গ্রীষ্মের দাবদাহে জীবন ওষ্ঠাগত। চলতি বছরের মে মাসেই, উত্তর ও মধ্য ভারতের কিছু অংশের তাপমাত্রা ৪৪° সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। কিছু জায়গায় তো রীতিমতো তাপপ্রবাহ দেখা যাচ্ছে। দিনের বেলায় একবার বাইরে বেরোলে আর রক্ষে নেই! ঘরে ফিরে ফ্যানের নীচে বসলেও ঘাম দ্রুত শুকোচ্ছে না। তীব্র তাপপ্রবাহ ও বাতাসের অস্বাভাবিক আপেক্ষিক আর্দ্রতা মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। এসবের মাঝে বারবার উঠে আসছে ওয়েট বাল্ব তাপমাত্রার প্রসঙ্গ। এটিই নাকি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, কতটা অসহায় অবস্থায় রয়েছি আমরা। ওয়েট বাল্ব তাপমাত্রা ২৮° সেলসিয়াস ছুঁলেই বিপদ সংকেত বাজতে শুরু করে, সেখানে ৩৫° পৌঁছে গেলে তো জীবন বাঁচানো দায়। কী এই ওয়েট বাল্ব তাপমাত্রা? সাধারণ তাপমাত্রার সাথে এর ফারাকটা কোথায়?
সাধারণত যে থার্মোমিটারে আমরা পরিবেশের তাপমাত্রা মাপি, তার কুণ্ডলী শুষ্ক থাকে, এর পারিভাষিক নাম ড্রাই বাল্ব থার্মোমিটার। অপরদিকে, ওয়েট বাল্ব তাপমাত্রা পরিমাপের জন্য, থার্মোমিটারের কুণ্ডলীর গায়ে ভেজা মসলিন বা সুতির কাপড় জড়ানো থাকে। বাইরের তাপমাত্রা শোষণ করে, জল বাষ্পীভূত হওয়ার সময় থার্মোমিটারের পাঠ হ্রাস পায়। সেজন্যে, ওয়েট বাল্ব তাপমাত্রার মান সর্বদা ড্রাই বাল্ব তাপমাত্রার থেকে কম হয়। ভেজা কাপড় দিয়ে কুণ্ডলী মোড়া থাকে বলে, এর নাম ওয়েট বাল্ব থার্মোমিটার।
আসলে, ওয়েট বাল্ব তাপমাত্রা পরিবেশের তাৎক্ষণিক তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার সম্মিলিত নির্দেশক—বাতাস যত শুষ্ক হবে, বাষ্পীভবনের হার তত বাড়বে, এবং ওয়েট বাল্ব তাপমাত্রা সেই হিসাবে কমতে থাকবে। বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বাড়লে বাষ্পীভবনের গতি হ্রাস পায়, আর্দ্রতা বাড়তে বাড়তে সর্বোচ্চ অর্থাৎ ১০০% হলে বাষ্পীভবন শূন্য হয়ে যাবে, সেইসময় ড্রাই বাল্ব ও ওয়েট বাল্ব তাপমাত্রার কোনো পার্থক্য থাকে না। পরিস্থিতি এই জায়গায় এসে পৌঁছালে, ‘হিট স্ট্রেসের’ শিকার হব আমরা। তখন ফ্যানের হাওয়াতেও আর ঘাম শুকাবে না এবং সাংঘাতিক কষ্ট অনুভূত হবে।
সাধারণত শহরাঞ্চলে বাতাসের আর্দ্রতা অনেক বেশি থাকে। আলিপুর আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৯ই জুন কলকাতার সর্বোচ্চ আর্দ্রতা ছিল ৮৯%, সেক্ষেত্রে ওয়েট বাল্ব তাপমাত্রা গিয়ে পৌঁছেছে ৩২° সেলসিয়াসের ওপরে, যেটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের জন্য বেশ ক্ষতিকারক। মরু অঞ্চলে তাপমাত্রা বেশি থাকলেও বাতাসের আর্দ্রতা অনেক কম থাকায়, বাতাস বেশিক্ষণ তাপ ধরে রাখতে পারে না ফলে ওয়েট বাল্ব তাপমাত্রা কমই থাকে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, গ্রীষ্মকালে কোনো দিনে মরু অঞ্চলের তাপমাত্রা ৪০° সেলসিয়াস ও সর্বোচ্চ আর্দ্রতা ২০% হলে, ওয়েট বাল্ব তাপমাত্রা গিয়ে দাঁড়াবে ২২° সেলসিয়াসের কাছাকাছি। বাতাসের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বাষ্পীভবনের হারের ওপর নির্ভর করে কোনোদিন কোনো নির্দিষ্ট এলাকার ওয়েট বাল্ব তাপমাত্রা কত হবে। সুতরাং তাপপ্রবাহের কথা উঠলে কেবলমাত্র তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়, ওয়েট বাল্ব তাপমাত্রার কথাও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ ঘাম বাষ্পীভূত হয়ে শরীরকে কত দ্রুত ঠান্ডা করতে পারছে, এই তাপমাত্রা থেকে তার আভাস পাওয়া যায়। এককথায়, এটি হিট স্ট্রেসের সূচকের কাজ করে।