“যখন আমি ভারতবর্ষের কথা ভাবি, তখন আমি ভালবাসার কথা ভাবি। আমার মনে হয় ভারতবর্ষে একটা কারণেই এখনও গণতন্ত্র আছে, কারণ এই দেশের মানুষ এখনও নিজেদের থেকেও বেশী তাঁর দেশটাকে ভালবাসেন। যখন আমি ভারতবর্ষের কথা ভাবি, তখন আমি আশার কথা ভাবি। স্বপ্ন দেখতে বারণ করলেও অসংখ্য মানুষ আজও স্বপ্ন দেখেন। হয়ত এই দেশে একটি শিশুর মাতৃভাষা আজও হয়ত একটা গান। আমি বৃক্ষের কথা ভাবি, পাহাড়ের কথা ভাবি, উৎসবের কথা ভাবি, খাবারের কথা ভাবি। ভারত আসলে নিজেই প্রাথমিকভাবে একটা উৎসব। আপনি আমাকে আবেগপ্রবণ বলতেই পারেন, কিন্তু আপনিও তো একইরকম আবেগপ্রবণ। এই দেশটায় তো আবেগপ্রবণ মানুষই বেশী। সেই আবেগপ্রবণ মানুষদের কয়েকজন মিলেই তো ভারতের সংবিধান রচনা করেছেন। সেই আবেগপ্রবণ মানুষেরাই তো রাস্তায় নামেন, যখন কেউ নামে না। আমি যখন স্বপ্নের কথা ভাবি, তখন আমার মানুষের কষ্টের কথা মনে হয়, কারা কষ্ট দিচ্ছে তাঁদের কথা মনে হয় তখন দুঃখ হয়, কিন্তু দুঃখেরও তো সঙ্গী আছে- তাঁর নাম আশা। আশাই হচ্ছে সাহস। যে সাহস ভারতের সভ্যতার প্রাচীনতম উত্তরাধিকার। ভারতীয় কে, সেই প্রশ্ন বারংবার করলে একটাই উত্তর আসে, যে সাহসী সে ভারতীয়। প্রতিটি প্রজন্মের কাছে সুযোগ আসে, সে কীভাবে তাঁর দেশটাকে আগামীদিনে কল্পনা করছে এবং সেইজন্যেই হয়ত আজকের প্রজন্ম রাস্তায় নেমেছে। মার খাচ্ছে তবুও লড়ছে, কারণ একজন মানুষ তাঁর ভালবাসার জন্য লড়ে। অন্য সব কিছুকে সে ছেড়ে দিতে পারে, কিন্তু ভালবাসার জন্য সে শেষ পর্যন্ত লড়ে। এই প্রজন্ম জানে শিক্ষিত হতে গেলে, লড়তে হবে, সংগঠিত হতে হবে, সেই জন্যেই সে লড়ছে, ভারতবর্ষকে সে ভালবাসে বলেই লড়ছে।”

এই কথাগুলো আজকের সময়ের হয়ত সবচেয়ে শক্তিশালী লেখক এবং সমাজকর্মী অরুন্ধতী রায় বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ের ছাত্র আন্দোলন প্রসঙ্গে। অরুন্ধতী রায় যে কথাগুলো বলেছেন, সেই কথাগুলোই একজন সঠিক অভিভাবকের কথা হতে পারে। যে অভিভাবক চান তাঁর সন্তানসম ছাত্ররা যে রাস্তায় নেমেছে, যে ভালবাসার জন্য রাস্তায় নেমেছে সেই লড়াইতে তারা যেন জয়ী হয়। এই চাওয়া কিন্তু শুধু নিজের সন্তানের ভাল থাকার চাওয়া নয়, সামগ্রিকতার শিক্ষা। এই একই আর্তি তো ছিল কবি শঙ্খ ঘোষের যখন তিনি ‘বাবরের প্রার্থনা’ লিখেছিলেন ১৯৭৪ সালে। তাঁর ‘কবিতার মূহুর্ত’ গ্রন্থতে কোন কবিতা কী প্রেক্ষিতে তিনি লিখেছিলেন, তা তিনি নিজেই লিখে গেছেন। সেখানে ‘বাবরের প্রার্থনা’র প্রেক্ষিত সম্পর্কে লিখতে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন-
“শেষ হয়ে আসছে ১৯৭৪। বড়ো মেয়েটি বেশ অসুস্থ তখন, ডাক্তারিরা ভালো ধরতে পারছেন না রোগটা ঠিক কোথায়। শুয়ে আছে অনেকদিন, মুখের লাবণ্য যাচ্ছে মিলিয়ে। অথচ তখন তার ফুটে উঠবার বয়স।
মন্থর হয়ে আছে মনটা।”

