বিধানসভায় পা রেখেছেন ৯০ জনের বেশি স্বয়ংসেবক। মন্ত্রীসভাতেও তারা আছেন। পশ্চিমবঙ্গে আরএসএস-এর এমন সাফল্যের নজির নেই। গত দেড় দশকে তাদের শাখা, সংগঠন বেড়েছে। এবার তারা বড় সংখ্যায় হাজির বিধানসভায়। তারা রাজ্যের বিজেপি সরকারের থিঙ্কট্যাঙ্ক, চালিকা শক্তি হবে। যা এর আগে এই রাজ্যে কখনও হয়নি।
ইতিমধ্যেই সরকার পক্ষ থেকে ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বণি উঠেছে বিধানসভায়। গত ১৩মে বিধানসভায় বিধায়কদের শপথ অনুষ্ঠানের প্রথম দিন ছিল। সেদিনই বিধানসভা শুনেছে ‘জয় শ্রীরাম’— বিজেপি’র বিধায়ক, মন্ত্রীদের মুখে। এর আগে, গত দশ বছর ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বণি উঠেছে বিধানসভায়, তবে বিরোধী পক্ষ থেকে। ১৯২৫-এ আরএসএস তৈরি হয়েছে নাগপুরে। অবিভক্ত বাংলায় আরএসএস’র প্রথম শাখা তৈরি হয় ১৯৩৯-এ। কলকাতার সরকার লেনে হিন্দু মহাসভার কার্যালয় ছিল। সেখানেই সঙ্ঘের শাখা তৈরি হয়। ১৯৪৬-’৪৭-এ কলকাতায় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের কর্মী ছিলেন ১০০জন। অবিভক্ত সেই বাংলায় স্বয়ংসেবক ছিলেন অন্তত ১ লক্ষ। দাবি করেছিল তৎকালীন পুলিশ রিপোর্ট। দেশভাগ পূর্ববর্তী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের উপর গোয়েন্দা শাখার স্মারক, জিবি এসবি পিএম সিরিজ, ফাইল নং-৮২৯/৪৫ এবং ৮২২/৪৭১-এ তার উল্লেখ আছে। সেই সময়ে সবচেয়ে শক্তিশালী ‘হিন্দু স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন’ ছিল বৌবাজারের মুচিপাড়ায়। সেখানে ৩০০-৫০০জন স্বেচ্ছাসেবক ছিল। পার্ক সার্কাসের এমন দলটির নাম ছিল ‘আর্য বীর দল।’ সদস্য ছিল ১৬জন।
এমন আরও সংগঠন ছিল। ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াই এদের আদর্শ নয়। এদের লক্ষ্য ছিল ‘হিন্দু স্বার্থ রক্ষা।’ এদের সহায়তা করত কিছু ব্যবসায়ী। যেমন যুগল কিশোর বিড়লা। তবে বাংলা জুড়ে আরএসএস টাকা পেত মূলত জমিদারদের। যেমন সুসঙ্গ রাজ পরিবারের বাবু পরিমল সিংহ ছিলেন আরএসএস’র প্রবল সমর্থক। সুসঙ্গ মানে ময়মনসিংহ। তাছাড়াও রাজশাহী, পাবনা, বর্ধমান, মেদিনীপুরের মতো জেলায় সঙ্ঘের অস্তিত্ব গড়ে উঠেছিল গরিব কৃষকদের উপর অত্যাচারে ফেঁপে ওঠা জমিদারদের সহায়তায়।
কেন? ১৯৩৬-৩৭ থেকে এই জমিদার-ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ কংগ্রেসের পাশ থেকে সরে হিন্দু মহাসভা, আরএসএস’র পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। কারণ তাদের মনে হয়েছিল, হিন্দু স্বার্থ বিঘ্নিত হচ্ছে। কংগ্রেস উচ্চবর্ণের হিন্দুদের স্বার্থ রক্ষা করছে না। আর এই ক্ষেত্রে ‘হিন্দু স্বার্থ’ নিয়ে উদ্বিগ্ন বাবুদের প্রধান অভিযোগ ছিল ‘বসু ভ্রাতৃদ্বয়’-এর বিরুদ্ধে। একজন শরৎ বসু। অন্যজন সুভাষচন্দ্র বসু। এই দুই ভাইয়ের ‘অপরাধ’? তাঁরা ‘ম্লেচ্ছ, কমিউনিস্টদের’ গুরুত্ব দিচ্ছিলেন। একটি বিবরণ দিই?
