বার্লিনের প্রাচীর ভাঙার প্রবল ঠান্ডার রাতের গল্প ঠান্ডা হয়েছে বেশ! মিথ্যাচার আর বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস ঠান্ডা হয়ে যায়নি এখনও। ঠান্ডা হয়ে যায়নি বার্লিনের পতনের ওপর দাঁড়িয়ে সেদিনের পশ্চিমা উদারনীতির বিজয়োল্লাসের ইতিহাস। মনে করিয়ে দিতে চাই মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা তাঁর বিখ্যাত ‘The End of History and the Last Man’ গ্রন্থে দাবি করেছিলেন, মানবজাতির মতাদর্শগত বিবর্তন যেন তার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাঁর মতে নাকি, উদারনৈতিক গণতন্ত্র ও বাজারভিত্তিক পুঁজিবাদই আধুনিক সমাজের সর্বশেষ কার্যকর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কাঠামো। পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা প্রায় ভেবেই বসেছিল যে সমাজতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক গাঁথা গেছে। সমাজতন্ত্রীদের ঝাড়েবংশে বিনাশ করে পুঁজিবাদ নিজেকে অধীশ্বর ভেবেছিল সেদিন। বিশ্বজোড়া উথালপাথাল পরিস্থিতির মাঝেও সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পর ১৯৯৫ সালের কলকাতার যুব সম্মেলনে স্লোগান উঠেছিল, “সমাজতন্ত্রই ভবিষ্যৎ, ভবিষ্যৎ আমাদেরই”। স্লোগান তুলেছিলেন কমরেড মানব মুখার্জীরা।
কার্ল লিবকনেখট এবং রোজা লুক্সেমবার্গদের বার্লিনে ফের সমাজতন্ত্রের পতাকা উড়ছে। বার্নস্টেইন কিংবা গর্বাচেভদের বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস সমাজতন্ত্রকে মুছে ফেলতে পারেনি। জার্মানিতে একের পর এক রাজ্যে চরম ডানপন্থীদের উত্থান যখন জার্মানি ছাড়িয়ে পুরো ইউরোপ জুড়ে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে, তখন জার্মানির রাজধানী বার্লিনের রাজ্য নির্বাচনে চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ ম্যার্ৎসের ক্ষমতাসীন সিডিইউকে হারিয়ে শীর্ষ স্থান অর্জন করেছে চরম বামপন্থী দল ‘ডি লিংকে’ (দ্য লেফট) । ঘোষিত চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী বার্লিনে ২৫.৭% ভোট পেয়ে শীর্ষে রয়েছে ‘ডি লিংকে’। চ্যান্সেলর ম্যার্ৎসের রক্ষণশীল দল ‘ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন’ (সিডিইউ) ১৮.৮% ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। বার্লিনে ১৬.৩% ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে চরম ডানপন্থী এএফডি, আর গ্রিনস পার্টি পেয়েছে ১৪.৩% ভোট।
গোটা জার্মানি জুড়ে যখন তীব্র চরম ডানপন্থী হাওয়া বইছে, প্রথমে স্যাক্সনি- আনহাল্ট, তারপর মেকলেনবুর্গ-ভোরপোমার্ন। অভিবাসন, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জাতীয় পরিচয় এবং প্রতিষ্ঠিত দলগুলির প্রতি অসন্তোষ– এই ইস্যুগুলোকে হাতিয়ার করেই সাধারণত পৃথিবীর সর্বত্র উগ্র দক্ষিণপন্থার বাড়াবাড়ি হয়। উগ্র জাতীয়তাবাদ, তীব্র অভিবাসন, উদ্বাস্তু বিরোধিতায় এরা সবসময়ই এক কাল্পনিক প্রতিপক্ষ তৈরি করে জনসাধারণের মধ্যে ঘৃণার রাজনীতিকে প্রচার করে। জেনোফোবিয়াকে হাতিয়ার করে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের মধ্যে আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্ন তোলে। আর এটাকে কাজে লাগিয়েই জার্মানির রাজনীতিতে আঁকড়ে বসতে চাইছে উগ্র দক্ষিনপন্থী এএফডি। এখানেই জার্মানির বাম রাজনীতির সামনে একটা কঠিন চ্যালেঞ্জ। আর সেই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অদ্ভুত ভালো ফলাফল করেছে ডি লিংকে। আশা জোগাচ্ছে জার্মানি তথা সারা ইওরোপে উগ্র দক্ষিণপন্থার বাড়বাড়ন্তের বিরুদ্ধে বামপন্থীদের অসম লড়াইতে।
