পরীক্ষায় স্বচ্ছতা বাড়াতে যে পদ্ধতির মাধ্যমে উত্তরপত্র মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সিবিএসই, সেই পদ্ধতির মধ্যেই বড়সড় ত্রুটি ও অনিয়ম খুঁজে বের করল তিন পরীক্ষার্থী। বলাই বাহুল্য, তিন তরুণের কর্মকাণ্ডে পরীক্ষার পুরো প্রক্রিয়াটিই এখন প্রশ্নের মুখে। এ জন্যে যদিও কম হেনস্থা পোহাতে হয়নি তাদের। এদের মধ্যে একজনকে ডিপস্টেট এজেন্ট থেকে শুরু করে দেশদ্রোহী, পাকিস্তানি—কত রকমের অপবাদ যে শুনতে হয়েছে তার ঠিকঠিকানা নেই। তবে সুখবর হলো, তাদেরই আরেকজন বাংলার ছেলে নিসর্গকে ডেকে চাকরি দিয়েছে কানপুর আইআইটি। ১৯ বছর বয়সী নিসর্গের প্রতিভা দেখে সত্যিই স্তম্ভিত এই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অধিকর্তা।
সম্প্রতি সিবিএসই-র ফল প্রকাশ হওয়ার পর বহু পরীক্ষার্থী অভিযোগ করেছে যে তাদের উত্তরপত্রের সঠিক মূল্যায়ন হয়নি। কিন্তু অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী নিজের ভাগ্যকে দোষ দিয়ে চুপ করে গেলেও, গোটা বিষয়টি সহজেই হজম করতে পারেনি বেদান্ত, সিদ্ধার্থ ও নিসর্গ। বোর্ড পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন পদ্ধতির (অন-স্কিন মার্কিং সিস্টেম) ত্রুটিগুলো প্রমাণসহ উদ্ঘাটন করে নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত গড়েছে এই তিন তরুণ।
আশানুরূপ ফলাফল না হওয়ায় পরীক্ষা পরিচালনার গোটা প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন জেগেছিল নিসর্গের মনে। এরপর কৌতূহল ও সন্দেহের বশে সিবিএসই-এর মূল পোর্টালটি খতিয়ে দেখা এবং অন-স্কিন মার্কিংয়ের পোর্টালটি হ্যাক করার চেষ্টা করে ১৯ বছরের ওই যুবক। সেই সময়ই কিছু টেকনিক্যাল ত্রুটি ও গাফিলতি তার নজরে আসে। যেমন—মাস্টার পাসওয়ার্ড ও ওটিপি ভেরিফিকেশনে গলদ এবং সার্ভারে তথ্য সুরক্ষিতভাবে না থাকা। সে বুঝতে পারে, পোর্টালটির নিরাপত্তা কাঠামো এতটাই নড়বড়ে যে সহজেই হ্যাকারদের পক্ষে তা ভেদ করে পরীক্ষা সংক্রান্ত যেকোনো কারচুপি করা সম্ভব। পরবর্তীতে লোকসভার স্ট্যান্ডিং কমিটির তলবে হাজির হয়ে সবটা জানায় তারা।
নিসর্গ সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে, মাত্র ছয় বছর বয়সে কোডিংয়ে তার হাতেখড়ি হয়। এরপর ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াশোনা চলাকালীন সে জোরকদমে সাইবার সুরক্ষা বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করে। ইতিমধ্যেই ফ্রিল্যান্সার সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে ওই পড়ুয়ার। তার কথায়, আইআইটি-র বেতনের তুলনায় সেই টাকার অঙ্কটা অনেকটাই বেশি। তা সত্ত্বেও আইআইটি-র সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের সুযোগ কোনোভাবেই হারাতে চায় না বলেই জানিয়েছে সে। এছাড়াও নিজের ভবিষ্যতের পরিকল্পনার বিষয়ে জানানোর সময় উদ্যোগপতি হওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছে নিসর্গ।
অন্যদিকে, আরেক গোয়েন্দা স্বভাবের পড়ুয়া অনলাইনে বিভিন্ন নথিপত্র ঘেঁটে, নির্দিষ্ট একটি সংস্থাকে অনৈতিক টেন্ডারের বরাত দেওয়ার বিষয়টি সামনে আনে। আঠারো বছর বয়সী সার্থকের অভিযোগ, টিসিএস-কে সরিয়ে সিবিএসই তাদের দরপত্র বা শর্তাবলীতে একাধিক পরিবর্তন করে ‘Coempt Edutek’ নামের সংস্থাকে সুবিধা পাইয়ে দিয়েছে। এই সংস্থার সম্পর্কে সার্থক আরও জানায়, ২০১৯ সালে তেলেঙ্গানা বোর্ডের পরীক্ষায়ও অনিয়ম ও গরমিলের অভিযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থার বিরুদ্ধে। তারপরেই সংস্থাটির নাম পাল্টে ফেলা হয়। সার্থক প্রশ্ন তোলে—এমন একটি দাগি সংস্থার হাতে কেন সিবিএসই দায়িত্ব তুলে দিল, যে কি না পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে অক্ষম?
সার্থক বর্তমানে রাঁচির বাসিন্দা। পরীক্ষা ভালো হওয়ার পরও তার রেজাল্ট ভালো হয়নি। বিষয়টি তার ভালো ঠেকেনি। নিজের এহেন খারাপ রেজাল্টের নেপথ্যে রহস্য কী—তা উন্মোচন করতে সে গোয়েন্দাগিরি শুরু করে। যথারীতি সে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বিরাট পরিমাণে গরমিলের সন্ধান পায়। সম্প্রতি রাহুল গান্ধী এই ক্ষুরধার মেধাবী ছাত্রের অনুসন্ধানের গল্প শুনে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন।
সিস্টেমের এই গাফিলতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে গিয়ে বেদান্ত শ্রীবাস্তব নামের সিবিএসই-র আরেক পরীক্ষার্থীকে পাকিস্তানি, ডিপস্টেট এজেন্টসহ নানান কুরুচিকর কটূক্তি সহ্য করতে হয়েছে। জানা গেছে, দিল্লির ওই ছাত্র ফিজিক্স পরীক্ষায় প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম নম্বর পেয়েছিল। তা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না সে। এরপর উত্তরপত্র হাতে পেতেই দেখে, উত্তরপত্রের রোল নম্বর আসলে তার নয়—অন্য কারও। এমনকী কম্পিউটার ও ইংরেজি উত্তরপত্রের হাতের লেখার সঙ্গে তার লেখার মিল নেই। তৎক্ষণাৎ প্রমাণসহ গোটা বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে পরীক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় বেদান্ত।
পথেঘাটে প্রতিবাদী কর্মসূচি কিংবা অনলাইনে কোনো রকম প্রোটেস্ট ক্যাম্পেইন ছাড়াই সিস্টেমের বিরুদ্ধে তাদের এই অভিনব লড়াইকে সাধুবাদ জানিয়েছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। যদিও খুদেদের এই কর্মকাণ্ডকে অনেকেই ‘জ্যাঠামো’ বলে দাগিয়ে দিয়েছেন। হয়তো তাঁরা মেনেই নিতে পারছেন না, যেই অল্পবয়সীরা এখনও ভোটাধিকার পর্যন্ত পায়নি, তারা কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রমাণ জোগাড় করল! তবে এই ঘটনাই যেন স্পষ্ট করে দেয়—জেন-জি (Gen-Z) শুধু সোশ্যাল মিডিয়ার রিলস নিয়েই ব্যস্ত নয়, বরং তারা রিয়েল লাইফেও দারুণ অ্যাক্টিভ।