Shopping cart

  • Home
  • ফিচার
  • আমার হান্ড্রেড অ্যান্ড সিক্স পয়েন্ট টু এফ এম
ফিচার

আমার হান্ড্রেড অ্যান্ড সিক্স পয়েন্ট টু এফ এম

3

বারান্দায় রোদ্দুর জেবিএল-এ বাজিয়ে হলুদ পাঞ্জাবি আর শাড়িতে সরস্বতী পুজোর রাতগুলোতে বুকে আমরা ধাক্কা খেতাম। মাঘের শীত বাঘের গায়ে লাগলেও আমাদের তখন লাগেনি। সেসব সরস্বতী পুজোর সকালে পাশের বাড়ির গোলাপ চুরি করে প্রথম প্রেমকে দিয়েছি, আর বন্ধুরা দেখেই প্যাক দিয়েছে— ‘তোমার দেখা নাই’!

সেই ভূমির যাত্রা শুরু।

ফটিক তখন একখানা বাঁশি লইয়া হাটে গান গাইত, চন্দ্রাণীর তখনও ‘ক্রসউইন্ডস’ হয়নি। তাঁর গলায় লালন এবং ডিলানের মিশে যাওয়া রীতিমতো হইচই ফেলে দিয়েছিল। আজকের মতো পলিটিক্যাল কারেক্টনেস ছিল না। তাই চন্দ্রবিন্দু অবলীলায় গাইতে পারত, ‘আজকালকার মেয়েগুলো সব ট্যাশ’।

পাড়ায় পাড়ায় সরস্বতী পুজো। ক্লাবের নাম ‘আমরা কজন’, ‘পাড়া ইউনাইটেড’। সরস্বতী বানানের ঝক্কি সামলে ছেলের দল খড়-বিচুলি দিয়ে প্যান্ডেল বেঁধেছে। যা চাঁদা উঠেছিল তার বেশিরভাগটাই খরচ হয়ে গিয়েছে এগরোল, চাউমিন, ভোলা মাছের পকোড়ায়। সেসব দামাল ছেলেদের খড়-বাঁশ-কাদা মাখা মায়ের শাড়ি দিয়ে তৈরি পুজো প্যান্ডেলে অবিরাম বেজে চলেছে ‘তোমার দেখা নাই রে, তোমার দেখা নাই’। কোচিং সেন্টারের খাওয়া এবং দাওয়াত-এ, শীতকালীন অধিবেশনে, কমলালেবুর খোসার গন্ধ মাখা যিশুর জন্মদিনে আমাদের ঘুলঘুলিতে চড়াই বসে ‘যাত্রা’ শুনিয়েছে মাত্র পাঁচ টাকার সিডি ক্যাসেটের ভাড়ায়। আমরা যত বড় হয়েছি, যতবার ফিরে শুনতে চেয়েছি ‘আমার হান্ড্রেড অ্যান্ড সিক্স পয়েন্ট টু এফ এম’-কে, ততবার ফিরে ফিরে এসেছে বাংলা ব্যান্ডের প্রথম মুখস্থ হয়ে যাওয়া গানগুলো।

সদ্য শুনতে শুরু করেছিলাম সুমনের গান! ছেলেটার প্যাডেল কিংবা চাকায় মন না থাকা গানে ছেলেবেলাকে নতুন করে চিনেছিলাম। সে গানের চাঁদিয়াল, মোমবাতি কিংবা বগ্গা ঘুড়ি কেটে যখন আমাদের পেয়ারা গাছটায় পড়েছিল, আমরা মাটির অবজ্ঞাকে বুঝতে শুরু করেছি তখন। জেনেছি ‘সাড়া দাও’ কোনো প্রেমের গান নয়। নচিকেতার ‘তুমি আসবে বলেই’ গানে আসলে এই ‘তুমি’টা এক স্বপ্নের নাম। যতুগৃহ শিখিয়েছিল, ‘অর্জুন সেনদের মাতাল বলতে নেই’।

উদ্বাস্তু ভিটে। টালির চালা, দরমা বেড়া দিয়ে তৈরি বাড়ির দেওয়ালে ঝোলানো কাঠের আমাদের একখানা রেডিও। কেউ একজন চেনা গলায় বলতেন, “আমার হান্ড্রেড অ্যান্ড সিক্স পয়েন্ট টু এফ এম। কলকাতার গান কলকাতার প্রাণ।” সেই প্রাণের টানে প্রাণ মিলিয়ে ছুটে গিয়েছিলাম আমরা। নচিকেতার নীলাঞ্জনার কথা শুনে প্রথম প্রেম এসেছিল, সকালের আধো ঘুমে পরশপাথরকে পেয়েছিলাম ভালোবাসার সমস্ত আর্চিস গ্যালারিতে। অঞ্জনের কালো মেমকে খুঁজেছিলাম রিপন স্ট্রিট দিয়ে বাস পেরোনোর সময়।

আজকের ডিজিটাল রেডিওর জামানাতে এই গানগুলো আমাদের কাছে অনেকটা অধরা মাধুরী। কাঠের রেডিওতে ঘুণ জমেছে আজ, যুগের সাথে তাল মেলাতে না পেরে গোটা রেডিও স্টেশনটাই উঠে গেছে। ইদানিং স্পটিফাই, ইউটিউব মিউজিক— আরও কতশত গানের ডেরা! জীবনের মানচিত্রে নেই কোনো লালফিতে-সাদামোজা। শিলাজিৎকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ওরাই স্বাধীনতার মানে বোঝাচ্ছে, যাঁদের ফুরফুরে দিন কেটে যায়। তবু হারিয়ে ফেলা আমার এফএম-টা বাজছে প্রতিদিন। আমাদের বড় করে তোলার রেডিওটা আজ কোথায় কে জানে!

