“বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বন” এই প্রবাদকে যুগ যুগ ধরে অক্ষরে অক্ষরে মিলিয়ে দেয় বাংলার আসমুদ্রহিমাচল জুড়ে বসবাস করা সাধারণ জনগন। বাংলার হাজারো লোক পার্বনের মতো, পুরুলিয়া – বাঁকুড়া – অবিভক্ত বর্ধমান – বীরভূম জেলার তথা রাঢ়বাংলার অন্যতম প্রাণশক্তি “ ভাদুপরব”। ভাদ্রের ভ্যাপসা গরম পরিবেশে, রাঢ় বাংলার প্রান্তিক মানুষদের একটুকরো বাঁচার রসদ হয়ে আকাশ – বাতাস – বন পাহাড়কে আবৃত করে দেবী “ভদ্রবতী”, “ ভদ্রেশ্বরী” বা “ ভাদু”। ভাদ্র মাসের শুরুতে গ্রামে গ্রামে :
“আমার ভাদু ঘরকে এলেন
কুথায় বসাব ?
পিয়াল গাছের তলায় বেদী,
আসন সাজাবো
আ – না – না – না –
আমার সোনার ভাদু
কোলে তুলে লাচবো।”

গানের সুরে মুখরিত হয়ে বাড়িতে বাড়িতে বা গ্রামেগঞ্জে পদার্পন করেন দেবী। এই পুজো চলে পুরো ভাদ্রমাস জুড়ে ; মূলত বাড়ির মহিলারা, বিশেষত অবিবাহিত মহিলারা গানের মাধ্যমে পুজো করে থাকেন। পুরুষ কিংবা বিবাহিত নারীরা এই পুজোয় সামিল হতে পারেননা এমনটা নয়, তবে মূলত পুজোর রাশ থাকে অবিবাহিত মহিলাদের হাতেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে থাকেনা কোনও পুরোহিত। শুধু গানের ওপর ভর করে দেবী বন্দনার এই দৃশ্য সত্যিই নান্দনিক, এমনকি কোথাও কোথাও দেবীর কাছে প্রান্তিক মানুষেরা কন্যা সন্তান কামনা করে পুজোও দেন ; যুগ যুগ ধরে চলে আসা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যাবস্থার ধ্বজা হয়তো এখানে এসে পরাস্ত হয় !
দেবী ভাদুর উৎস কী, এই পুজো অসলে কতটা প্রাচীন সে বিষয়ে স্থানীয় স্তরে গ্রামবাসীদের মধ্যে বিভিন্ন মতামত প্রচলিত রয়েছে। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও রয়েছে মতানৈক্য। তবে তারমধ্যে অধিকাংশ প্রচলিত মত ভাদুকে জাতিভেদের উর্দ্ধে গিয়ে নিজ মহিমায় অনন্য করে তোলে। যেমন ড. মিহির কুমার কামিল্যা তাঁর “রাঢ়ের পূর্বপুরুষ পূজা” বইতে বলেছেন ভাদু আসলে পুরুলিয়ার পঞ্চকোট সাম্রাজ্যের কাশীপুরের রাজা নীলমনি সিংহদেবের মেয়ে। কিন্ত তার মেলামেশা ছিল নীচু জাতির মুনিস কামিনদের সঙ্গে, জনৈক মুনিসের এক সুশ্রী ছেলেকে সে ভালোবাসে। বিয়ে করতে চায়, রাজা তা শুনে ভাদুর বিয়ের ব্যবস্থা করেন, আকস্মাৎ ডাকাত পড়ে পাত্রের পালকিতে, বরকে নিহত করে তারা। এই ঘটনার পর থেকেই এলাকার নীচুতলার লোকেরা শুরু করে ভাদুপুজো। আবার প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে আরেকটি মত , কাশীপুরের জনৈক কোনও এক রাজার রাজকন্যা ভাদু।এলাকার এক দলিত বাউরি সম্প্রদায়ের তরুণের সে প্রেমাশক্ত, এবিষয়ে রাজার পক্ষ থেকে আসে চূড়ান্ত বাধা। এরপর রাজকন্যা বাধ্য হয় আত্মহত্যা করতে, তাঁর পুজো শুরু করে বাউরি সমাজের মেয়েরা। যদিওবা এই সমস্ত লোককথার কোনও লিখিত প্রমান পাওয়া দুস্কর ! তবুও, লোকবিশ্বাসকে, তো গাণিতিক প্রমানের তুল্যমূল্য বাটখারায় মাপা যায়না। লোকবিশ্বাসের বলে বলিয়ান হয়ে ভাদু যেন এখানে সর্বহারার মুক্তির সূর্য। তিনিই বাউরি, বাগদী , লোহার, মল্ল, সরাক প্রভৃতি অন্ত্যজ শ্রেণীর একান্ত আপনজন, তাইতো প্রচলিত ভাদু গানের একটিতে আমরা শুনতে পাই :
