চীনের প্রথম সম্রাট ছিলেন কিন শি হুয়াংদি। প্রথমে, তিনি তেরো বছর বয়সে কিন (চীন) রাজ্যের রাজা হন। পরবর্তীতে তিনি সমস্ত প্রতিদ্বন্দ্বী চীনা রাজ্যের শাসকদের পরাজিত করে চীনকে একত্রিত করেন এবং নিজেকে “কিন রাজবংশের প্রথম সম্রাট” ( কিন শি হুয়াংদি) হিসেবে ঘোষণা করেন। সিংহাসনে আরোহণের সাথে সাথেই তিনি তাঁর বিশাল সমাধির নির্মাণ কাজও শুরু করান। আসলে তিনি তাঁর মৃত্যুকেও সুরক্ষিত করতে চেয়েছিলেন। যেন কোনওভাবেই তাঁর নিথর দেহ আক্রমণের মুখে না পড়ে। তাই নিজের সমাধি সুরক্ষিত করতে মাটির নিচেই বানিয়ে ফেলেছিলেন সৈন্য সমেত ব্যাটেল ফিল্ড। এটি শেষ হতে ৩৮ বছর সময় লেগেছিল। এমনকি কথিত আছে যে শেষ ১৩ বছর ধরে ৭০০,০০০ কয়েদি শ্রম দিয়েছিল। এই বিশাল সংখ্যাটি নিজেই সম্রাটের প্রচণ্ড ক্ষমতার পরিচায়ক, এবং এই কাজে তাদের বিস্ময়কর শ্রমের সুস্পষ্ট ছাপ রয়েছে। মূল সমাধির চারপাশে তিনটি প্রধান ভল্টে বা পিটে প্রচুর মাটির তৈরি সৈন্যবাহিনীকে রাখা হয়েছ। এখানে প্রায় ৮,০০০ থেকে ৯,০০০-এরও বেশি সৈন্য, ঘোড়া ও যুদ্ধরথের মূর্তি রয়েছে যা প্রায় সবই টেরাকোটার মাটির মূর্তি। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হল, প্রতিটি সৈনিকের শারীরিক গঠন, পোশাক, চুলের ধরন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে—মুখাবয়ব সম্পূর্ণ ভিন্ন! কোনও সৈন্যের সঙ্গে অন্য কোনও সৈন্যের মুখের মিল নেই। গবেষকদের মতে, এগুলো তৈরির সময় তৎকালীন জীবিত প্রকৃত সৈন্যদের মডেল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় সম্রাট হিসেবে হুয়াংদি ছিলেন দমনমূলক। তিনি কনফুসীয় গ্রন্থ নিষিদ্ধ ও পুড়িয়ে ফেলতেন এবং যে সকল পণ্ডিতরা সেগুলো লিখতেন ও গবেষণা করতেন সে সময় তিনি তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দিতেন। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, তাঁকে হত্যা করার অন্তত দুটি প্রচেষ্টা হয়েছিল। সম্রাট কিন শি হুয়াংদির সমাধি যা একাধিক মাটির তৈরি টেরাকোটা সৈন্য দিয়ে সুরক্ষিত তাকেই বর্তমানে চীনের টেরাকোটা আর্মি বলে ।

সমাধিটির নির্মাণকাজ শেষ হলে, সেটিকে ঘাস ও গাছপালা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল, যাতে এটিকে ভূদৃশ্যের একটি স্বাভাবিক অংশ বলে মনে হয়। আজ বাইরে থেকে দেখলে কিন শি হুয়াংদির সমাধিস্থলটিকে একটি পাহাড়ের মতো লাগে। এ থেকেই বোঝা যায়, কীভাবে এই বিশাল সমাধিটি ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল। পরবর্তীতে কালে চীনের উক্ত গ্রামের লোকেরা স্থানীয় প্রয়োজনে কুয়ো খনন করতে গিয়ে ঘটনাক্রমে এটি আবিষ্কার করে। এটি তার চারপাশের পরিবেশের সাথে এমনভাবে মিশে গিয়েছিল যে, দেখতে অনেকটা পর্বতমালার পাদদেশের মতো লাগত।
সম্রাট কিন শি হুয়াংদির সমাধিসৌধ চত্বরের নকশা থেকে দেখা যায়, মূল সমাধিটি আরও বহু সমাধি দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল। এর মধ্যে ছিল পোড়ামাটির তৈরি যোদ্ধাদের তিনটি গর্ত। ভাস্কর্যগুলিতে চোখ রাখলে দেখা যায় এযেন বাস্তবেই এক ব্যাটেল ফিল্ড। সম্রাটের সমস্ত সৈন্য সামন্ত কড়া পাহারা দিচ্ছে সমাধি কে । মাটির তৈরি টেরাকোটার মূর্তি গুলোর প্রথমেই রয়েছে তীর ধনুক বিশিষ্ট সৈন্য। পিছনে বল্লভধারী সৈন্যরা। তারপর যথাক্রমে রথের উপর বসে থাকা সৈন্য। আলাদা একটি পিটে রয়েছে সৈন্য বাহিনীর পদস্থ কর্তাদের মূর্তি এমন বহু আশ্চর্যজনক ভাস্কর্য। এছাড়াও সেখানে ছিল বিচিত্র প্রাণীর দেহাবশেষে ভরা একটি গর্ত এবং সমাধিস্থ করার সময় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অনুচরদের কবর।

