ক্যাম্পাসে গ্রাফিতিতে চুনকাম ও রাষ্ট্রের ছায়া বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় বন্ধ করে সার্বিক হোক নির্বাচন! তবেই সাপমুক্তি হবে পশ্চিমবঙ্গের? বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটে জিতে মোদীর সঙ্গে ব্রেকফাস্ট! সায়নী, কাকলীরা আর জিতবেন? প্রতিবাদী মানেই ‘অ্যান্টিন্যাশনাল’ নয়, ভাগবতের কথা কি মাথায় রাখবে তথাকথিত ‘দেশভক্ত’রা? বাঁকিপুরের ঝাঁকি, সঙ্গে CJP! ঘুরে দাঁড়াতে পারবে BJP? গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কাঁটা মোদী-শাহ’র CPIM থেকে BJP হয়ে তৃণমূল! বিরোধী হলেই কাদা-ডিম্ ছোঁড়ার রাজনীতি বাংলায়, কবে বদলাব আমরা? জমিতেও হিন্দু-মুসলমান? মুখ্যমন্ত্রীর ‘ল্যান্ড জিহাদ’ মন্তব্যে শোরগোল বঙ্গ রাজনীতিতে রেখা পাত্রের বিরুদ্ধে বাড়ি দখলের অভিযোগ, শর্বরীর বিরুদ্ধে দোকান! তোলাবাজির TMC-BJP হয়?

জল-রাজনীতির মেঘ: সীমান্ত সংলগ্ন চিনা বাঁধ এবং ভারতের ভূতাত্ত্বিক উদ্বেগ

২৪ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন


​আধুনিক ভূরাজনীতিতে যুদ্ধক্ষেত্রের সংজ্ঞা কেবল কাঁটাতার, বাঙ্কার কিংবা ক্ষেপণাস্ত্রের মহড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর পরিধি এখন বিস্তৃত হয়েছে নদীমাতৃক ভূগোলের গভীরে, যেখানে জলসম্পদ হয়ে উঠেছে এক সুক্ষ্ম অথচ বিধ্বংসী কৌশলগত অস্ত্র। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের উত্তরপূর্ব সীমান্ত সংলগ্ন তিব্বত অঞ্চলে চিনের তরফ থেকে বিশাল আকারের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তথা বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং ভূবিজ্ঞান মহলে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটেই বিশেষজ্ঞদের একাংশ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এই মেগা বাঁধ কেবল অর্থনৈতিক বা শক্তির উৎস নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার নদীভিত্তিক বাস্তুতন্ত্র এবং জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক অদৃশ্য ‘জল-বোমা’ (Water Bomb)-রূপেই আত্মপ্রকাশ করতে পারে।


​তিব্বতের দুর্গম ভূপ্রকৃতি এবং হিমালয়ের উচ্চ অববাহিকা থেকে উৎপন্ন নদীগুলির ওপর চিনের লাগাতার আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা নতুন নয়। ভারতীয় সীমান্ত ঘেঁষা ইয়ার্লুং সাংপো (যা পরবর্তী সময়ে ভারতে ব্রহ্মপুত্র এবং বাংলাদেশে যমুনা নামে পরিচিত) নদীর ওপর বেইজিংয়ের এই বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। প্রকৌশল বিদ্যার নিরিখে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে চলেছে, যা ত্রিখণ্ডিত বা বহুমাত্রিক জলপ্রবাহের মাধ্যমে বিশাল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগোচ্ছে। কিন্তু এর নেপথ্যেই লুকিয়ে রয়েছে নিম্ন অববাহিকার দেশগুলোর জন্য এক সুদূরপ্রসারী পরিবেশগত ও কৌশলগত সংকট।


​বিজ্ঞানীদের মতে, হিমালয় অঞ্চলটি ভূতাত্ত্বিক দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সক্রিয় ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। এই ধরনের একটি ভঙ্গুর পাহাড়ি ভূখণ্ডে বিশাল জলরাশি সঞ্চিত করে মেগা বাঁধ নির্মাণ করা হলে তা প্রাকৃতিকভাবেই চরম দুর্যোগ ডেকে আনতে পারে। সামান্য ভূকম্পন বা পাহাড়ি ধসের ফলে যদি বাঁধের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে নিমেষেই প্লাবিত হতে পারে অরুণাচল প্রদেশ থেকে শুরু করে অসমের বিস্তীর্ণ সমতলভূমি। এই ধীর বা হঠাৎ কৃত্রিম প্লাবন কেবল মানববসতি ও কৃষিজমি ধ্বংস করবে না, বরং ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্যকে চিরতরে বিপন্ন করে তুলবে।


​ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রধান উদ্বেগটি নিহিত রয়েছে চিনের ‘ওয়াটার উইপনরাইজেশন’ বা জলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ক্ষমতার মধ্যে। আন্তর্জাতিক নদী নীতি এবং ভাটির দেশের অধিকার সংক্রান্ত কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি বা নদী অববাহিকা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ কাঠামোর মধ্যে চিন সাধারণত অবাধ তথ্য আদান-প্রদান করতে চায় না। এর ফলে নদীপ্রবাহের নিয়ন্ত্রণ যদি পুরোপুরি চিনের হাতে চলে যায়, তবে তারা যেকোনো সময় শুষ্ক মৌসুমে জল আটকে রেখে ভাটির অঞ্চলে কৃত্রিম খরা সৃষ্টি করতে পারে কিংবা বর্ষার সময়ে আকস্মিক জল ছেড়ে দিয়ে আকস্মিক বন্যা বা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এই রূপান্তরটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পানিসম্পদ নিরাপত্তা এবং কৃষি অর্থনীতির মূলে এক স্থায়ী অশনিসংকেত নিয়ে আসে।


​এই সম্ভাব্য আধিপত্যবাদের মোকাবিলায় ভারতও হাত গুটিয়ে বসে নেই। কৌশলগত সমীকরণ বজায় রাখতে এবং বিকল্প প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ভারত সরকারের তরফ থেকেও অরুণাচল প্রদেশের সিয়াং বা অন্যান্য অববাহিকায় পাল্টা মেগা বাঁধ বা জলাধার নির্মাণের পরিকল্পনা ও পর্যালোচনা চলছে। তবে পাহাড়ি ভূখণ্ডের বাস্তুতন্ত্র, স্থানীয় আদিবাসী জনজাতির অধিকার এবং রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে এই ধরনের বৃহৎ পরিকাঠামো দ্রুত বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ। তা সত্ত্বেও, সীমান্ত সুরক্ষার স্বার্থে জলসম্পদের এই অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করা ভারতের কাছে এক অপরিহার্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।


ভারতের বরফ​ গলা জলে পুষ্ট নদীগুলো কেবল জলস্রোত নয়, এগুলি কোটি কোটি মানুষের জীবনরেখা। ভূরাজনৈতিক উচ্চাশা এবং আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে প্রকৃতিকে পণবন্দী করার এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শক্তির প্রদর্শন বা কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের এই কূটরাজনীতি পরিহার করে আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং পরিবেশের সুরক্ষাই হতে পারে মানবসভ্যতার টিকে থাকার একমাত্র পথ। অন্যথায়, পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা পবিত্র নদীগুলিই একদিন মানবজাতির অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় সংকটের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

অন্যান্য প্রতিবেদন.