প্রথম দফা ভোটদান ইতিমধ্যেই সমাপ্ত রাজ্যে। দ্বিতীয় দফাও দরজায় কড়া নাড়ছে। এ বছর মোট ৪টি রাজ্য এবং একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিধানসভা ভোট হয়েছে এবং এই সবগুলি রাজ্যের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি অতিসক্রিয় হয়ে ভোটপ্রচার করেছে এবং এখনও করছে। এই ছবি যদিও পুরনো নয়, এর আগেও ২০২১ সালের বিধানসভা এবং ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটেও ছিল একই চিত্র। কিন্তু কেন অন্য রাজ্য ছেড়ে বিজেপির বঙ্গে কড়া নজর? এখানে যদি সাধারণ মানুষ ভেবে থাকেন যে শুধুই বাংলার মানুষের হিতের জন্য বিজেপি নেতাদের এই পরিশ্রম, সেটা ভুল হবে না কারণ আপাতদৃষ্টিতে তারা এমনটাই প্রচার করছে কিন্তু তার পেছনের অন্য বীজগণিতটা এড়িয়ে যাওয়াও যায় না।
ভারতের সংসদীয় রাজনীতিতে পশ্চিমবঙ্গের গুরুত্ব বরাবরই অপরিসীম। যদি ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পশ্চিমবঙ্গে এককভাবে ক্ষমতায় আসতে পারে, তবে তা কেবল রাজ্যের প্রশাসনিক পরিবর্তনই আনবে না, বরং দিল্লির মসনদে এনডিএ সরকারের ভিত আরও মজবুত করবে। প্রথমে যদি শুধু বিধানসভার দিকটা পরিকল্পনা করা যায়—বর্তমানে রাজ্যসভার মোট ২৪৫ জন সাংসদের মধ্যে বিজেপির নিজস্ব সদস্য সংখ্যা ১০৩ এবং এনডিএ জোটের মিলিত শক্তি ১৩৩, অর্থাৎ অর্ধেকের কিছু বেশি মাত্র। রাজ্যসভার সাংসদরা মূলত রাজ্য বিধানসভার বিধায়কদের (MLA) ভোটে নির্বাচিত হন। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের ১৬টি রাজ্যসভা আসনের মধ্যে বিজেপির হাতে রয়েছে মাত্র একটি। বিজেপি যদি পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করতে পারে, তবে আগামী দিনে রাজ্যসভার ১৬টি আসনের একটি বড় অংশ তাদের দখলে আসবে। এতে রাজ্যসভায় বিজেপির একক শক্তি এমন এক জায়গায় পৌঁছাবে, যেখানে তাদের গুরুত্বপূর্ণ বিল বা সংবিধান সংশোধনী পাসের ক্ষেত্রে জোটসঙ্গী বা অন্য কোনো আঞ্চলিক দলের ওপর নির্ভর করতে হবে না। এটি কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রশাসনিকভাবে অনেক বেশি ‘স্বাবলম্বী’ করে তুলবে।
পাশাপাশি যদি লোকসভার কথাও ভাবা যায়, লোকসভার ৫৪৩টি আসনের মধ্যে বর্তমানে বিজেপির নিজস্ব আসন সংখ্যা ২৪০ এবং জোট মিলিয়ে ২৯৩। বিধানসভা নির্বাচনের জয় সরাসরি আগামী লোকসভা নির্বাচনের ওপর প্রভাব ফেলে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে যদি বিজেপি বড় অঙ্কের আসন লোকসভায় নিশ্চিত করতে পারে, তবে কেন্দ্রে জোট সরকারের বদলে বিজেপি আবার পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিকে এগিয়ে যাবে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারকে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনেক সময় শরিকি চাপের মুখে পড়তে হয়। কিন্তু বাংলার ৪২টি লোকসভা আসনের একটি সিংহভাগ যদি বিজেপির ঝুলিতে আসে, তবে দিল্লির সরকার ‘কোয়ালিশন পলিটিক্স’ বা জোট রাজনীতির সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হয়ে একক আধিপত্য বজায় রাখতে পারবে।