ঘুরে বেড়াচ্ছি একদিন যাদবপুরের ক্যাম্পাসের মধ্যে, দিনের ক্লাস আর সন্ধ্যার ক্লাসের সন্ধিমুখে মাঝখানে অনিশ্চিত ফাঁকা বিকেল, বন্ধুরা কেউ সঙ্গে নেই সেদিন। পশ্চিম থেকে পুবে, রাস্তার ওপর পায়চারি করতে করতে ঘরের ছবির সঙ্গে মনে ভিড় করে আসে ক্যাম্পাসেরও পুরোনো অনেক ছবি। দু-একটি ছেলেমেয়ে কখনো-কখনো পাশ দিয়ে চলে যায়, তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হয় : কদিন আগেও এখানে যত প্রখরতা ঝলসে উঠত নানা সময়ে, তা যেন একটু স্তম্ভিত হয়ে আছে আজ। কেবল যে এখানেই তা তো নয়, গোটা দেশ জুড়েই। সে কি খুব শান্তির সময় ছিল? একেবারেই নয়। সংঘর্ষ অশান্তিতেই বরং ভরে ছিল দিনগুলি। এই পথ ওই মাঠ, এর প্রতিটি বিন্দু তার কোনো-না-কোনো উন্মাদনার চিহ্ন ধরে আছে, ভুলের লাঞ্ছনার আত্মক্ষয়ের, কিন্তু সেইসঙ্গে কিছু স্বপ্নেরও, কিছু জীবনেরও। আজ প্রশমিত হয়ে আছে সব। কিছু-একটা হবার কথা ছিল, অলক্ষ্য কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু হলো না ঠিক, হয়ে উঠল না।

কিন্তু কেন হলো না? আমরাই কি দায়ী নাই? কিছু কি করেছি আমরা? করতে পেরেছি? আমাদের অল্পবয়স থেকে সমস্তটা সময় স্তূপ হয়ে ঘিরে ধরতে থাকে মাথা। ফিরে আসে মেয়ের মুখ। মনে পড়ে আমার নিষ্ক্রিয়তার কথা। তাকিয়ে দেখি কলেজপ্রাঙ্গণ, ফাঁকা। হাঁটতে হাঁটতে পুবের শেষ প্রান্তে গিয়ে পশ্চিমমুখে ফিরেছি আবার, চোখ পড়ে আকাশে। সূর্য আড়াল হয়ে যাবে আর অল্প পরেই। হঠাৎ, একেবারে হঠাৎ তখন মনে হলো মাটির ওপর জানু পেতে বসে পড়ি একবার এই সূর্যের সামনে, কেউ তো নেই কোথাও! যেন সমস্ত শরীর ভরে উদ্গত হয়ে উঠতে চায় অতল থেকে কোনো প্রার্থনা, সকলের জন্য। মনে এল নামাজের ছবি। আর সঙ্গে সঙ্গে মনে এল ইতিহাসের পুরোনো সেই গল্প, রুগ্ণ হুমায়ুনকে ঘিরে ঘিরে বাবর প্রার্থনা। মন্থরতার ভিতর থেকে তখন উঠে আসতে চায় কতগুলি শব্দ : এই তো জানু পেতে—, এই তো জানু পেতে”
কবি শঙ্খ ঘোষের ‘বাবরের প্রার্থনা’র প্রেক্ষিতে আজকের ছাত্র আন্দোলনকেও একটু দেখা জরুরি। সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, ভারতবর্ষে বাম ও ডানপন্থী রাজনীতির মধ্যকার পার্থক্যটি মূলত মতাদর্শ বা দাবির বিষয়বস্তু নিয়ে ছিল না; বরং তা ছিল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার পদ্ধতির বিষয়। তথাকথিত ‘বাম’ শক্তির প্রতি মানুষের ভয়ের কারণ তাদের মতাদর্শের প্রভাব নিয়ে ছিল না, বরং আন্দোলন-ভিত্তিক রাজনীতির প্রতি তাদের সেই কথিত উসকানিই ছিল ভয়ের মূল কারণ। এ কারণেই যেকোনো ধরনের ‘অ্যাক্টিভিজম’ বা সক্রিয় আন্দোলনকেই সবসময় ‘বামপন্থী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হত এবং এখনো তাই হয়। তাই অনেকেই বিচক্ষণতার সাথে ব্যক্তিগত অগ্রগতির প্রচেষ্টাই শেষ পর্যন্ত সামাজিক পরিবর্তনের পথ প্রশস্ত করতে পারে বলে মনে করতেন বা এখনো করেন। তাই রাজপথে হাজার হাজার মানুষের অবস্থানের চেয়ে লক্ষ লক্ষ ভারতীয়র নিজেদের পেশাগত জীবনে মনোযোগ নিবদ্ধ করাই ভারতের অগ্রগতির জন্য অধিকতর কার্যকর উপায় বলে অনেকেই মনে করেন। কারণ, সামগ্রিক বিচারে তার প্রভাব হতো অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী।
