সভ্যতার রক্তস্নাত অধ্যায়ে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ আজ বারুদের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, গাজার ধূলিসাৎ জনপদ যেন এক বোবা আর্তনাদ। ঠিক এই ক্রান্তিলগ্নে নয়াদিল্লির মাটিতে অনুষ্ঠিত হলো ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। উদীয়মান অর্থনীতির এই আন্তর্জাতিক মহামঞ্চ থেকে সর্বসম্মতভাবে ঘোষিত ৪৫ পাতার ঐতিহাসিক ‘নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র’ গাজা ও অধিকৃত প্যালেস্তাইনের ক্ষতবিক্ষত মানচিত্রে যেন প্রলেপ লাগাতে চেয়েছে এক দ্ব্যর্থহীন রাজনৈতিক ও মানবিক বার্তার মাধ্যমে।
নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, ইসরায়েল-প্যালেস্তাইন সংঘাতের কোনো সামরিক সমাধান নেই; এর একমাত্র দীর্ঘস্থায়ী ও ন্যায়সঙ্গত পথ হলো শান্তি ও কূটনীতি। ১৯৬৭ সালের পূর্বের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমানা এবং পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও কার্যকরী প্যালেস্তাইন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে ব্রিকস গোষ্ঠী তাদের পুরোনো ও অবিচল অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব এবং আরব শান্তি উদ্যোগের ওপর ভিত্তি করে এই ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান’ (Two-State Solution)-এর রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।
গত অক্টোবর ২০২৫-এর চুক্তি সত্ত্বেও গাজায় চলমান হিংসাত্মক পরিস্থিতি এবং মানবিক বিপর্যয় নিয়ে ব্রিকস সম্মেলনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ঘোষণাপত্রটিতে গাজায় অস্ত্রবিরতি বজায় রাখা এবং সেখানে নির্বিঘ্ন ও পর্যাপ্ত মানবিক সাহায্য সরবরাহের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, খাদ্যাভাবকে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা, স্বাস্থ্য পরিকাঠামো ও সাধারণ নাগরিকদের ওপর হামলা এবং আন্তর্জাতিক ত্রাণের পথ অবরুদ্ধ করার কঠোর নিন্দা জানানো হয়েছে।
এই শীর্ষ সম্মেলনে ভারত যেভাবে মধ্যপ্রাচ্য সংকটে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে এবং বৈশ্বিক বিভাজন এড়িয়ে একটি সর্বসম্মত ঘোষণাপত্র তৈরি করেছে, তা আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছে। ব্রিকস গোষ্ঠীর সম্প্রসারিত পরিসরে (যার মধ্যে রাশিয়া, চিন, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরশাহী ও ইরানও রয়েছে) এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে ঐক্যমত্যে পৌঁছানো প্রমাণ করে যে গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল বিশ্ব এখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরও বেশি সংহতি প্রদর্শন করছে।
রাষ্ট্রসংঘে প্যালেস্তাইনের পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ এবং আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডারসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় প্যালেস্তাইনের উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব ও সম্পদের নাগাল পাওয়ার দাবিও এই ঘোষণাপত্রে জোরালোভাবে উত্থাপিত হয়েছে। এটি কেবল প্যালেস্তাইনের রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের লড়াইকেই ত্বরান্বিত করবে না, বরং একমেরুকেন্দ্রিক বা পশ্চিমা-নিয়ন্ত্রিত বৈশ্বিক কাঠামোর বাইরে বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাকেও জোরালোভাবে তুলে ধরেছে।
নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র নিছক কিছু কূটনৈতিক শব্দের সমষ্টি নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘায়িত রক্তক্ষয় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে উদীয়মান অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলোর একটি সম্মিলিত রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রকাশ। গাজা থেকে প্যালেস্তাইনবাসীকে জবরদস্তি উচ্ছেদ করার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ব্রিকসের এই অবস্থান বিশ্বজুড়ে শান্তিপ্রিয় মানুষের মনে আশার সঞ্চার করেছে। আগামী দিনে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এই যৌথ ঘোষণা প্যালেস্তাইনের মুক্তি ও সার্বভৌমত্ব অর্জনের লড়াইয়ে একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে সন্দেহ নেই।