১৯৩৭-এ কলকাতার বঙ্গীয় ব্রাহ্মণ সভার স্মারকলিপি জানাচ্ছে,‘‘কংগ্রেস তার পুরানো ধ্যানধারণা থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং তার বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন ঘটেছে। এর রাজনৈতিক নেতারা ও তাদের অনুসারীদের অনেকেই এখন কম শিক্ষিত ও তাদের জানাশোনা কম। তারা আমদানি করা আইরিশ ইতিহাস, ইতালি ও অস্ট্রিয়ার বিপ্লব, ফরাসি প্রজাতন্ত্রবাদ ও সোভিয়েত শাসন নিয়ে পড়াশোনা করে। পশ্চিমা সভ্যতার পরীক্ষা-নিরীক্ষা তারা ভারতের ওপর প্রয়োগের চেষ্টায় আগ্রহী …এটা করতে গিয়ে তারা ব্রাহ্মণ্যবাদী পুরোহিততন্ত্র ও জমিদারির মতো ভূস্বামীদের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলি বাতিল করতে চায়…সামাজিক সংস্কারের নামে হিন্দুত্ববাদের মূলে আঘাত করছে।’’
বাংলায় ‘হিন্দুত্ববাদ’ সেই সময়ে স্পষ্ট চোখে পড়ল। সুভাষচন্দ্র বসু পরিচালিত কংগ্রেস এবং কমিউনিস্ট, বামপন্থীরা অভিযুক্ত হলো। এবং হাজির হলেন বিনায়ক দামোদর সাভারকার— মমতা ব্যানার্জির ‘অটলজীর মতো অটল’ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির হাত ধরে। ১৯৩৯-র ২৭ ডিসেম্বর। ওয়েলিংটন স্কোয়ারে ফাগোয়া ঝান্ডা তুললেন হিন্দু মহাসভার নেতা সাভারকার। ততদিনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে তার ৪টি মুচলেকা দেওয়া হয়ে গেছে। যখন দেশের স্বার্থে বাংলার সবচেয়ে বেশি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কথা, তখন এল ‘হিন্দুত্ববাদ’। তখন এলেন সাভারকার। এলো ‘ফাগোয়া ঝান্ডা’, যা সাভারকার বর্ণিত ভারতের জাতীয় পতাকা।
গান্ধীর প্রধান হত্যাকারী নাথুরাম গডসে। গডসের নেতা বিনায়ক দামোদর সাভারকার গান্ধীহত্যার ৭নং অভিযুক্ত ছিলেন। মোট অভিযুক্ত ছিলেন ১২ জন। বিচারের সময় ৯জন ধরা পড়েন। তাদের একজন দীগম্বর ব্যাজ রাজসাক্ষী হন। ব্যাজ একইসঙ্গে হিন্দুত্ববাদী এবং বেআইনি অস্ত্রের কারবারী ছিলেন। গোয়ালিয়র নিবাসী ৩জন বিচারের পরে, সাজা হবে না বুঝে আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। বিনায়ক দামোদর সাভারকার প্রমাণের অভাবে ছাড়া পান— আইনের চোখে বেনিফিট অব ডাউট-এর বলে। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি উত্তরসূরি ছিলেন সাভারকারের, হিন্দু মহাসভায়। নাথুরামকে তিনি জানতেন, চিনতেন। ১৯৪৭-র ৯ আগস্ট দিল্লিতে হিন্দু মহাসভার কার্যকরী কমিটির সভা হয়। সেখানে সভাপতি ছিলেন সাভারকার। সাভারকার, গডসে, নারায়ণ আপ্তে একসঙ্গে বিমানে পুনা থেকে দিল্লি গেছিলেন। দিল্লির সভায় শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি সহ অন্যান্যদের সঙ্গেই হাজির ছিলেন নাথুরাম গডসে, নারায়ণ আপ্তে। দীর্ঘক্ষণ তাদের হিন্দু মহাসভার ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা, বিতণ্ডা চলে। এ’ কথা নাথুরাম তার জবানবন্দিতে জানিয়েছেন।
