জাতীয় শিক্ষা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ পর্ষদ (NCERT)-এর নবম শ্রেণির নতুন সমাজবিজ্ঞান পাঠ্যপুস্তক—“আন্ডারস্ট্যান্ডিং সোসাইটি ইন্ডিয়া অ্যান্ড বিয়ন্ড-পার্ট ২”-এর প্রকাশকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক বিতর্ক দানা বেঁধেছে। এই বইয়ের “রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স” (Resistance and Resilience) শীর্ষক অধ্যায়ে দাবি করা হয়েছে যে, সপ্তম শতক থেকে শুরু হওয়া বিভিন্ন আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য ভারতের বহু রাজা ও রাজপুত্র দেবী কালী, দুর্গা এবং ভবানী প্রমুখের কাছ থেকে অস্ত্র লাভ করেছিলেন। পাঠ্যপুস্তকের এই বয়ান ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিহাস পাঠের রূপরেখা পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক ও আদর্শগত ইশারা বহন করে।
এই তথাকথিত পাঠ্যপুস্তকীয় পরিবর্তন নিছক কোনো ঐতিহাসিক বয়ান পুনর্গঠন নয়; এর পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্য। প্রথমত, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতীয় ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট হিন্দুত্ববাদী ও জাতীয়তাবাদী ব্যাখ্যাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা এর মাধ্যমে জোরালো হচ্ছে। সপ্তম শতক থেকে শুরু হওয়া বিদেশি আক্রমণগুলোকে ‘ধর্মীয়ভাবে চালিত’ (religion-driven) আক্রমণ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং তার মোকাবিলায় হিন্দু দেব-দেবীদের আশীর্বাদ ও ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপের ধারণাকে সামনে এনে পাঠ্যপুস্তকটি শিক্ষার্থীদের মনে একটি বিশেষ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের ভাবাদর্শ বুনে দিতে চাইছে।
সমালোচকদের মতে, এই ধরনের বিবরণী ইতিহাসকে বস্তুনিষ্ঠ ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার পরিবর্তে পৌরাণিক ও আবেগতাড়িত উপাদানের ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করে। মধ্যযুগের রাজাদের ক্ষমতা বিস্তার, ভূরাজনৈতিক স্বার্থ, সম্পদ দখল বা অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বের মতো জটিল রাজনৈতিক কারণগুলোকে পাশ কাটিয়ে ইতিহাসকে স্রেফ ধর্মীয় সংঘাতের রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেই মনে হয়৷ এই ইতিহাসের বিকৃতকরণ ভারতীয় সমাজের বহুত্ববাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে খর্ব করতে পারে। অন্যদিকে, সমর্থক মহলের যুক্তি হলো—ঔপনিবেশিক এবং বামপন্থী ঐতিহাসিকরা দীর্ঘকাল ধরে ভারতের নিজস্ব প্রতিরোধ সংগ্রাম ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে অবমূল্যায়ন করেছেন। সুতরাং, দেশীয় দেব-দেবী ও সংস্কৃতির সঙ্গে রাজাদের লড়াইয়ের এই যোগসূত্র তুলে ধরা আত্মমর্যাদা ও সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবনেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী মহলের একাংশ আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, পাঠ্যপুস্তকে এ ধরনের বয়ান অন্তর্ভুক্ত হলে তা সমাজে ধর্মীয় মেরুকরণকে আরও গভীর করতে পারে। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় যেখানে ইতিহাস হওয়া উচিত তথ্যভিত্তিক, সমালোচনামূলক ও প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত, সেখানে পৌরাণিক মিথ ও ধর্মীয় বিশ্বাসের মিশেলে ইতিহাস পাঠের এই প্রবণতা শিক্ষার্থীদের ঐতিহাসিক সত্য অনুসন্ধানের বদলে সংকীর্ণ রাজনৈতিক পরিচয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, এনসিইআরটি-র এই নতুন পাঠ্যবইটি কেবল শিক্ষণপদ্ধতির পরিবর্তন নয়, এটি ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক আদর্শগত লড়াইয়ের অঙ্গন। ইতিহাসের পাতা থেকে শুরু করে শ্রেণিকক্ষের চার দেয়াল পর্যন্ত—এই বিতর্ক আসলে এক বৃহত্তর ক্ষমতার দ্বন্দ্বের প্রতিফলন, যেখানে অতীতের ব্যাখ্যাই নির্ধারণ করছে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক মানচিত্র।