“কাশীপুরের রাজার বিটি বাগদীঘরে কি কর।
হাতের জালি কাঁখে লয়ে সুখ সায়রে মাছ ধর।।
মাছ ধরণে গেলে ভাদু ধানের গুছি ভাঙিও না।
একটি গুছি ভাঙ্গলে পরে পাঁচসিকা জরিমানা”

এলাকার মানুষের সেসময়ের জীবন যাপনের মতো গানগুলো ও ছিলো সহজ – সরল – অনাড়ম্বর। গানে নেই কোনও অতিরঞ্জিত ভাব, নেই কৃত্রিমতার ছাপ। নিজেদের তো ক্ষেত নেই, তাই অন্যের ক্ষেতের পুকুরে মাছ ধরতে যেতে হয়। অপরের ক্ষেতে মাছ ধরবার জন্য বারণ হয়তো নেই, কিন্তু একটি ধানের গুছি ভেঙেছো কি পাঁচসিকে জরিমানা।
তবে ভাদুপুজো শুধুই প্রান্তিক শ্রেণীর কণ্ঠস্বর হিসেবেই সীমাবদ্ধ নয়। বাঁকুড়া – পুরুলিয়ার গ্রামে গ্রামে উচ্চবর্ণের বর্ধিষ্ণু পরিবারেও ভাদু পরবের চল আছে। ব্রাহ্মণ্যবাদীদের বিশ্বাস অনুসারে, পঞ্চকোটের রাজা একবার শিকারে গিয়ে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন ফুটফুটে এক শিশু কন্যাকে, তাঁকে নিয়ে আসেন অন্তঃপুরে। এদিকে কৈলাসে দুর্গা নেই, খোঁজ খোঁজ রব। নারদ মর্তে এলেন, চিনতে পারলেন সেই মেয়েটিই দুর্গা। নারদ গানে গানে তাঁকে জানালেন শিব ও সন্তানদের কথা। অমনি মেয়েটি রাজাকে আত্মপরিচয় দিয়ে কৈলাসে ফিরলেন ; সেদিন ভাদ্র সংক্রান্তি। এরপরই পঞ্চকোটের প্রজাদের মধ্যে প্রচলিত হলো ভাদু পুজোর। আবার ভাদুর সাথে মিশেগেছে বৈষ্ণবীয় ধারা, তাঁদের বিশ্বাস অনুসারে, রাজকন্যা ভাদু ছিলেন মীরাবাই এর মতো আজন্ম কৃষ্ণানুরাগিণী। গভীর রাতে সে একাকি মন্দিরে যায়, রাজা একবার ভাদুর পেছনে ধাওয়া করে দেখলেন ভাদু মন্দিরের দরজা বন্ধকরে ভেতরে কোনো পুরুষের সঙ্গে কথা বলছে, রেগে গিয়ে তিনি দরজা ভাঙলেন, দেখলেন ছোট্ট মন্দিরে ভাদু আর কৃষ্ণ বিগ্রহ ছাড়া আর কেউই নেই। ভাদু পড়লো আছাড় খেয়ে, মারা গেলো সে। রাজা প্রজা সকলেই বসলো ভাদুর পুজোয়। এভাবেই শাক্তদেবী বৈদিক ব্রাহ্মণ্যবাদ, বৈষ্ণবীয় ধারা এবং দলিত সমাজকে একসূত্রে বেঁধে ফেললেন যুগের পর যুগ ধরে।
ভাদু পুজো রাঢ় বাংলার অন্যান্য লোকসংস্কৃতি যেমন টুসু, করম, বাঁধনা, ঝুমুর, রংকিনী, বাসলি, গরামের মতো প্রাচীন নয়, তার বোঝাযায় প্রচলিত লোককথার মধ্যেই। যদি কাশীপুর রাজাবাড়ি প্রতিষ্ঠার সময় হিসেবে করে দেখা যায় তাহলে তা ১৮০০ র দশকের মধ্যেভাগের ঘটনা, আর রাজা নীলমনি সিংহদেব ছিলেন ১৮৫৭ র সিপাহী বিদ্রোহের সমসাময়িক রাজা, এমনকি সিপাহী বিদ্রোহে তিনি বিদ্রোহীদের পক্ষও নিয়েছিলেন। সেই হিসেবে ভাদুকে তাঁর কন্যা হিসেবে মান্যতা দেওয়া