দেশের ভ্রূক্ষেপ নেই, মিডিয়ার লাইমলাইট নেই, সমাজমাধ্যমে সেলিব্রেশন নেই– নীরবে ইতিহাস লিখছে মিনার্ভা। রঞ্জিত বাজাজের মিনার্ভা অ্যাকাডেমি। গোটা বিশ্ব যখন বিশ্বকাপ জ্বরে আক্রান্ত, গোটা ভারত যখন ব্রাজিল- আর্জেন্টিনা- জার্মানি- স্পেনে বিভক্ত, ঠিক তখনই “মৃত মহাবন্দরে বাঁচার আজান” গাইছে এদেশের খুদেরা। সুইডেনের মাটিতে ফাইনালে ব্রাজিলের শক্তিশালী প্রতিপক্ষ আরএস স্পোর্টস ইয়েলোকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ‘গোথিয়া কাপ’ শিরোপা ধরে রাখল মিনার্ভার অনুর্ধ- ১২। জিতে এলো ওয়ার্ল্ড ইউথ কাপ। ফাইনালে মিনার্ভার হয়ে প্রথম গোল করেন মণিপুরের পাংজাং গ্রামের কিপগেন থাংসাংলেন।
গোটা টুর্নামেন্টে এগারোটা গোল করে গোথিয়া কাপ ২০২৬ ‘এর মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্লেয়ারও বটে! বিগত তিন বছর যাবৎ কিপগেন থাংসাংলেনের রাজ্য মণিপুর জ্বলছে জাতিদাঙ্গায়, ভিটে মাটি হারিয়ে প্রায় ৫০ হাজার উদ্বাস্তু দিন কাটাচ্ছে রিলিফ ক্যাম্পে, উপত্যকায় মণিপুরের প্রভাবশালী জনগোষ্ঠী মেইতেইদের দীর্ঘদিনের দাবি মতো দেশের ডাবল ইঞ্জিন সরকার এনআরসি করে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিতে চাইছে কিপগেন থাংসাংলেনদের কুকি-জো কমিউনিটিকে। বিজেপির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বীরেন্দ্র সিং এই জনগোষ্ঠীকে উগ্রপন্থী আখ্যা দিয়ে ফেলেছে ইতিমধ্যেই। রক্তাক্ত মণিপুরে বিজেপি সরকার যখন এনআরসি চালুর প্রস্তাব দিয়ে আগুনে ঘি ঢালার বন্দোবস্ত করছে, ঠিক তখনই এই কুকি- জো জনগোষ্ঠীর তিন খুদে ফুটবলার বিশ্ব ফুটবলে এদেশের মানদণ্ড ওপরে তুলে ধরছে। দেশের পতাকা গায়ে জড়িয়ে দেশের মাটিকে “জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসনে” বসানোর জন্য প্রাণপাত করছে। এবছরই নরওয়েতে হেলসিঙ্কি কাপ জিতে এসেছে কিপগেন থাংসাংলেনরা! হেলসিঙ্কি এবং গোথিয়া কাপ মিলিয়ে কিপগেন থাংসাংলেন গোল করেছে ৩৫টা! কুকি- জো জনগোষ্ঠীরই খুদে ফুটবলার লালভাংঘাও হাওকিপ এবং সেইমিনসাংও দুটো টুর্নামেন্ট জুড়ে ই গোলের বন্যা বইয়ে গেছে মিনার্ভার পক্ষে! যে জনগোষ্ঠীকে এই দেশের সরকার দেশ থেকে তাড়িয়ে দিতে চায়, বেনাগরিক করে তুলতে চায়, সেই দেশের সরকারের মুখে যেন সপাটে চড় মেরে সুইডেনের মাটিতে জাতীয় পতাকা ওড়ালো সেইমিনসাংরা! যে উত্তর- পূর্ব ভারতকে চিনি- পিঙ্কিতে ট্রোল করেছে এই দেশ, সেই উত্তর- পূর্ব ভারতের মেজরিটিই আজ সারা বিশ্বের সামনে দেশের মুখ উজ্জ্বল করলো। গর্ব হয়, ম্যাচে জেতার পর যখন কিপগেন থাংসাংলেন এক ইন্টারভিউতে বলে– “ We told each other that we needed to keep fighting and score more goals. If we continued to play as a team, we would score more goals and win the match”. মনে হয়, ইশ, সারা দেশটা যদি একটু এভাবে ভাবতে পারতো!

