‘তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু আর আমি জাগিব না, / নিশ্চল, নিশ্চুপ, / আপনার মনে আপনি পুড়িব গন্ধবিধুর ধূপ’, লিখেছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। যেসব বাঁশি নিশ্চিন্তপুরের মাঠ ছেড়ে, না বেজেই ফিরে গিয়েছিল গ্রীষ্ম-বৈশাখী রাতে, তারা সবাই সত্যজিৎ রায়কে মনে রেখেছিল। গন্ধধূপের রাশি যা কিছু পাওয়া, ছেড়ে যাওয়া মনে রেখেছিল; তারা আজও সত্যজিৎ রায়কে ঘুমোতে দেয়নি ঠিকভাবে। তিনি চলমান চিত্রকে আঙুল উঁচিয়ে দেখতে বলেছিলেন বলেই আজ হয়তো আমাদের কিছুটা বেঁচে থাকার আশ্বাস, বেঁচে থাকার বিশ্বাস পাওয়া।
কলেজে পড়াকালীন সত্যজিৎ রায়- তাঁর জীবন, তাঁর সিনেমা নিয়ে অনেক কাঁটাছেঁড়া করতে হয়েছে। মেসে কখনও তাপসদা মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠিয়ে বলেছে, “আমাদের একটু সিনেমা নিয়ে আলোচনা করা উচিত।” একবার সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে পড়তে গিয়ে যা কিছু লক্ষ করতে পেরেছি, তার মধ্যে একটি ছিল—তাঁর গোটা চলচ্চিত্রজীবনের দিকে তাকালে দেখা যাবে, এক পর্ব থেকে আরেক পর্বে তিনি বারবার নিজেকে ভাঙতে সক্ষম হয়েছিলেন। খ্যাতিমান সাহিত্যিক পরিবারে জন্ম। নিজেও ছিলেন খ্যাতিমান সাহিত্যিক। কিন্তু ‘সাহিত্যের দাসত্ব করার জন্য চলচ্চিত্র নয়’—কথাটি নিজের চলচ্চিত্রজীবনের উদ্বোধনের লগ্নেই বুঝেছিলেন। তাই পথের পাঁচালী থেকে শুরু করে তাঁর সিনেমাগুলো সাহিত্যনির্ভর হয়েও একধরনের নতুনত্বের জন্ম দিয়েছে, যা দর্শককে নতুন ব্যাখ্যার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করেছে।
যারা সর্বজয়ার কান্না, অপুর অবুঝপানা মুখ, হরিহরের জরাজীর্ণ চেহারা, গরুর গাড়ির চাকার হাহুতাশ, চোখের জলে হাঁ করে তাকিয়ে দেখেছেন, তারা আসলেই বুঝতে পারেন সত্যজিৎ বাবুর সিনেমার গভীরতা কতটা!
গুপী গাইন বাঘা বাইন সিনেমা যা তাক লাগিয়ে দিতে পারে একটা সমাজকে, সেই সিনেমা বানিয়েছিলেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে লিখেছিলেন, ‘স্বপন-পারের ডাক শুনেছি, জেগে তাই তো ভাবি / কেউ কখনো খুঁজে কি পায় স্বপ্নলোকের চাবি’। সেই চাবি গুপী-বাঘা পেয়েছে কি? আমরা তো তা আজও জানি না, আজও আমরা সেই স্বপ্নসন্ধানী!একটা গোটা কলকাতা শহরকে আমরা কীভাবে দেখব, তা শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন সত্যজিৎ। তাঁর সিনেমা শিখিয়েছিল নগর দেখার চক্ষুদান। একটা যান্ত্রিক শহরকে সিনেমার গোলকধাঁধায় বেঁধেছিলেন তিনি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ আলো পেল সত্যজিতের সিনেমার পর্দায়। মানুষ নতুন করে দেখল অন্য কলকাতাকে।
আবার এই সত্যজিৎই ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমাতে দড়ি ধরে টান মেরে রাজাকে খান খান করতে চেয়েছেন। তাঁর রাজনৈতিক সত্তা এখানে অনেকটাই ফুটে উঠেছে। ফলে যাঁরা বলেন সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র রাজনৈতিক চেতনাহীন, তাঁদের কথাকে ভুল প্রমাণ করতে এক ‘হীরক রাজার দেশে’-ই যথেষ্ট।
যদি আবার কোনোদিন আমার সোনার দেশ নতুন করে সাজে, আমি চাইব প্রত্যেক স্কুলে তাঁর লেখা, তাঁর সিনেমা পঠনপাঠনে যুক্ত হোক। আমাদের যা কিছু শেখা কিছু মানুষ আটকে দিতে চাইছে, তাদের ওপর প্রতিবাদের তীর ফুটুক সত্যজিতের সিনেমার। বাঁশি হয়ত আজও বাজে, শুধু শোনার মানুষ থাকাটাই প্রয়োজন। সত্যজিৎকে প্রতিদিন জানা প্রয়োজন!