হলেও সেই ঘটনা খুব একটা প্রাচীন নয়। এমনকি ভাদু উৎসব কাশীপুরের রাজপরিবারের প্রচেষ্টায় ব্যাপকতা লাভ করেছে, একথা বললেও খুব একটা ভুল বলা হয়না। কৃষিপ্রধান বাংলায় দেবদেবী থাকবে আর তারসঙ্গে কৃষি জড়িয়ে থাকবেনা, তা’ও কী সম্ভব ! ভাদু’ও তার ব্যাতিক্রম নয়, লোকসংস্কৃতি গবেষক ড. আশুতোষ ভট্টাচার্যের মতে ভাদ্রমাসে’ই যেহেতু আউসধান ঘরে তোলা হয় এবং এইসময় যেহেতু রাঢ় বাংলায় তেমন কোনও উৎসব থাকেনা তাই ভাদু পুজোর মাধ্যমে মানুষ ‘শস্য উৎসব’ পালন করে।

ভাদুর মতো Heroism বা বিশেষত্বকে কেন্দ্রকরে ব্যাক্তিপুজো বা দেবতা গড়ে ওঠার নজির হিসেবে ভাদু বিশ্বের অন্যান্য হাজারো সংস্কৃতির সঙ্গে বিশেষ কোনও পার্থক্য বহন করেনা, Herbert Spencer তো সেই আদিম মানুষের প্রবৃত্তি দেখে তাঁর ঐতিহাসিক বই “Encyclopaedia of Ethics and Religion” বলেই গেছেন :
“Anything that transcends the ordinary, a savage thinks of as super-natural or divine, the remarkable man among the rest. Being regarded with awe during his life, he is regarded with increased awe after his death, and the propitiation of his ghosts, becoming greater than the propitiation of ghosts which are less feared, develops into an established worship” কিন্তু ভাদু যেভাবে স্থাপত্যে – ভাস্কর্যে – মধুর্যে কালজয়ী, তা বোধহয় অন্যান্য সকল দেবদেবীর ক্ষেত্রে সবসময় প্রযোজ্য হয়না। এলাকা ভিত্তিক ভাবে ভাদু পুজোর উদ্দেশ্য অনুসারে ও এলাকার নিজস্বতা অনুসারে ভাদু মূর্তিও শিল্পীর সৃষ্টিতে মৌলিকত্বের ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত হয়না। গোপেন্দ্রকৃষ্ণ বসু তাঁর “ বাংলার লৌকিক দেবতা” বইতে বলেছেন আগে ভাদুর কোনো মূর্তিরূপ ছিল না। একটি পাত্রে গোবর রেখে, তার ওপর ধান ছড়িয়ে ঘরটিকে শালুক, দোপাটি ইত্যাদি ফুল দিয়ে সাজিয়ে ভাদুরূপে পুজো করা হতো। পরবর্তীকালে মূর্তিগুলি বিভিন্ন রকম হয় , কোনো এলাকায় দেবীর বাহন হয় হাঁস, কোথাও ময়ূর, কোথাওবা টিয়াপাখি ; সম্ভবত এলাকায় অধিক্য থাকা বৈচিত্রপূর্ণ পাখিদের দেখেই শিল্পীর শিল্পসত্ত্বায় ফুটে ওঠে বিভিন্ন রূপ। কোথাওবা মূর্তির কোলে প্রেমের স্বরূপ হিসেবে ভাদুকে তুলে ধরতে রাধাকৃষ্ণ যুগল বা শুধু কৃষ্ণ থাকে। সাধারণত মূর্তির গায়ের রং হয় হলদেটে।বেশিরভাগ এলাকায় ভাদুর পরনে থাকে শাড়ি, ব্যাতিক্রম ও কিছু আছে ; বাঁকুড়ার পাঁচমুড়া এলাকার ভাদুর পরনে থাকে ঘাগরা, শরীরের ওপরের অংশ ফতুয়ার মতো বস্ত্রদিয়ে মোড়া থাকে। বীরভূমের সাঁইথিয়া এলাকার ভাদু আবার দুহাত তুলে নৃত্যরত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে। ভাদুপুজো উপলক্ষে গ্রামেগঞ্জে ভাদ্রমাসের প্রতিদিন সন্ধ্যের সময় দেবীকে নৈবেদ্য হিসেবে খাজা, জিলিপি, মন্ডা, মিঠাই ইত্যাদি পরিবেশন করবার রীতি আছে। ভাদু যেহেতু তন্ত্র – মন্ত্র কেন্দ্রিক দেবী নন, গান কেন্দ্রিক দেবী তাই প্রসাদ নিয়েও বাঁধা হয়েছে গান :