আজকের নতুন প্রজন্মের এই বিদ্রোহ সেই বিভ্রম চূর্ণ করে দিয়েছে। ক্যারিয়ার বা পেশাগত জীবনের ওপর মনোযোগ নিবদ্ধ করার পক্ষে বিচক্ষণ কোনো যুক্তি দাঁড় করানো কঠিন, যখন সেই পেশাগুলোতে ন্যায্য সুযোগ পাওয়ার ভিত্তি হিসেবে কাজ করা নিয়ম-কানুন বা রীতিনীতিগুলোই আজ ক্ষয়ে গেছে। ভেঙে পড়া পরীক্ষা-ব্যবস্থা আসলে সেই পরিস্থিতিরই প্রতিফলন। অথচ, পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের যে অন্তর্নিহিত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি। আপসকামিতার রাজনীতি এখন আর টেকসই নয়। বস্তুগত দিক থেকে, অধিকাংশ মানুষের জন্য এটি নিরাপত্তা বা অগ্রগতির কোনো নির্ভরযোগ্য পথ আর তৈরি করতে পারছে না। নৈতিক দিক থেকেও, বর্তমান ব্যবস্থার কাছে নতিস্বীকারের মধ্য দিয়ে যে পরোক্ষ সায় তৈরি হচ্ছে, তা ক্রমশ বাড়ছে। এই নতিস্বীকারের বিষয়টি যেন দমবন্ধ করা পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। জেন জি’র বিদ্রোহ কেবল তাদের দাবির কারণে ‘র্যাডিকাল’ বা আমূল পরিবর্তনকামী নয়; বরং তারা একটি কঠোর সত্য উচ্চারণ করছে বলেই এটি এমন—আর তা হলো, আপসকামিতার রাজনীতি কোনো কাজের পথ নয়, এমনকি সেই রাজনীতির নিজস্ব শর্তাবলি বিবেচনা করলেও নয়। তবে আপসকামিতার রাজনীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হলো বিদ্রোহের সবচেয়ে অন্তরঙ্গ এক রূপ—যা মূলত নিজের বাবা-মায়ের নৈতিক জগতের বিরুদ্ধেই এক বিদ্রোহ। বাবা-মায়ের সেই আপসকামিতার বিরুদ্ধে আজকের প্রজন্ম যখন ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্দ্ধে উঠে সমষ্টির হিতের কথা বলছে, তখন একজন অভিভাবকের কী করণীয় থাকে? তাঁর তো আগলে রাখাই কাজ, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সঠিক দিশা দেখানোই কাজ। সেই জন্যেই কবির ঐ লেখা একজন অভিভাবকের লেখা। একজন ব্যর্থ অভিভাবকের, যাঁর সামনে একটা প্রজন্ম শেষ হয়ে গেছে, একটা স্বপ্ন দেখতে গিয়ে। সেই স্বপ্ন ভুল, ঠিক তা নিয়ে নানান বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু সমাজবদলের সেই স্বপ্ন তো মিথ্যে হয়ে যায় না।

একজন ব্যক্তি, কবি শঙ্খ ঘোষের সম্পর্কে (নাম না-করে) কটূক্তি করেন ‘পশ্চিমবঙ্গের বিবেক হয়ে ওঠা বরিশালের এক কবি তখন ভারতের বিদেশি আক্রমণকারী বাবরের দুঃখে কবিতা লিখছেন! অন্ধকার সংস্কৃতির কৃষ্ণগহ্বরে আমরা প্রবেশ করেছিলাম’ এই উক্তি অনেকে হয়ত হাস্যকর বলতে পারেন, কিন্তু এই উক্তির মধ্যে আসলে অপরকে আঘাত করার একটা ক্রূরতাও আছে। কবি বেঁচে থাকলে হয়ত, তাঁর ‘জার্নাল’ আরও একটি লেখা পেত। যে কথা আজকের ছাত্র বিক্ষোভে সামিল হওয়া ছাত্রছাত্রীদের দেখে অরুন্ধতী রায় লিখছেন, সেই একই আর্তি হয়ত উঠে আসত কবির কলমে। যাঁরা স্বপ্ন দেখে না, যাঁরা ভালবাসার জন্য লড়তে পারে, তাঁরাই তো আশা দেখাতে পারে। ‘বাবরের প্রার্থনা’ লেখার শুরু হয়ত, নিজের কন্যা সন্তানের অসুস্থতা নিয়ে, কখন যেন সেই লেখা ব্যক্তি থেকে সমষ্টির হয়ে যায়, কখন যেন এক পিতার তাঁর সন্তানের অসুস্থতার আর্তি থেকে তাঁর আশেপাশের সমস্ত সন্তানের মঙ্গলকামনায় রূপান্তরিত হয়ে যায়। ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র বর্ণিত সেই ঈশ্বরী পাটনীর জোর হাতে বর চাওয়া ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে’ কোথায় যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