একটা ভিডিওতে দেখলাম হেলসিঙ্কি কাপের ফাইনাল ম্যাচে রঞ্জিত বাজাজ গোটা টিমকে পেপ টক দিতে গিয়ে বলছেন, “सौ साल में कभी इनको ऐसी रिपीट नहीं मिलेगी जो आज….. भारत माता की जय”। মনে পড়ে যাচ্ছিল এগারো সিনেমায় ক্লাব চেয়ারম্যানের ভূমিকায় অভিনয় করা বিশ্বজিৎ চক্রবর্তীর হীরালালদের বলা সেই অমোঘ বাণী– “মাথা তোলো হীরালাল, মাথা তোলো, আমরা আর মাথা নীচু করে থাকবনা…আজ আমরা এখানে খালি খেলতে আসিনি, লড়তে এসেছি। এ লড়াই শুধু গোলের জন্য নয়, আমাদের দেশের জন্যে, জাতির জন্যে। আমাদের মান- সম্মান, অস্তিত্বের জন্যে। মাথা উঁচু করে বাঁচার এই একটাই রাস্তা খোলা আছে…!” রঞ্জিত বাজাজ যেন থ্রু আউট এই ভূমিকাই পালন করে গেলেন। বিপক্ষের জালে মুক্তি খুঁজতে শেখালেন তাঁর অ্যাকাডেমিকে। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা, কচ্ছ থেকে কাহো– গোটা ভারতবর্ষকে ফুটবলের সুতোয় বাঁধার চেষ্টা করছেন। অ্যাকাডেমির বাচ্চাদের শেখাচ্ছেন, এ লড়াই বাঁচার লড়াই। এ লড়াই লড়তে হবে। এ লড়াই জিততে হবে।
শুধুমাত্র ভালোবাসা আর ইচ্ছেশক্তির জোরেই যে দুনিয়ার সব লড়াই জিতে নেওয়া যায়, এই মানসিকতাই খুদে বাচ্চাদের মধ্যে প্রতিফলিত হচ্ছে। সরকারি সাহায্য নেই, কর্পোরেটের ফান্ডিং নেই, স্পনসর নেই– ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় একটা সময় মানুষের থেকে চাঁদা তুলে তিলে তিলে রঞ্জিত বাজাজ গড়ে তুলেছেন স্বপ্নের মিনার্ভাকে। মানুষের হাতে- পায়ে পড়েছেন অবধি। অর্থাভাবের কারণে তরুণ ফুটবলারদের আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে পাঠানোর সুযোগ যখন বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, তখন ভারতীয় ফুটবলের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে মিনার্ভা একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা রঞ্জিত বাজাজ ৫৬ লক্ষ টাকার মতো ঋণ নিয়েছিলেন। নিজের স্ত্রীর গয়না বন্দক রেখে মিনার্ভা একাডেমির স্বপ্ন বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। প্যাশন আর জেদ ছাড়া এরম পাগলামি কেই বা করে! এই পাগলামিটাই যেন গোটা মিনার্ভার ফুটবলার মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে পেরেছেন তিনি। নইলে শেষ দুই বছরে সুইডেনের ডানা কাপ, নরওয়ের হেলসিঙ্কি কাপ, গোথিয়া কাপ সহ ইওরোপের পাঁচটি টুর্নামেন্ট জেতা তো আর মুখের কথা নয়! ইউরোপজুড়ে যেন দাদাগিরি চালাচ্ছে ভারতের একটা ফুটবল দল। গোথিয়া কাপেও কোয়ার্টার ফাইনাল অবধি ইংল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, কেনিয়া, ফ্রান্স, বলিভিয়ার টিম গুলোকে ভূরিভূরি গোলে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে ওয়াংশেম, নংরেংরা। সেমিফাইনালে ইউক্রেনের এফসি লোকোমোটিভ কিয়েভকে ৩-২ গোলে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট কাটে টিম মিনার্ভা। আর ফাইনালে? ফের ইতিহাস।