১৯১১-র ৪ জুলাই সাভারকারকে আন্দামানের সেলুলার জেলে পাঠানো হয়। আরও অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামীই সেখানে বন্দি জীবন কাটিয়েছেন। সেখানে ১৯১১ এবং ১৯১৩ — তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী প্রশাসনের কাছে দুটি চিঠি লেখেন। পরে ১৯২৪, ১৯২৫-এও তিনি আর দুটি চিঠি দেন। এই চারটিই ক্ষমা প্রার্থনা এবং মুচলেকা। ১৯১৩-র ১৪ নভেম্বরের চিঠিটির অংশ দেখা যাক। ব্রিটিশ সরকারকে লেখা দীর্ঘ চিঠিটির শেষ অংশে সাভারকার লিখছেন,‘‘…পরিশেষে ক্ষমা ভিক্ষার আবেদনটি অত্যন্ত সহৃদয়তার সঙ্গে পাঠ করার সময় মহামান্য হুজুরকে আমি একথা স্মরণ করিয়ে দিতে পারি কী যে, অনুমোদনের জন্য এটিকে ভারত সরকারের কাছে পাঠাতে হবে?…কাজেই সরকার যদি তাঁদের বহুমুখী দয়ার দানে আমাকে একটু মুক্ত করে দেন তবে আমি আর কিছু পারি বা না পারি চিরদিন সাংবিধানিক প্রগতি এবং ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আনুগত্যের অবিচলিত প্রচারক হয়ে থাকবো।…সরকার আমাকে যত কাজ করতে বলবে সেই মতোই প্রায় সব করতে আমি প্রস্তুত।…অন্যভাবে যা পাওয়া যেতে পারে সে তুলনায় আমাকে জেলে আটকে রাখলে কিছুই পাওয়া যাবে না। শক্তিশালীর পক্ষেই একমাত্র ক্ষমাশীল হওয়া সম্ভব। কাজেই অনুতপ্ত সন্তান পিতৃতুল্য সরকারের দরজায় ছাড়া আর কোথায় ফিরে যাবে?’’
সাভারকারের শিষ্য, জনসঙ্ঘের নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকেই আদর্শ বর্ণনা করে ২০২৬-এ সরকার গঠন করেছে বিজেপি। তাদের বিধায়কদের ৯০জনের বেশি সেই আরএসএস’র কর্মী। আরএসএস-এর আদর্শ কী? সঙ্ঘের দ্বিতীয় সরসঙ্ঘচালক গোলওয়ালকার তাঁর ‘বাঞ্চ অব থট’-এর দ্বিতীয় অংশে ব্যাখ্যা করেছেন ‘দ্য নেশন অ্যান্ড ইটস প্রবলেম।’ সেই ব্যাখ্যার পঞ্চম অংশ ‘টেরিটোরিয়াল ন্যাশনালিজম।’ সেখানে, ১৪২ পাতায় গোলওয়ালকার বলছেন,‘‘যে অঞ্চলভিত্তিক জাতীয়তাবাদ এবং সাধারণ বিপদের তত্ত্বে আজ আমাদের রাষ্ট্রের যে ধারণা গড়ে উঠেছে, তাতে আমাদের প্রকৃত হিন্দু জাতীয়তাবাদের যথার্থ এবং উৎসাহব্যঞ্জক বিষয়বস্তু থেকে আমাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। আর স্বাধীনতা আন্দোলন প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে পর্যবসিত হচ্ছে। দেশাত্মবোধ এবং জাতীয়তাবোধের সঙ্গে ব্রিটিশ-বিরোধিতা সমার্থক হয়ে পড়ছে।’’ অর্থাৎ ‘ব্রিটিশ বিরোধিতা’ প্রকৃত দেশাত্মবোধ নয়। তাদের শত্রু? গোলওয়ালকারের ‘ইন্টারনাল থ্রেট’ প্রবন্ধে সেই শত্রুদের চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমত, ‘দ্য মুসলিমস।’ দ্বিতীয়ত, ‘দ্য ক্রিশ্চিয়ানস।’ তৃতীয়ত, ‘দ্য কমিউনিস্টস।’
মমতা ব্যানার্জি এই শক্তিকে ‘প্রকৃত দেশপ্রেমিক’ বলে ঘোষণা করেছিলেন ২০০৫-এর সেপ্টেম্বরে, দিল্লিতে, আরএসএস-এরই একটি বইপ্রকাশ অনুষ্ঠানে। গত ১৫ বছরে মমতা ব্যানার্জির শাসনে রাজ্যের প্রতিটি জেলায় বেড়েছে আরএসএস। এবার বিধানসভায় পৌঁছেছে আরএসএস।














