যেকোনো ব্যক্তির মূল্যায়ন করা প্রয়োজন তাঁর সময়কালে দাঁড়িয়ে। আমি আজ যে ব্যক্তিত্বকে নিয়ে লিখতে চলেছি, বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে যাঁর প্রাসঙ্গিকতা সবচেয়ে বেশি বলে আমি মনে করি। স্বাধীনতার ৮০তম বর্ষে আমরা পদার্পণ করতে চলেছি। এই সময় দাঁড়িয়ে সবচেয়ে বেশি যে মনীষীদের চর্চা হওয়া উচিত তাঁদের মধ্যে অন্যতম ভীমরাও আম্বেদকর।
সারা দেশজুড়ে এক অস্থির বাতাবরণ সৃষ্টি করার চেষ্টা হচ্ছে। চেষ্টা হচ্ছে সবকিছু গেরুয়াকরণের। পশ্চিমবঙ্গও তার বাইরে নয়। ভারতবর্ষকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে মধ্যযুগে আবার। বর্তমানে ক্ষমতায় আসীন কেন্দ্রীয় সরকার যারা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেই গৌরবান্বিত করার চেষ্টা করে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন শাসক দল অনেক অন্যায় অত্যাচার করেছে, তাদের সবকিছুই ত্রুটিতে ভরা, কিন্তু তাদের সবচেয়ে বড় অন্যায় হল এ রাজ্যে বিজেপির মতো বর্বর দলকে ডেকে আনা এবং তার জন্য পশ্চিমবঙ্গবাসী এদের চিরকাল ঘৃণার চোখেই দেখবেন। বাংলার ইতিহাস, বাংলার ঐতিহ্য, বাংলার সংস্কৃতি, বাংলার গৌরবের সাথে বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদের বিন্দুমাত্র কোনো সম্পর্ক নেই। স্বামী বিবেকানন্দ, যিনি পৃথিবীব্যাপী হিন্দু ধর্মের প্রচার করেছিলেন, জীবনকে ব্রতী করেছিলেন রামকৃষ্ণ-সারদা দেবীর চিন্তাধারা প্রসারে, সেই বিবেকানন্দকেও এরা আক্রমণ করতে ছাড়েনি। আমরা জানি যে তিনি ব্রাহ্মণ ছিলেন না এবং তিনি নিরামিষাশীও ছিলেন না। তিনি গর্বের সাথেই মাছ-মাংস খেতেন। এ কারণে তৎকালীন হিন্দু সমাজ তাঁকে যত রকমভাবে অপমান করা যায় করেছেন। এমনকি মৃত্যুর পরেও তাঁকে অপমান করতে ছাড়েননি। বলা হয়েছিল— “The meat eating Swami of Belur Math is dead.”
এই বিবেকানন্দই আমাদের জানিয়েছিলেন হিন্দুদের গোমাংস ভক্ষণের ইতিহাস। বলেছিলেন— “এই ভারতেই এমন সময় ছিল যখন গোমাংস ভোজন না করিলে কোনো ব্রাহ্মণের ব্রাহ্মণত্ব থাকিতো না; বেদ পাঠ করিলে দেখিতে পাইবে, কোনো বড় সন্ন্যাসী বা রাজা বা অন্য কোনো বড়লোক আসিলে ছাগ ও গোহত্যা করিয়া তাহাদিগকে ভোজন করানোর প্রথা ছিল।” (স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৬৩)
বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদের সাথে পশ্চিমবঙ্গের বিন্দুমাত্র কোনো সম্পর্ক নেই এ কারণেই বলেছি যে— যে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী বর্তমানে বিজেপির আইকন, যে বিজেপি একটি ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করে যে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী নাকি পশ্চিমবঙ্গের জনক, সেই শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ও তৎকালীন হিন্দু মহাসভাকে বাংলা ভাগের পর প্রথম সাধারণ নির্বাচনে চরমভাবে প্রত্যাখ্যান করেন বাংলার মানুষ। সিট পেয়েছিলেন মাত্র ২টি। প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে উঠে আসে কমিউনিস্ট পার্টি ২৬টি সিট পেয়ে এবং কংগ্রেস পায় ১৫১টি সিট।
বাবাসাহেব আম্বেদকর তাঁর শৈশবকালে কী কী ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন তা সকলেরই কমবেশি জানা। সেসব নিয়ে আলাদাভাবে লেখালেখি করা যাবে বরং। সেই সব দিন পেরিয়ে এসে তিনি বুঝেছিলেন যদি ভারতবর্ষকে উন্নত করতে হয়, যদি ভারতবর্ষকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছোতে হয় তাহলে দেশের ভেতরকার এই শত্রুগুলোকে আগে রুখে দিতে হবে। অর্থাৎ এই মধ্যযুগীয় বর্বরদের মূলে বিনাশ করতে হবে। ভারতের স্বাধীনতার প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে ভারতবাসীর কাছে এই ছিল তাঁর আহ্বান। আম্বেদকর মনে করতেন ভারতীয়দের অগ্রগতির উপায় হলো সমাজ থেকে কুৎসিত হিন্দু প্রথাগুলির বিলোপ।
