Shopping cart

  • Home
  • কলাম
  • রাজনীতি
  • দেওয়াল লিখন থেকে মোবাইল স্ক্রিন: পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিবর্তন
ফিচার

দেওয়াল লিখন থেকে মোবাইল স্ক্রিন: পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিবর্তন

2085

পশ্চিমবঙ্গের “পলিটিক্যাল সোসাইটি” সংক্রান্ত আলোচনায় এই সেদিনও বারবার ঘুরে ফিরে আসত যে জিনিসটি, তার নাম “সংগঠন”। বস্তুত, বঙ্গের দলীয় রাজনৈতিক সমাজ, তার সামাজিক-রাজনৈতিক আধিপত্যের ধরন, “সংগঠন” ব্যতিরেকে বিশ্লেষণ করা কঠিনই ছিল না, ছিল অসম্ভবও। সিপিএম জমানার “এলসি” দাপট, কে না জানে। আবার সিপিএমের পূর্বসূরি কংগ্রেস বা উত্তরসূরি তৃণমূল জমানা, তাদেরও সামাজিক-রাজনৈতিক আধিপত্যের চাবিকাঠিটি ছিল ওই একই, “সংগঠন”। সংগঠনের এক্স ফ্যাক্টর ছাড়া পশ্চিমবঙ্গে সরকারে আসা বা ভোটে জেতা তো যায়ই না, বিরোধী হয়ে ওঠাও যায় না—অন্তত এমনটাই জানতাম আমরা, আশৈশব লালিত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। সপ্তম বামফ্রন্টের বিদায় এবং তৃণমূলের ক্ষমতা দখলের মধ্যবর্তী সময়টিতে বড় হয়ে ওঠা লেট মিলেনিয়াল আমরা, কৈশোর ও যৌবনের প্রান্তসীমাটিতে সাক্ষী থেকেছি শাসক সিপিএমের সংগঠন বনাম বিরোধী তৃণমূল জোটের সংগঠনের যুযুধানের। সংঘাতে দুই পক্ষেই জেতা এবং হারার প্রশ্নে নির্ধারক ছিল সংগঠন। সাংগঠনিক দক্ষতাকেই রাজনৈতিক কর্মীর সর্বোচ্চ গুণ হিসেবে দেখার রেওয়াজটিও বিশেষ করে বাঙালিরই রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি দেখে বড় হয়ে ওঠা “রাজনীতি সচেতন” আমরা খুব স্বাভাবিকভাবেই তাই “সংগঠন” বিহীন সফল রাজনীতির অস্তিত্বে আস্থাশীল ছিলাম না বা তাকে সম্ভবপর বলেও মনে করতাম না। এই কারণেই, ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল ছিল আমাদের প্রজন্মের অনেক রাজনৈতিক ভাষ্যকারের কাছেই বেশ বিস্ময়কর। বাংলায় এই প্রথম আমরা দেখলাম, সংগঠন ছাড়াই শুধু যে ভোটে জেতা যায় তাই নয়, প্রধান বিরোধীও হয়ে ওঠা যায়। মনে আছে, আমি যে বুথের ভোটার সেই বুথ কেন্দ্রে বিজেপির ঝান্ডা টাঙানোর লোক তো দূরস্থান, একটি পোলিং এজেন্ট বসানোরও লোক ছিল না। অথচ, ভোটের ফলাফলের দিন দেখা গেল বেশ ভালো পরিমাণ ভোট পেয়ে আমার বুথে বিজেপি দ্বিতীয় হয়েছে। আর তুলনামূলক এলাকাগত ভালো সংগঠন থাকা সত্ত্বেও সিপিএম হয়েছে তৃতীয়। হ্যাঁ, আমার বুথ কোনো ব্যতিক্রম নয়। বাংলার অনেক বুথেই এই চিত্র দেখা গিয়েছিল ২০১৯ সালে। সাংগঠনিক শক্তির নিরিখে প্রান্তিক শক্তি বিজেপি রাতারাতি হয়ে উঠেছিল ধারে ও ভারে প্রধান বিরোধী দল।