এখন পর্যন্ত ১, ২ ও ৩ নম্বর গর্ত থেকে পোড়ামাটির প্রায় ৭,০০০ মূর্তি এবং ১০০টি কাঠের রথ আবিষ্কৃত হয়েছে। এখনও অবধি যতটা আবিষ্কৃত হয়েছে তাতে যখন সেনাবাহিনীর ৬,০০০ সৈন্যের বিশাল সারিগুলোর দিকে তাকাই, তখন আমরা এমন এক দৃশ্য দেখতে পাই যা দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে কেউ দেখেনি। সমাধিগুলো বন্ধ করে দেওয়ার সময় থেকে ১৯৭০-এর দশকের খননকার্য পর্যন্ত। মূর্তিগুলোকে মাটির বাঁধানো নলে বসানো হয়েছিল, কাঠের তক্তা দিয়ে মজবুত করা হয়েছিল এবং তারপর পুঁতে ফেলা হয়েছিল।
একথা অবশ্য স্বীকার্য যে, পরবর্তীতে চীনের রাজবংশগুলোর পক্ষপাতদুষ্ট কনফুসীয় ঐতিহাসিকরা কিন শি হুয়াংদিকে সন্দেহবাতিকগ্রস্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যদিও তাঁর জীবনের উপর নথিভুক্ত দুটি প্রচেষ্টা থেকে বোঝা যায় যে কিছুটা ভয় অমূলক ছিল না। চিরকাল নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার আকাঙ্ক্ষায়, কিন শি হুয়াংদি একটি আদর্শ সেনাবাহিনী গঠন করিয়েছিলেন এবং সেটিকে তাঁর সমাধির পূর্ব দিকে স্থাপন করেছিলেন—যা ছিল তাঁর জীবদ্দশার শত্রুদের দিক।

আসলে এই বিশাল প্রকল্পটিকে কিন শি হুয়াংদির অন্যান্য প্রচেষ্টার প্রেক্ষাপটে দেখা উচিত, যার মধ্যে রয়েছে চীনের মহাপ্রাচীরের নির্মাণ শুরু করা, যা জীবিতদের জগতে উত্তরের আক্রমণকারীদের ঠেকানোর জন্য তৈরি করা হয়েছিল। প্রথম সম্রাট সামরিক শক্তি, তথ্য ও মতামতের ওপর সমীবদ্ধতা এবং বহিরাগত শক্তির বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরক্ষার মাধ্যমে চীনের ওপর একীভূত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এটি সম্পন্ন করার পর, তিনি এটা নিশ্চিত করার জন্য কাজ করেছিলেন যে, তাঁর মৃত্যুর পরেও যেন তিনি এই পার্থিব ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেন যার ফসল আজকের চীনের ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজে তালিকার অন্যতম টেরাকোটা আর্মি।
সম্রাটের এই বিশাল কীর্তি আবিষ্কৃত হলেও আজও কিন শি হুয়াংদির সমাধি উন্মোচনের সাহস চীনের গবেষকরা পাননি। কারন চীনারা বিশ্বাস করেন সম্রাটের সমাধি যেমন টেরাকোটার বিশাল সৈন্যরা পাহারা দিচ্ছে ঠিক তেমনি বিভিন্ন বিষাক্ত তরঙ্গ দিয়ে সুরক্ষিত সম্রাটের সমাধি যা খুললে যা কিছু ঘটতে পারে।

