প্রতি মাসের বেতনেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং একজন পার্শ্বশিক্ষকের সমগ্র কর্মজীবন এবং কর্মজীবন-পরবর্তী ভবিষ্যৎকেও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বর্তমানে একজন পার্শ্বশিক্ষকের অবসরের পর রিটায়ারমেন্ট বেনিফিটের পরিমাণ মাত্র ৫ লাখ টাকা। পনেরো-কুড়ি বছর কেউ কেউ তারও বেশি সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে সমাজকে শিক্ষার আলো দেওয়ার পর, ৬০ বছর বয়সে এসে মাত্র ৫ লাখ টাকা হাতে নিয়ে বাড়ি ফেরা চরম অপমানজনক। এই যৎসামান্য পুঁজি দিয়ে বার্ধক্যের চিকিৎসা আর বাকি জীবনধারণ করা কীভাবে সম্ভব, সেই উত্তর সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে নেই।

​একজন স্থায়ী শিক্ষক যেখানে পেনশনের মাধ্যমে বার্ধক্যের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন, সেখানে এই স্থানীয় পার্শ্বশিক্ষকেরা অবসরের পর সম্পূর্ণ অসহায়। তাঁদের জন্য সম্মানজনক ও সুনির্দিষ্ট পেনশনের ব্যবস্থা করা, উপার্জিত ছুটি (Earned Leave) বা চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত ছুটি (Medical Leave)-র মতো ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা সরকারের দয়া নয়, নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

​সর্বভারতীয় নিরিখে বিচার করলে এই বঞ্চনার চিত্রটি আরও করুণ। দেশের অন্যান্য বেশ কিছু রাজ্যে চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকদের স্থায়ীকরণ করা হয়েছে অথবা তাঁদের বেতন ও অবসরকালীন সুযোগ-সুবিধা পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় অনেকটাই সম্মানজনক ও মানবিক।

​তবে সমস্ত ক্ষোভ ও বঞ্চনার খতিয়ানের মাঝেও, রাজ্য সরকার যে এই কঠিন আর্থিক পরিস্থিতির মধ্যেও পার্শ্বশিক্ষকদের কথা একেবারে ভুলে যায়নি এবং তাঁদের বেতন কিছুটা হলেও বাড়িয়েছে, তার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়। ৫,০০০ টাকার এই বৃদ্ধি অন্তত এইটুকুর ইঙ্গিত দেয় যে, প্রশাসনের অন্দরে এই অবহেলিত অংশের মানুষদের অস্তিত্ব ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে পুনর্বিবেচনা শুরু হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বঞ্চনার ইতিহাস এবং বর্তমান বাজার দরের বাস্তবতার নিরিখে এই পদক্ষেপকে কোনোভাবেই ‘যথেষ্ট’ বলা চলে না। পার্শ্বশিক্ষকদের যোগ্য মর্যাদা দিতে হলে এই বরাদ্দকে আরও যথাযথ ও যুক্তিপূর্ণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল।

​শিক্ষা কোনো করুণা বা দাক্ষিণ্যের বিষয় নয়, এটি একটি অধিকার। আর যাঁরা সেই শিক্ষা প্রদান করছেন, তাঁদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও কাজের উপযুক্ত সম্মান নিশ্চিত করা সরকারের মৌলিক কর্তব্য। আশা করা যায়, আগামী দিনে রাজ্য সরকার কেবল সাময়িক জোড়াতালির অনুদান বা নামমাত্র বৃদ্ধিতেই থমকে থাকবে না। পর্দার আড়ালে থেকে স্কুলগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা এই পার্শ্বশিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দাবি অনুধাবন করে ‘সমকাজে সমবেতন’ নীতির বাস্তবায়ন, সম্মানজনক পেনশন ও সুনির্দিষ্ট সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার আরও বড় এবং সদর্থক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। সরকারের সেই সদিচ্ছার হাত ধরেই রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত উন্নয়ন ও সুদিন ফিরে আসুক—এটাই আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা।

অন্যান্য প্রতিবেদন.