ডি লিংকের ২০২৫-এর নির্বাচনী কর্মসূচির মূল স্লোগান ছিল “Reichtum teilen. Preise senken. Füreinander.” — অর্থাৎ “সম্পদ ভাগ করো, দাম কমাও, পরস্পরের পাশে থাকো”। ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, সামাজিক অধিকারের অবক্ষয় এবং শরণার্থীদের প্রতি বিচ্ছিন্নতার নীতি যখন জার্মানির গণতন্ত্রকে বিপন্ন করছে, ঠিক তখন একে অপরের জন্য বাঁচার স্লোগান তুলেছিল ডি লিংকে।এখানেই আসে শ্রেণী রাজনীতির প্রাসঙ্গিকতা। নির্বাচনী ইশতেহারে তারা সরাসরি লিখেছে– “Unsere Leitlinie heißt: Wir gemeinsam gegen die da oben.” অর্থাৎ, বাংলা করলে দাঁড়ায়- আমাদের মূল নীতি হলো: ওপরতলায় যারা আছে, তাদের বিরুদ্ধে আমরা সবাই মিলে। দক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধে লড়াইতে ডি লিংকে দলটি তাদের ওয়েবসাইটে লিখছে– শরণার্থী ও আশ্রয় আইন বিষয়ে জোট সরকার যে ডানপন্থীদের দাবিতে নতি স্বীকার করেছে, তা ডানপন্থীদের দুর্বল না করে বরং শক্তিশালী করেছে। সিডিইউ, এএফডি-র সাথে মিলে বুন্দেসটাগে অভিবাসন নীতিকে অমানবিক ও বেআইনিভাবে কঠোর করার একটি প্রস্তাব পাস করেছে, যা গণতান্ত্রিক নীতির লঙ্ঘন এবং ফ্যাসিবাদের পথ খুলে দেয়।
ডি লিংকের রাজনৈতিক প্রচারের ভাষ্যই ছিল জীবনযাত্রার ব্যাপক খরচ বৃদ্ধির বিরুদ্ধে, শহরের অর্থনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা। আবাসনের ভাড়া বেশি, যাতায়াতের খরচ বেড়েছে ব্যাপক, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধি, দুর্বিষহ অবসর- উত্তর জীবন– প্রায় সমস্ত ইস্যুকেই নির্বাচনে লড়াইয়ের হাতিয়ার করেছে দলটি।
ডি লিংকের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম কেন্দ্রীয় দাবি ছিল সারা দেশে Mietendeckel বা ভাড়ার ঊর্ধ্বসীমা। ডি লিংকে অবৈধ বা অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ন্ত্রণে সদর্থক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহনের কথা বলেছে। রাজ্যের মালিকানাধীন আবাসনের ভাড়া একটা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সীমিত রাখার কথা জানিয়েছে। সরকারি ও সমবায় আবাসন বাড়ানো এবং বছরে ২০ বিলিয়ন সামাজিক ও অলাভজনক আবাসনে বিনিয়োগের কথা জানিয়েছে। সেইসঙ্গেই বড় আবাসন কর্পোরেশনের মালিকানাধীন প্রায় ৩০০০-এরও বেশি বাড়িকে সামাজিক মালিকানায় আনার দাবি তুলেছে। তাদের বক্তব্য ছিল সাধারণ মানুষের কাছে খাবার, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পরিবহণের খরচ কমাতে হবে। গণপরিবহণের ক্ষেত্রে টিকিটের দাম স্থির রাখার সঙ্গেই ছিল কম আয়ের মানুষের জন্য কম খরচে টিকিট আনার প্রতিশ্রুতি। তারা প্রস্তাব করেছিল— মৌলিক খাদ্যপণ্যে VAT বা Mehrwertsteuer তুলে দেওয়া; হাইজিন প্রোডাক্টের ওপর VAT কমানো,বাস ও রেলে যাতায়াতের খরচের ওপর থেকে VAT তুলে দেওয়া, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য সস্তার বেসিক এনার্জি ট্যারিফ। ডি লিংকের প্রস্তাব গুলোর মধ্যে সবচেয়ে নজরকাড়া হলো Solidarische Erwerbstätigenversicherung– যেখানে কর্মরত বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ একই সামাজিক পেনশন ব্যবস্থায় অবদান রাখবে। ১৯৯০-এর দশকে পেনশনের হার ৭২ শতাংশ পর্যন্ত ছিল; এখন তা কমিয়ে ৪৩ শতাংশ করা হচ্ছে। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে, পেনশনের হার ৫৩ শতাংশে উন্নীত করার কথা ঘোষণা করেছে দলটি।
ডি লিংকে-র রাজনৈতিক আহ্বান ছিল, বার্লিনকে আবার ‘সবার সাধ্যের মধ্যে’ ফিরিয়ে আনতে হবে। সবাইকে জুড়ে নিয়ে শ্রেণী রাজনীতির পথ প্রশস্ত করেছে বামপন্থী দ্য লেফট! গঞ্জের নাম যখন শ্রেণী সংগ্রাম, তখন ক্যু হয়ে উঠেছেন এরিফ এরাল্প। তুর্কি রাজনৈতিক শরণার্থী পরিবারের সন্তান এবং পেশায় আইনজীবী এরাল্প বার্লিনের নির্বাচনের অন্যতম বড় বিজয়ী হিসেবে উঠে এসেছেন, যিনি বার্লিনের পরবর্তী গভর্নিং মেয়র হতে পারেন। বাবা-মা দুজনেই তুরস্কে ট্রেড ইউনিয়নের সাথে যুক্ত থাকায় ছোট থেকেই রাজনৈতিক মিছিল, আন্দোলনের সাথে এরাল্প পরিচিত ছিলই। অভিবাসন ও সামাজিক বৈষম্যের তিক্ত অভিজ্ঞতাই হয়তো তাঁকে আজকের জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে। আশ্রয় ও সামাজিক ন্যায়ের দাবী প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এরাল্প ২০২১ সাল থেকে তিনি বার্লিনের হাউস অফ রিপ্রেজেনটেটিভ Abgeordnetenhaus-এর সদস্য। ২০২৫ সালের মে মাস থেকে তিনি ডি লিংকের সহ সভাপতিও। উদবাস্তু এরাল্পের স্বপ্নে সবার মাথার ওপর ছাদের সংস্থান, সবার পেটে ভাতের জোগান। যে পুঁজিবাদ আবাসনকে মুনাফার পরিসর হিসেবে গড়ে তুলতে চায়, সেই পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সমাজতন্ত্র আজও ডাক পাঠায় “Land, Bread and Peace” -এর। এরাল্প যে নির্বাচনী প্রচারে অন্য একটি বার্লিনের স্বপ্ন দেখিয়েছেন, তা ‘Immer zusammen. Niemals allein’– অর্থাৎ, সবসময় একসঙ্গে,কখনো একা নয়। নভেম্বর দেখিয়েছিল এই স্বপ্ন মিথ্যে নয়। তীব্র সামাজিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সমষ্টিগত রাজনৈতিক ভাষ্য নির্মাণেই অন্য একটি বার্লিন সম্ভব। সম্ভব রেড বার্লিন।
এরাল্প নির্বাচনী প্রচারে যেভাবে ১৬-২৪ বছর বয়সী ভোটারদের আকৃষ্ট করেছেন, তাঁর রাজনৈতিক প্রচার অনেককেই মনে করিয়ে ছেড়েছে জোহরান মামদানির কথা। একই স্টাইলে নয়, কিন্তু বেশ মিল রয়েছে। কোহেনের গান ভেসে এসেছে নেট দুনিয়ায়– “First we take Manhattan, then we take Berlin”.
ব্যক্তি পরিচয়ের প্রতিষ্ঠা দেওয়ার ‘গ্লাসনস্তীয়’ দৃষ্টিভঙ্গিতে নয়, এরাল্পের ডি লিংকের রাজনীতি সমবেত প্রয়াসের। এরাল্প বার্লিনের মেয়র হবে কিনা, এখনও জানা নেই। কিন্তু এরাল্পদের যুদ্ধ জয়ের সংবাদ অবশ্যই স্বস্তির। উগ্র দক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধে পৃথিবীর যে যেখানেই লড়ে যায়, সেখানেই আমাদের লড়ে যাওয়া। রেড বার্লিনে ফের সমাজতন্ত্রের পতাকা উড়বে। কমরেড কাস্ত্রো শিখিয়ে গেছেন, ইতিহাসই আমাদের মুক্ত করে। ইতিহাসই আমাদের মুক্ত করবে।

