মেসিদের গেম ম্যানেজমেন্ট-ধীরগতিতে খেলা কি ফাইনালের সূক্ষ্ম হিসেব?

৫১ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

শেষ ১৩-১৪ মিনিটের যে খেলাটা আর্জেন্টিনা খেলে, এই খেলাটা কি আগে খেলতে পারে না? কী মনে হয়? আর্জেন্টিনার কি এই খেলাটা খেলার মতো ক্ষমতা নেই? তাহলে কেন খেলছেন না লিওনেল মেসিরা? মানে আর্জেন্টিনার ফ্যানেদের একটা আক্ষেপ থেকে যাচ্ছে যে টিম জিতছে, মানে ভালোভাবেই জিতেছে, অন্তত স্কোরলাইন সেটা বললেও ম্যাচের গল্প তা বলছে না। তো এই কারণে আপনার মানসিকভাবে একটা আক্ষেপ হচ্ছে বৈ কি, মনে হচ্ছে এভাবে আমাদের হৃদপিণ্ড নিয়ে খেলা করার দরকার কী?

কেন অলআউট যাচ্ছে না আর্জেন্টিনা? এখন উত্তর হলো আর্জেন্টিনা চাইলে কিন্তু খেলতে পারে। আর্জেন্টিনা উইং নামালে ভালো স্ট্রেস করতে পারে। সেক্ষেত্রে আর্জেন্টিনা মাঝখানে এরকম জমাট থাকছে কেন এবং ৬০-৭০ মিনিট পর্যন্ত এরকম একটা গোল দিয়ে স্লো কেন খেলছে? লিড স্লো রেখে দিচ্ছে এবং জমাট থাকছে।


দু’টো সম্ভাব্য দিকই তুলে ধরছি আমরা। প্রথম, একটা দিক হচ্ছে যে আর্জেন্টিনা তাদের এনার্জিটা প্রিজার্ভ করছে। কারণ এটা হিউমিড কন্ডিশনের খেলা ইউএসএতে, ১২০ মিনিট করে খেললেও আর্জেন্টিনাকে কিন্তু ড্রেইনড আউট লাগছে না। অর্থাৎ আর্জেন্টিনা পুরো ম্যাচে একটু প্রিজার্ভই খেলছে। দেখা যাচ্ছে যে শেষ মুহূর্তে এসে যে পুশটা করছে, তখনকার আর্জেন্টিনার খেলার গতি আর শুরুর ফার্স্ট হাফ, সেকেন্ড হাফের ইনিশিয়াল ফেজের যে খেলা, স্বাভাবিক খেলার গতি এটা একদম মেলে না।

বেঞ্চ থেকে যারা ফ্রেশ লেগ নিয়ে আসছে, তারা তো গতি দেয়ই। যেমন আল্মাদা এসে সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে গতি দিয়ে দিয়েছে। বাকিরা তখন ওই গতির সঙ্গে গতি ধরে ফেলে এবং আর্জেন্টিনা সেটা করতে পারছে সে যে ভাবেই হোক। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এই স্টাইল ফ্যানদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। যদি মনে থাকে, কাতারেও কিন্তু আর্জেন্টিনা ডমিনেট করেনি। মানে তাদের ভেতরেরকার প্রবলেম ছিল ম্যাচ বাই ম্যাচ, তারা প্রবলেম সলভ করে করে গিয়ে ফাইনালে গিয়ে সবাইকে চমকে ডি মারিয়াকে জাস্ট লেফট উইংয়ে দিয়ে দিয়েছে।

তো আর্জেন্টিনার কিন্তু ট্যাকটিক্যাল সারপ্রাইজ দেওয়ার মতো স্কোয়াডে গভীরতা আছে। নিকো পাজ, বার্কো, সিমিওনে অপশন বদলে, জায়গা অদল-বদল করে খেলার মতো ফুটবলার থাকায় ঠাঁসা সুচির মধ্যেও আর্জেন্টিনা ফ্রেশ আছে। আবার সবচেয়ে বড় মানে আর্জেন্টিনা ফ্যানদের ফ্যানদের জন্য সুখবরের ব্যাপার লিওনেল মেসি বাদেও আর্জেন্টিনার গোল স্কোরার বের হচ্ছে। কখনো ডিফেন্ডাররা গোল করছে, কখনো পেছন থেকে আসা মিডফিল্ডাররা গোল করছে এবং প্রত্যেকটা ম্যাচে আর্জেন্টিনার একটা না একটা সেট পিস গোল থাকছে।

