ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর মূর্তি অবমাননা ও তা ক্রেন দিয়ে তুলে জঙ্গল বা ঝোপে ফেলে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি। দুর্গাপুর তথা পশ্চিম বর্ধমান জেলার এই ঘটনায় জাতীয় স্তরে চর্চিত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের সুরক্ষা এবং বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবক্ষয় নিয়ে নতুন করে প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস সরাসরি নিশানা করেছে বিজেপিকে, অন্যদিকে পদ্মশিবির এই ঘটনার নেপথ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে আঙুল তুলেছে। সামগ্রিকভাবে, এই মূর্তি উচ্ছেদের ঘটনাটি নিছক কোনো স্থাণুগত বিরোধ নয়, বরং এটি বাংলার বর্তমান রাজনৈতিক জটিলতারই এক প্রতিচ্ছবি।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে দুর্গাপুরের হর্ষবর্ধন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংলগ্ন একটি ধ্যানকেন্দ্রের সামনে থাকা পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর একটি বড় মূর্তি ঘিরে। অভিযোগ ওঠে, একটি বিশেষ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে জায়গার প্রয়োজন হওয়ায় ক্রেন দিয়ে জওহরলাল নেহরুর সেই মূর্তিটি উপড়ে বিদ্যালয়ের পাশের জঙ্গল এলাকায় এনে ফেলে দেওয়া হয়। এই ঘটনার সময় স্থানীয় বিজেপি বিধায়কের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে কংগ্রেস। পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি এই ঘটনাকে দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর প্রতি চরম অসম্মান ও অবমাননা হিসেবে অভিহিত করেছে। শুধু তাই নয়, ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের গ্রেফতারে ২৪ ঘণ্টার ডেডলাইন বেঁধে দিয়েছে কংগ্রেস এবং পুলিশ প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে বৃহত্তর আন্দোলনের হুংকার দিয়েছে।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে মূর্তির রাজনীতি এক অদ্ভুত ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। যখনই কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দল নিজেদের আধিপত্য জাহির করতে চায়, তখনই তারা আক্রমণ করে অতীতের প্রতীকগুলোকে। দুর্গাপুরের এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন উপাখ্যান নয়; এটি আমাদের ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতার এক করুণ প্রতিচ্ছবি। একটি স্বাধীন দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীকে যেভাবে ক্রেন দিয়ে তুলে জঞ্জালের পাশে ছুড়ে ফেলা হলো, তা সভ্য সমাজের বুকে এক গভীর ক্ষতচিহ্ন এঁকে দিয়ে গেলো৷ রাজনৈতিক মতাদর্শগত লড়াই যখন নীতি ও আদর্শের গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রতীক ভাঙার খেলায় পরিণত হয়, তখন তা সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ হতে পারে না। পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু আধুনিক ভারতের ভিত গড়ার কারিগর—তাঁর অবদান ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব সর্বজনবিদিত। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থে বা তাৎক্ষণিক সুবিধা পাওয়ার জন্য এ ধরনের জাতীয় ব্যক্তিত্বদের মূর্তি নিয়ে যে ধরনের সংঘাতের আবহ তৈরি করে, তা সামগ্রিকভাবে দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকেই খাটো করে।
এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে প্রশাসনের ভূমিকা ও আইনশৃঙ্খলা নিয়েও প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে। একটি প্রকাশ্য স্থানে ক্রেন লাগিয়ে এত বড় একটি মূর্তি তুলে ফেলে দেওয়া হলো, অথচ স্থানীয় প্রশাসন বা পুলিশ আগে থেকে কোনো খবর পেল না—তা দুর্ভাগ্যজনক।
পরিশেষে বলা যায়, দুর্গাপুরের জওহরলাল নেহরুর মূর্তি উচ্ছেদের ঘটনাটি কেবল একটি মূর্তি অপসারণের আইনি বা প্রশাসনিক বিষয় নয়। এটি বাংলার রাজনৈতিক দলগুলির পারস্পরিক আস্থাহীনতা, দায় এড়ানোর সংস্কৃতি এবং ঐতিহাসিক ঐতিহ্যকে রাজনীতির বলি বানানোর একটি নিকৃষ্ট নিদর্শন। দোষী যেই হোক না কেন, এ ধরনের ঘটনা স্বাধীন ভারতের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।
প্রশ্ন হলো, এই কাদা ছোড়াছুড়ির রাজনীতি শেষ কোথায়? কংগ্রেস যখন হুঁশিয়ারি দেয় বৃহত্তর আন্দোলনের, আর বিরোধীরা যখন একে অপরের ঘাড়ে বন্দুক রেখে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত, তখন সাধারণ মানুষের মনে দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।

