বিশ্ব চলচ্চিত্রের মানচিত্রে ইরানের নাম উজ্জ্বল করে তোলার পেছনে যে কটি নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়, তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান হলেন জাফর পানাহি । সেলুলয়েডের পর্দায় সত্যের আলো ফেলতে গিয়ে তিনি বারবার মুখোমুখি হয়েছেন কাঠগড়ার। সম্প্রতি এই স্বাধীনচেতা ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতাকে ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছে দেশের বিচারবিভাগ। এই ঘটনা কেবল একজন ব্যক্তির ওপর দমনপীড়ন নয়, বরং এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শিল্প ও সংস্কৃতির কণ্ঠরোধ করার একটি সুপরিকল্পিত ও নির্মম রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টা।
জাফর পানাহি বরাবরই এমন এক চলচ্চিত্র নির্মাতা, যিনি আপস করতে জানেন না। আব্বাস কিয়ারোস্তমির সহকারী হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার শুরু করা পানাহি তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি ‘দ্য হোয়াইট বেলুন’ (১৯৯৫)-এর মাধ্যমেই বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হন। এরপর ‘দ্য সার্কেল’, ‘অফসাইড’ বা ‘দিস ইজ নট আ ফিল্ম’ এর মতো মাস্টারপিসগুলোর মাধ্যমে তিনি ইরানি সমাজের বাস্তব চিত্র, বিশেষ করে নারীদের ওপর চলা নিপীড়ন এবং মানবাধিকারের বঞ্চনাকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন।

রাষ্ট্রের চোখ রাঙানিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পানাহি প্রমাণ করেছেন যে, সিনেমা তৈরির জন্য বিশাল বাজেটের বা সরকারি অনুমোদনের সবসময় প্রয়োজন হয় না। ঘরের কোণে একটা সাধারণ ক্যামেরা আর একটা এডিট ওয়ার্কস্টেশন থাকলেই সততা ও সাহসিকতাকে পুঁজি করে সিনেমা বানিয়ে ফেলা সম্ভব। ২০১০ সালে তাকে সিনেমা তৈরিতে ও দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এবং ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গৃহবন্দী বা কর্মক্ষমতাহীন অবস্থায় থেকেও তিনি লুকিয়ে ছবি বানিয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয়েছে। সাম্প্রতিক এই ৫ বছরের কারাদণ্ড ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণের নির্দেশ সেই দীর্ঘস্থায়ী ও প্রতিহিংসামূলক রাষ্ট্রীয় নিপীড়নেরই একটি নতুন অধ্যায়।
রাজনৈতিক দর্শনের দৃষ্টিতে, একনায়কতন্ত্র বা কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থায় সরকার এবং রাষ্ট্রকে এক করে দেখা হয়। যারা সরকারের স্তুতিগান গাওয়াকে একমাত্র দেশপ্রেম বলে চালাতে চান, তারা মূলত নিজেদের ক্ষমতার আসনকে পাকাপোক্ত করতে চান। তারা খুব ভালো করেই জানেন যে তাদের এই প্রোপাগান্ডা মিথ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত।
সৃজনশীল মানুষ, কবি, লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতারা সমাজের দর্পণ। তারা যখন ক্ষমতার অন্ধকারের দিকটি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন, তখন তা শাসকগোষ্ঠীর জন্য বড় এক ‘থ্রেট’ বা হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। যে সরকার জনগণের মননশীলতাকে ভয় পায়, তারা সবসময় দমনপীড়নের পথ বেছে নেয়। এবং এটি সর্বকালে সর্বদেশের পক্ষেই সত্য৷ জাফর পানাহিদের মতো শিল্পীরা কোনো অস্ত্র হাতে নেন না, তাদের একমাত্র অস্ত্র ক্যামেরা ও সত্যবাদিতা। আর এই সত্যের সামনে স্বৈরাচারী শাসকরা সবচেয়ে বেশি ভীত থাকে।
কেবল তেহরান বা মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্বজুড়েই এই অসহিষ্ণুতার কালো ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক আঙিনায় জাফর পানাহির মতো স্বাধীন নির্মাতাদের কণ্ঠরোধ করতে নানামুখী রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন চালানো হচ্ছে, অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের বুকে সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউট (SRFTI)-এর মতো মুক্তবুদ্ধি চর্চার প্রাঙ্গণেও নেমে আসছে ফ্যাসিবাদী ও উগ্রপন্থী শক্তির আক্রমণ। ক্যাম্পাসের পবিত্র পরিবেশকে নষ্ট করতে, ভয়ের সংস্কৃতি কায়েম করতে এবং শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তার গলা টিপে ধরতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও উগ্রপন্থী শক্তির মদতে ক্যাম্পাসের ভেতরে ঢুকে আতঙ্ক সৃষ্টির অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর আক্রমণ নেমে আসছে, ভিন্নমতের কারণে তাদের নির্যাতন ও হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে।
অথচ সত্যজিৎ রায়ের নামে নামাঙ্কিত এই প্রতিষ্ঠানটি তো কোনো সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়—এটি মননশীলতা, প্রগতিশীল চিন্তা এবং সৃষ্টিশীলতার আঁতুড়ঘর। এখানেই তো তৈরি হওয়ার কথা আগদিনের স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতারা, যারা সেলুলয়েডের ফ্রেমে মানুষের মুক্তির কথা বলবেন। কিন্তু কর্তৃত্ববাদী ও সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ যখন দেখে যে শিল্পের এই প্রাঙ্গণগুলো থেকে স্বৈরাচারবিরোধী, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সাহসী স্বর উচ্চারিত হচ্ছে, তখন তারা ভীত হয়ে পড়ে। আর সেই ভয় থেকেই বিভিন্ন দল ও শক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদতে এই ধরনের দমনপীড়নের নীল নকশা বাস্তবায়িত হয়। এই বিচারহীনতা ও ভয়ের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আজ দীর্ঘ দিন ধরে শিক্ষার্থীরা ক্লাসকক্ষ ছেড়ে রাস্তায় নেমেছেন, অবস্থান ও আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন—যা আসলে ক্ষমতার অন্ধকারের বিরুদ্ধে তারুণ্যের এক আপসহীন লড়াই।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, কোনো সৃষ্টিশীল মানুষকে বন্দী করে, তার কণ্ঠ রোধ করে বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে দীর্ঘকাল মতাদর্শ চাপা দিয়ে রাখা যায় না। রোম থেকে তেহরান—যাঁরাই ক্ষমতার জোরে মুক্তবুদ্ধি ও শিল্পচর্চাকে গলা টিপে ধরতে চেয়েছেন, তাদের পতন হয়েছে অবধারিতভাবে। পানাহির মতো শিল্পীরা বিশ্বজুড়ে মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণা। তাদের ওপর যত বেশি খড়্গ নেমে আসে, তাদের কণ্ঠ তত জোরালো হয়ে বিশ্বমঞ্চে প্রস্ফুটিত হয়। জাফর পানাহির বিরুদ্ধে এই ধরনের বিচারহীনতা এবং দমনমূলক নীতি সাময়িকভাবে হয়তো ভয়ের পরিবেশ তৈরি করতে পারে, কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদে মুক্তিকামী মানুষের প্রতিবাদের আগুনকে আরও তীব্র করে তোলে। কারণ, ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—তরবারি দিয়ে মতাদর্শের গলা কাটা যায় না, আর সেলুলয়েডের ফ্রেমে বন্দি সত্য কোনো না কোনো দিন ঠিকই আলোর মুখ দেখবেই।