সম্প্রতি এক উদাহরণে এই জটিল অঙ্কটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক ‘ডিলিমিটেশন’ বা সীমানা পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত আইনের দিকে যদি তাকাই—ভারতের সংসদীয় ইতিহাসে এটি একটি বিরল এবং তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ছিল, যেখানে লোকসভায় প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাবে একটি বিল বা আইন কার্যত থমকে যায়। বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার গত এক দশকে বহু গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস করালেও, এই প্রথমবার সংখ্যাতত্ত্বের মারপ্যাঁচে একটি বড় সিদ্ধান্ত আটকে যাওয়ার অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, লোকসভায় বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলে এমনকি একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষেও সুদূরপ্রসারী আইন পাস করানো কতটা কঠিন।
এই প্রেক্ষাপটেই পশ্চিমবঙ্গের মতো বড় রাজ্যের গুরুত্ব বিজেপির কাছে বহুগুণ বেড়ে যায়। যদি ভবিষ্যৎ বিজেপির অনুকূলে আসে এবং বাংলা থেকে তাদের সাংসদ সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়, তবে ডিলিমিটেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলো পাস করানো তাদের জন্য অনেক সহজ হয়ে যাবে। বর্তমানের এই ‘অবরুদ্ধ’ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে বিজেপির প্রয়োজন এমন এক নিরঙ্কুশ সংখ্যাধিক্য, যা কেবল জোটসঙ্গীদের ওপর নির্ভর করবে না। তাই বাংলার ৪২টি লোকসভা আসন এবং পরবর্তীকালে রাজ্যসভার ১৬টি আসন দখল করা বিজেপির কাছে এখন কেবল রাজনৈতিক জয়ের প্রশ্ন নয়, বরং এটি সংসদীয় অচলাবস্থা কাটিয়ে দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন আনার একটি অনিবার্য কৌশল। ভবিষ্যৎ বলছে, বাংলা থেকে আসা এই বাড়তি আসনগুলিই হতে পারে সেই চাবিকাঠি, যা ডিলিমিটেশন আইনের মতো আটকে থাকা ফাইলগুলোকে অনায়াসে ছাড়পত্র দেবে। এখানেই কার্যত স্পষ্ট হয়ে উঠল প্রধানমন্ত্রীর বাংলায় এসে গঙ্গাবিহারে ক্যামেরা হাতে ছবি তোলা থেকে ঠনঠনিয়া কালীবাড়িতে পূজা দেওয়ার কার্যক্রমের পেছনের আসল উদ্দেশ্য। এরূপ সক্রিয়তা বিজেপির পক্ষ থেকে অন্য রাজ্যের নির্বাচনে বা দেশের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সচরাচর নজরে পড়ে না।
বিজেপি যদি এ বছর বঙ্গে ক্ষমতায় আসতে পারে তবে তা হবে বঙ্গে প্রথম বিজেপি সরকার এবং ভারতে ২২তম বিজেপি শাসিত রাজ্য। এই বিশাল সংসদীয় পাটিগণিত এবং লোকসভা-রাজ্যসভার আসন সংখ্যার ঊর্ধ্বে একজন সাধারণ নাগরিকের ভোটদানের অধিকারই হলো এই গণতন্ত্রের প্রকৃত চালিকাশক্তি। অনেক সময় সাধারণ মানুষ মনে করেন যে তাদের একটি মাত্র ভোট হয়তো দিল্লির বড় কোনো নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে না, কিন্তু বর্তমান ডিলিমিটেশন জট বা রাজ্যসভার শক্তির লড়াই প্রমাণ করে দিয়েছে যে প্রতিটি ভোটই মূল্যবান। একজন ভোটারের একটি আঙুলের ছাপ যেমন রাজ্যের সরকার গঠন করে, ঠিক তেমনই সেই ভোটের মাধ্যমেই নির্বাচিত প্রতিনিধিরা রাজ্যসভায় গিয়ে দেশের ভবিষ্যৎ আইন তৈরি করেন। তাই এই সংখ্যার খেলায় সাধারণ মানুষের ‘ভোটাধিকার’ কেবল একটি সাংবিধানিক কর্তব্য নয়, বরং এটি হলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মাপকাঠি।