আমরা সলিল চৌধুরী, গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের মতো মহীরুহকে সামনে থেকে পাইনি, তাই আবার কুড়ি বছর পরে শুনেছিলাম ‘ঘরে ফেরার গান’; তখন ক্যাকটাস শিখিয়েছিল ঘরে ফেরার গান ভুলে গিয়েও ভালো থাকা যায়। কত সব ব্যান্ড তখন!

কালপুরুষ, কায়া, ভূমি, মহীনের ঘোড়াগুলি, চন্দ্রবিন্দু, ঈশান, যতুগৃহ, ফসিলস, নগর ফিলোমেল, ক্যাকটাস, লক্ষ্মীছাড়া, শহর, মরুদ্যান, পৃথিবী, গড়ের মাঠ, মাইলস, পরশপাথর, নগর বাউল। পাড়ায় পাড়ায় তখন ছেলেরা গিটার শিখছে হারমোনিয়াম ছেড়ে। কলেজের ইউনিয়ন রুমে পিট সিগারের ভক্তরা নতুন ব্যান্ড শুরু করছে। গালভরা দাড়িতে, মাথা ঝাঁকানো চুলে জীবনানন্দ ফিরতে শুরু করেছেন বাঙালির জীবনে। কার্তিকের জোছনা ছেড়ে মহীনের ঘোড়াগুলি তাল মিলিয়েছে গড়িয়াহাটের হলদে আলোয়!

কালীপুজোর সন্ধ্যায় সেই প্রথম কিশোর কুমার ফ্লপ। বাঙালির গানের স্টেজ সাজাচ্ছে কতগুলো লম্বা চুলের বিচ্ছু ছেলে। কেউ বলছে ‘ব্যান’, কেউ ‘ব্যান্ড’। যতুগৃহর অর্জুন সেন শুনে, ঈশানের বাংলাদেশ শুনে কেউ আবার বলছে এটাই নাকি জীবনমুখী গান। আজকের রূপঙ্কর সেদিন রূপঙ্কর বাগচী ছিলেন। পুজোর মাইকে তিনি প্রথমবার আমাদের শুনিয়েছিলেন বাড়ির পরিচারিকার সাথে কাগজওয়ালার প্রেমের গপ্পো। আজও প্রতিটা সপ্তমীর বিকেল এলে প্রাঞ্জল বক্সীকে মনে পড়ে আমাদের সবার। নেই সেই ভাঙা সাইকেলটা, তবু আছে আমাদের ছেলেবেলার ভেঙে যাওয়া প্রেমগুলো। ইনস্টাগ্রামের রিল ফিরিয়ে দেয় এক অচেনা কাঞ্চন মল্লিক এবং জুন মালিয়াকে।

চন্দ্রাণী ভূমি ছাড়ার পর ‘জিকো জিকো’ গাইতে গাইতে ফিরেছিল দুটো মেয়ে তাদের শুকনা স্টেশন সংলগ্ন স্কুলবাড়ি থেকে। চা বাগানের নরম আলোয় ক্রসউইন্ডস মিলিয়ে দিয়েছিল কলকাতা-বঙ্গাইগাঁও-শিলিগুড়িকে। বিশরপাড়ায় সুভাষ চক্রবর্তীর সাকরেতদের আয়োজন করা গানের অনুষ্ঠানেই শিলাজিৎ সিপিআইএম নেতাদের প্যাক দিয়ে গেয়েছিলেন, ‘কবে লাল হবে আর, কবে লাল হবে তোদের? ঘুম পেয়েছে বাড়ি যা।’ চন্দ্রবিন্দুর গানে ‘কাটা মিনি স্কার্ট’ শুনে নাক উঁচু বাঙালি চিঠি পাঠিয়েছিল আনন্দবাজারের সম্পাদকীয় পাতায়। সেই চন্দ্রবিন্দুর গানের প্রেমগুলোর মতো পকেট বোঝাই খুচরো সিকি নিয়ে কেউ আজ আর আশুতোষ থেকে ময়দান হেঁটেই পার করে কিনা জানা যায় না; জানা যায় না কেউ আজ আর ক্যান্টিনের ওই কোণটাই পছন্দ করে কিনা প্রথম কলেজের দিনটায়।

আমরা বড় হয়ে গিয়েছি। তবু ভেঙে যাওয়া বাংলার এই ব্যান্ড মানচিত্রের রেখচিত্র ধরে আমাদের ছেলেবেলাকে ভুলতে পারিনি। কখন বৃষ্টি নেমেছে জানতে পারি আজকাল, তবু কাউকে বলিনি ‘তুমি বৃষ্টি ভিজো না, ঠান্ডা লেগে যাবে।’ শুধু হলুদ পাখির গানের মতো করে চলে যাচ্ছে স্রোতে ভেসে এই সবকিছু। কোন দূর দেশে তা-ও জানি না। তবু আক্ষেপটা রয়ে গিয়েছে।

সে কি ফিরবে না আর কোনোদিন?

সম্পর্কিত খবর