প্রতিপক্ষ বাকি আছে দু’টা সম্ভাব্য— ইংল্যান্ড আর স্পেন অথবা ফ্রান্স। স্পেন না ফ্রান্স, এটা কিন্তু আর্জেন্টিনা আগেই নিশ্চিত হয়ে যাবে সেমিফাইনালে নামার আগেই। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনা হয়ত এই রিজার্ভ সিস্টেমটা ভাঙবে না। ম্যাচের কিছুটা সময় সেন্ট্রালি ইংল্যান্ডকে বিপদে ফেলার চেষ্টা করে যাবে।

এবার দ্বিতীয় নম্বর ব্যাপারটা হল, মনে হতেই পারে যে আর্জেন্টিনা এখনো তাদের আসল কেমিস্ট্রিটা খুঁজে পায়নি, টিম কেমিস্ট্রিটা খুঁজছে স্কালোনির দল। বন্ডিংয়ের জোরে, ভ্রাতৃত্ব আর একতার জোরে এভাবে খেলছে। আসলে দিনশেষে টুর্নামেন্ট ফুটবলে ম্যাটার করে, গেম ম্যানেজমেন্ট। টুর্নামেন্ট ফুটবলে যেকোনো দিনে আপনাকে ১২০ মিনিট খেলতে হতে পারে। ফলে আপনার ১২০ মিনিটের একটা প্রস্তুতি থাকা জরুরী।

গত ম্যাচের কথাই যদি ভাবেন, তা হলে দেখবেন আর্জেন্টিনা ৬০-৭০ মিনিটে যখন ১০ জনের সুইজারল্যান্ডকে পেয়েছিল, তখনও খেলার স্পিড বাড়ায়নি। চাইলেই বাড়াতে পারতো। তারা তখনও খেলাটাকে স্লো করে সুইজারল্যান্ডকে মেপে নেওয়ার কাজটা করেছে। কোথায় আঘাত করা যেতে পারে। সেটা দেখেছে। এক্সট্রা টাইমের সেকেন্ড হাফ থেকে প্রেসার শুরু করছে। বাট যখনও ক্যালকুলেটিভ মনে হচ্ছিল না তখনই লাস্ট ফায়ার পাওয়ারটা যোগ করে দিছে। এই যে লোপেজ, ম্যানুয়েল লোপেজকে স্ট্রাইকারে নিয়ে এসেছে। এখন ডাবল স্ট্রাইকার লাউতারো আর লোপেজ। কিন্তু পিছনে থাকা আলভারেজ গোলটা করে গেলেন।

আর্জেন্টিনা প্রতিপক্ষকে দেখে নিয়ে আক্রমণে আসে। যত খারাপ দিনই আসুক না কেন, যত খারাপ সময় হোক না কেন, এরা মানসিকভাবে কখনোই পড়ে না। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে উইং ব্যবহার করতে পারে আর্জেন্টিনা। মিডফিল্ডে আরেকটু ভাল কন্ট্রোলের জন্য লো সেলসো অথবা ভ্যালেন্টিন বার্কোকে শুরু থেকে নামাতে পারেন স্কালোনি। অথবা নিকো পাজ খেলতে পারেন। তবে মেসিকে একেবারে উইংয়ে ঠেলে দিলে এই বয়সে তিনি কতটা ওয়ার্ক লোড নিতে পারবেন সেটা প্রশ্ন। রবে এমন হলে, বুকায়ও সাকাকে আটকে রাখা যাবে।

আর্জেন্টিনা এক সাইডে স্ট্রেস করে মাঝখানে গ্যাপ বানানোর চেষ্টা চালাবে। ওই গ্যাপ দিয়ে আলভারেজ ঢুকতে পারেন। আসলে স্কালোনি বিশ্বকাপ জেতা ম্যানেজার।

আর্জেন্টিনার গেম ম্যানেজমেন্টটা এখনও অবধি সেরা জায়গায় আছে। আর এই জিনিসটাই আর্জেন্টিনাকে ফাইনালিস্ট হিসেবে এগিয়ে রেখেছে। আর্জেন্টিনা এখন পর্যন্ত কখনোই সেমিফাইনাল হারেনি। আর্জেন্টিনাই মোটামুটি ইংল্যান্ডকে যেকোনো মুহূর্তে, আঘাত করে বসতে পারে।

অন্যান্য প্রতিবেদন.