“কাশীপুরের মহারাজা সে করে ভাদু পূজা।
সন্ধ্যা হলে ঝালর বাজে, থালায় জিলিপি খাজা।।”

ভাদ্রসংকান্তি তে ভাদুপুজোর “ জাগরণ” অর্থাৎ শেষদিন, এইদিন পুজোর মেজাজ থাকে অন্যান্য দিনের তুলনায় আরো রঙিন। সংক্রান্তির দশ বারোদিন আগে থেকেই বাঁকুড়ার কেঞ্জাকুড়া গ্রামে এক থেকে দু’ কেজি ওজনের জিলিপি তৈরী শুরু হয়ে যায়, যাকে আজকাল নেটিজেনরা গালভরা নাম দিয়ে বলে “ জাম্বো জিলাপি”।
এতো ঐতিহ্য সমৃদ্ধ হওয়ার পরও হারিয়ে যাচ্ছে ভাদু। যে ভাদুগানে বলা হতো :
“ কাশীপুর আর রাণীগঞ্জ কেঞ্জাকুড়ায় তোর থানা
বিষ্ণুপুর আর বাঁকুড়াতে পূজা দেয় ষোলো আনা!!”
এখন রানীগঞ্জ, বাঁকুড়ার মতো শহরে, যেভাবে সিলিন্ডারে মোড়া নগরে ঘুঁটেওয়ালি যেভাবে ঘুঁটের ঝুড়ি নিয়ে ফেরি করে ফেরে, সেই দৃষ্টিতে খুঁজলেও ভাদু পুজো দেখতে পাওয়া মুশকিল। গ্রামেগঞ্জে এখনও পুজো হয়, তবে তার বহর আগের তুলনায় প্রায় নগন্য। অধিকাংশ এলাকায় শুধুমাত্র ভাদ্রমাসের শেষদিনেই এখন এই পুজো হয়। ২০২৪ এর ঘটনা, ব্যাক্তিগভাবে ভাদু মূর্তি সংগ্রহের জন্য আমি বাঁকুড়া শহরের একাধিক মূর্তি তৈরীর কারিগরের কাছে গিয়েছিলাম, তাঁদের কেউই আর এই মূর্তি তৈরী করেনা, মূর্তি তৈরীর ছাঁচও হারিয়ে ফেলেছেন তাঁরা। অবশেষে এক বৃদ্ধ কারিগরের থেকে অর্ডার দিয়ে মূর্তি সংগ্রহ করেছিলাম, তিনি হাসিমুখে জানিয়েছিলেন “বিগত পাঁচ বছর পর কেউ ভাদুমূর্তি নিলো”। পাঁচমুড়ার মতো বিখ্যাত কুমোরগ্রাম গুলিতেও আগের থেকে অর্ডার কমেছে অনেকটাই। একদিকে যখন দেশজুড়ে বাড়ছে বিভিন্ন দেবদেবীর পুজোর বহর, পাড়া থেকে শুরুকরে রাজপথ, রাজ প্রতিষ্ঠা হচ্ছে অজস্র মন্দির – মসজিদ – গির্জা। ১৯৭৬ সালে অন্তর্জাতিক স্তরে সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ কে তুলে ধরতে অর্থনীতিবিদ Herbert Schiller “ সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ” তত্ত্বে দেখিয়েছিলেন কীভাবে প্রথম বিশ্বের দেশগুলি তৃতীয় বিশ্বের দেশের কাছে নিজেদের পণ্য বিক্রির জন্য বারংবার বিজ্ঞাপন দেয়, পাশাপাশি তাদের সংস্কৃতিকে উঁচু করে দেখিয়ে ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিকে পিছিয়ে পড়া সংস্কৃতি হিসেবে তুলে ধরে নিজেদের উৎপাদিত বাড়তি পণ্য বিক্রির চেষ্টা করে, এবং তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিকে সাংস্কৃতিক দাস হিসেবে পরিণত করবে চেষ্টা করে। হয়তো সেই তত্ত্ব মানুষের মননে – চিন্তনে – যাপনে এখন অনেকটাই সফল… রাঢ় বাংলায় রোজ নতুন নতুন হাজারো সংস্কৃতির উদ্ভব হলেও হারিয়ে যাচ্ছে লোকায়ত ধারা, ঘরের মেয়ে ভদ্রাবতী।