আজ ফিরে দেখলে বুঝতে পারি, বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতির পর্যালোচনার ক্ষেত্রে এই পর্যায়টি ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের চেনা বঙ্গীয় রাজনীতি ছকটির ভিতর থেকেই এই যে আরেকটি ভিন্নতর ছকে উত্তরণ, তার শীর্ষবিন্দু ২০১৯ হলেও, শুরুটা কিন্তু হয়েছিল আরও চার-পাঁচ বছর আগে। ২০১৪ সালে বিজেপি কেন্দ্র সরকারে আসার পর থেকেই সমাজমাধ্যমে বিপুল বিনিয়োগ করে তারা। আইটি সেল নামক যে রাজনৈতিক সত্তাটি আজ দোর্দণ্ড প্রতাপশালী, তার শুরুটা ওই সময়েই। সমাজমাধ্যমকে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার ক্ষেত্রে পরিণত করার বিষয়ে বিজেপিই অগ্রদূত। এর সঙ্গে অচিরেই যুক্ত হয় জিওর সস্তা ইন্টারনেট। বিজেপির আইটি সেলের রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা এবং জিওর সস্তা ইন্টারনেট, এ দুটোর কোনো আন্তঃসম্পর্ক ছিল কি না তা আগামীতে হয়ত কোনো উৎসাহী গবেষক খুঁজে দেখবেন। আপাতভাবে দেখা গিয়েছিল জিওর সস্তা ইন্টারনেট দেশের সুবৃহৎ জনসংখ্যাকে করেছিল তীব্র সমাজমাধ্যমমুখী, অ্যাডিকটেড। আর এই সমাজমাধ্যমগুলি ছিল বিজেপি আইটি সেলের অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রোপাগান্ডার ক্ষেত্র। অপ্রতিদ্বন্দ্বী, কারণ ওই সময়টিতে বিজেপি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আজকের মতো কোনো পাল্টা সংগঠিত সমাজমাধ্যম বাহিনী ছিল না। ফলত ১৪/১৫-১৮-র মধ্যে বিজেপির আইটি সেল হয়ে ওঠে এক বিকল্প ঘরানার অপ্রতিরোধ্য সংগঠন। যা আসলে ভার্চুয়াল কিন্তু অমনিপ্রেজেন্ট। আমাদের চেনা রক্ত-মাংসের রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে এই নতুন ধারার সংগঠনের বিশেষ মিল নেই। এতে আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণের প্রণালীটিও পুরনো সংগঠনের মতো দৃশ্যমান পেশিশক্তি নির্ভর নয়। বরং টার্গেটেড অডিয়েন্সের নিরন্তর ব্রেন স্টর্মিংয়েরই এতে প্রাধান্য।

সমাজমাধ্যম কেন্দ্রিক এই ভার্চুয়াল ব্রেন স্টর্মিংয়ের বায়বীয় সংস্কৃতি কীভাবে বাংলার এলাকাগত দৃশ্যমান সংগঠন নির্ভর রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বদলে দিচ্ছিল, তার খানিক আভাস মেলে ২০১৬-র নির্বাচনে। বিজেপি ১০% ভোট পায়, দৃশ্যত কোনো সাংগঠনিক শক্তির উপস্থিতি ছাড়াই। আরএসএসের সংগঠনের কথা অবশ্যই বলা যেতে পারে কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে, ২০১৪ থেকে ১৬ পর্বে আরএসএস বা তার ছায়া সংগঠনগুলিও প্রাথমিক টার্গেটেড অডিয়েন্স রিচ করতে ব্যবহার করত সমাজমাধ্যমগুলোকেই।

২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচন ছিল বঙ্গের এই বদলে যাওয়া রাজনৈতিক সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় উদাহরণ। দেখা গেল বাড়ি বাড়ি ঘুরে জনসংযোগ, লিফলেট বিলি, দেওয়াল লিখন ইত্যাদি চেনা সাংগঠনিক কাজ বাদ দিয়েও ভোটে জেতা যায়, শুধুমাত্র টার্গেটেড অডিয়েন্স ঠিক করে, ২৪×৭ তাদের সমাজমাধ্যমের স্ক্রিনের দখল নিয়েই। বাড়ির দেওয়াল দখলের চেয়ে হাতের মোবাইলের স্ক্রিন দখলের গুরুত্ব যে কোনো অংশে কম নয় বরং বেশ কিছু ক্ষেত্রে বেশিই, ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচন তা হাতেকলমে দেখিয়েছিল। দেখিয়েছিল, সাংগঠনিক দুর্বলতা হেতু জনসভায় ভিড় না হলেও ভোটের বাক্স ঠিকই ভরিয়ে ফেলা যায়। আর তাতে মোটেই আদি ঘরানার সংগঠন লাগে না। ২০১৯-এর এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি এরপরও বেশ কয়েকবার দেখেছি আমরা। আর ২০২৬-এ এসে, এখন এ কথা তো সর্বদল স্বীকৃত যে আদি ধারার সংগঠনের পাশাপাশি নতুন ধারার “না সংগঠন”-ও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

এখন, প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, “সংগঠন” থেকে ভার্চুয়াল “না সংগঠন”-এ এই যে উত্তরণ, এর ফলে কি “সংগঠন” নামক বস্তুটির মহিমা গোটাটাই খারিজ বা রিপ্লেস হয়ে গিয়েছে? এর উত্তর, এখন অবধি, “না”। বঙ্গের রাজনীতিতে আদি ধারার সংগঠন এখনও এক্স ফ্যাক্টর। অন্তত, ভোটের দিনে, গণনার দিনে। “না সংগঠন”-এর ভার্চুয়ালত্ব এখন অবধি রক্ত-মাংসের সংগঠনকে এই জায়গায় অতিক্রম করতে পারেনি। তবে হ্যাঁ, প্রবল সাংগঠনিক উপস্থিতিই যে আধিপত্য, নিয়ন্ত্রণ এবং ভোটে জেতার একমাত্র পন্থা, বিগত দশ-বারো বছরে এই ধারণার কার্যকারিতা বিশেষভাবে কমেছে। সংগঠন এখনও গুরুত্বপূর্ণ ঠিকই, কিন্তু তা আর একক গুরুত্বপূর্ণ এক্স ফ্যাক্টর নয়।

সম্পর্কিত খবর