তাঁর সংগঠিত করা সাহসী প্রতিবাদগুলির অন্যতম হলো মনুস্মৃতি দহন। আম্বেদকর অনুভব করেছিলেন এই সামাজিক বৈষম্যের মূল উপড়ে ফেলার জন্য প্রতীকী প্রতিবাদ প্রয়োজন। ১৯২৭ সালের ২৫শে ডিসেম্বর মাহাড় সম্মেলনে অন্তজ শ্রেণীর মহিলাদের নিয়ে বর্বরতার আইনি অনুমোদনের প্রতীক মনুস্মৃতি আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেন। এটিই তাঁর তৎকালীন সময়ে করা সবচেয়ে সাহসী প্রতিবাদগুলির একটি।
স্বাধীনতার প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে বাবাসাহেব চেষ্টা করেছিলেন আইনের মাধ্যমে নারীজাতির অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে। হিন্দু কূ-রীতিনীতির গণ্ডি থেকে মহিলাদের বের করে এনে সাম্যের ভিত্তিতে নতুন আইন প্রণয়ন করতে। এক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি কী মারাত্মক রকমের আক্রমণের শিকার হতে হয়েছিল তাঁকে। হিন্দু কোড বিল নিয়ে আলোচনার সময় বাবাসাহেব বলেছিলেন— “হিন্দু সমাজ যা কিছু গ্রহণ করুক না কেন, এটা কখনো শূদ্রদের দাসত্ব ও নারীদের দাসত্বের সামাজিক কাঠামোকে (চতুর্বর্ণ) পরিত্যাগ করবে না। এই কারণেই তাদের পরিত্রাণ দেওয়ার জন্যই এখন অবশ্যই আইন আনতে হবে যাতে এই সমাজটা এগোয়।”
সেই সময়ে নেহরু সরকারের আইনমন্ত্রী হিসেবে ডঃ আম্বেদকর যখন প্রস্তাবিত হিন্দু আইনের মধ্যে এমনকি সীমিত সংস্কারের কথা বলেছিলেন, আরএসএস ও তাঁর আদর্শে নিবেদিত শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির মতো নেতা তীব্রভাবে সেই সংস্কারের বিরোধিতা করেছিলেন। রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছিলেন যে তিনি বিলটি ফেরত পাঠাবেন। ১৯৪৮ থেকে ৫১ অবধি বিভিন্ন সময়ে বিরোধীদের ছলচাতুরির পরে অবশেষে ১৯৫১ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি বিলটি আলোচনা ও গ্রহণের জন্য পেশ হলো। আলোচনার সময় প্রধানমন্ত্রী নেহরু আগে বলেছিলেন যে বিলটির সাথেই জড়িয়ে আছে তাঁর সরকারের নামা-ওঠা। বিলটি পাস হলে তাঁর সরকার থাকবে, না পাস হলে থাকবে না। কিন্তু ডানপন্থী গোঁড়ামির আক্রমণের মুখে নেহরু পিছিয়ে গেলেন এবং আপস করলেন। তিনি ডঃ আম্বেদকরকে নির্দেশ দিয়ে বললেন উত্তরাধিকার এবং সম্পত্তি হস্তান্তরের সমস্যাগুলি বাদ দিয়ে শুধুমাত্র বিবাহ এবং বিবাহবিচ্ছেদ সম্পর্কিত বিষয়গুলি গ্রহণ করা হোক। প্রতিবাদে ডঃ আম্বেদকর অবিলম্বে ১৯৫১ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর তাঁর লিখিত পদত্যাগপত্র পেশ করে পদত্যাগ করেন।
এমন আরও বহু ঘটনার উদাহরণ দেওয়া যায়। বর্তমানে নারীজাতির নিজেদের বিচার করে দেখার সময় এসেছে। কারা তাদের স্বাধীনতা খর্ব করেছে, কারা তাদের অধিকার হরণ করেছে, কারা তাদের সমস্ত রকমের অত্যাচার, অপমান করে তাদের ভোগ্যবস্তু হিসেবে দেখে এসেছে এবং কারা তাদের অধিকার দিয়েছে সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচার এবং আইন এনে সেই অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। আজ নারীজাতি যতটুকু (অধিকার পেয়েছে) তার পেছনে আছেন ডঃ আম্বেদকর, রামমোহন, বিদ্যাসাগর, ফুলে। নারীজাতি হিন্দি-হিন্দু সাম্রাজ্যবাদকে রুখে দিয়ে এই ঋণ শোধ করুন।