মিনার্ভা যখন অন্ধকারে আলো জ্বেলে চলেছে প্রতিনিয়ত, অন্যদিকে একের পর এক আলো নিভিয়ে দিয়ে অন্ধকারকে আরো তীব্র করার ষড়যন্ত্র চলছে। দুর্নীতিতে গলা অবধি ডুবে রয়েছে দেশের ফুটবল ফেডারেশন। নাম পরিবর্তন করেই খালাস তারা। এশিয়ান গেমস থেকে দল তুলে নিয়ে আপাতত নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে! আর দেশের সরকার? বিশ্বমানের অ্যাকাডেমি তৈরী, উন্নত প্রশিক্ষণের বন্দোবস্ত, উন্নত কোচিং পরিষেবা ইত্যাদির বদলে দেশের ফুটবলটাকেও কর্পোরেটের হাতে তুলে দিয়ে ধ্বংসলীলা দেখছে। ঠিক যেমনটা দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে চলছে! দেশের পরিবেশের ওপর চলছে। মিনার্ভার লাগামছাড়া এই দৌড়ে কেউ পাশে থাক বা না থাক, দেশপ্রেম আছে। আছে ফুটবলকে হাতিয়ার করে লড়ে যাওয়ার রূপকথা। আছে ফুটবল বিশ্বের মানচিত্রে নিজের দেশকে তুলে ধরার তীব্র জেদ। যে জেদ আসলে কোটি কোটি ভারতবাসীর জেদ। যে স্বপ্ন এই দেশের বস্তিতে বস্তিতে লালিত হয়। যে স্বপ্নে ভারতের ফুটবল বিশ্বকাপ খেলা আছে। যে স্বপ্নে বিজয়ন, বাইচুং, সুনীলদের রক্তঘাম আছে। যে স্বপ্নে ব্রাজিল- আর্জেন্টিনা ডিবেট থেকে বেরিয়ে এসে চিৎকার করে আসমিদ্রহিমাচলে গাওয়া একটাই ধ্বনি শোনা যায়– “ ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া”! যেখানে কোনো প্রদেশিকতা নেই, বিচ্ছিন্নতাবাদ নেই, দুর্নীতির বেড়াজাল নেই, ফেভারিটিজম নেই। দেশ আছে। দেশপ্রেম আছে। সেই স্বপ্নে মণিপুর আছে, মিজোরাম আছে, নাগাল্যান্ড আছে। সেই স্বপ্নে বিভাজিত ভারত নয়, এক এবং ঐক্যবদ্ধ ভারত আছে।
আমি জানিনা রঞ্জিত বাজাজ তাঁর ছেলেদের এগারো সিনেমার কোনো গান শুনিয়েছেন কিনা আদৌ! যদি না শুনিয়ে থাকেন, তাঁকে অনুরোধ করবো শোনাতে! কারণ এই লড়াইতে একটাই সম্বল– প্রবল থেকে প্রবলতর প্রতিপক্ষকেও ধরাশায়ী করে দেয় দেশপ্রেমের জেদ! এ খেলা শুধু খেলা নয়, সংগ্রাম। অস্তিত্বের, দেশপ্রেমের, মুক্তির সংগ্রাম। রক্তাক্ত মণিপুরের মাটিতে তিন রঙে লিখে দেওয়া– “শুধু খোঁজে সুখ তোলপাড় বুক, হাতড়ে মাটির স্বাধীন মুখ”। মিনার্ভাকে সামনে রেখে সারাদেশ লড়ুক, জিততে চাওয়া উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করুক– জিতবোই আমরা ঝরিয়ে ঘাম, চাই রক্তক্ষরণের দাম। বিচ্ছিনতাবাদের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রের বিভেদকামী চরিত্রের চোখে চোখ রেখে লড়াইয়ের প্রতিশব্দ হোক ফুটবল।

