উৎসবে মৃত্যুশোক, পরিবারের পাশে মুখ্যমন্ত্রী। কোথায় বিরোধী শিবিরেরা?

৪৩ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

চোরবগান এলাকায় দুর্গাপূজার সময় ঠাকুর দেখতে গিয়ে ১৯ জন সহনাগরিকের মৃত্যুর ঘটনা গোটা রাজ্যকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। এত বড় প্রাণহানির পরেও রাজ্যের বিরোধী দলগুলির ভূমিকা এবং রাজপথে তাদের ধারাবাহিক অনুপস্থিতি বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক অদ্ভুত ও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে।কলকাতা শহরের বুকে এক মর্মান্তিক বিপর্যয় এবং তার পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে একাধিক গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ঘটনার পরপরই প্রশাসনিক স্তরে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের তৎপরতা দেখা গেছে। মর্মান্তিক এই ঘটনার শোকপ্রকাশের পাশাপাশি স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মৃত প্রতিটি পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে সরাসরি তাঁদের বাড়িতে পৌঁছে গেছেন। স্বজনহারা পরিবারগুলির পাশে দাঁড়ানো এবং তাঁদের সান্ত্বনা দেওয়ার এই দৃশ্য প্রশাসনিক সংবেদনশীলতার বার্তা যেমন দিয়েছে, তেমনই রাজনৈতিক ময়দানেও এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক বাতাবরণ তৈরি করেছে। যেখানে সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব নিজে ময়দানে নেমে দুর্গতদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, সেখানে বিরোধী দলগুলির নিষ্ক্রিয়তা সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
​কিন্তু সবথেকে বড় প্রশ্ন হলো, ১৯টি তাজা প্রাণহানির পরেও বিরোধী দলগুলির ভূমিকা কেন কেবল সংবাদমাধ্যমের স্টুডিও এবং বাইটসর্বস্ব মন্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রইল? অতীতে বাম বা কংগ্রেস কিংবা অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলির যেভাবে চেনা আন্দোলনের মেজাজ দেখা যেত—রাজপথ অবরোধ, তীব্র বিক্ষোভ কিংবা বৃহত্তর জনমত গঠন—তার লেশমাত্রও এবার দেখা মেলেনি। ব্যতিক্রমীভাবে যুবনেত্রী দীপ্সিতা ধর ছাড়া হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া প্রথম সারির কোনো বিরোধী নেতাকে মৃতদের পরিবারের সঙ্গে গিয়ে দাঁড়াতে বা প্রকাশ্য সহমর্মিতা জানাতে দেখা যায়নি। এমনকি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা বিরোধী শিবিরের বড় অংশ এ বিষয়ে জোরালো রাজপথের লড়াইয়ে নামেননি বা একটিমাত্র সর্বাঙ্গীন সাংবাদিক সম্মেলন পর্যন্ত করেননি।

সাধারণ মানুষের মনে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি ঘুরপাক খাচ্ছে, তা হলো—তবে কি এই ১৯ জন মানুষের মৃত্যুর নেপথ্যেও কোনো অদৃশ্য রাজনৈতিক ‘সেটিং’ বা সমঝোতা কাজ করছে? বিগত কিছু সময় ধরে বাংলার রাজনীতিতে একধরণের সমঝোতার রাজনীতি বা আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের গুঞ্জন প্রায়শই শোনা যায়। বড় কোনো বিপর্যয় বা মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পরেও যদি প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি কেবল সামাজিক মাধ্যম বা টেলিভিশনের পর্দায় খণ্ডিত মন্তব্য বা কাদা ছোড়াছুড়িতে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখে, তবে তাকে সাধারণ মানুষ কেবল রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা হিসেবে দেখে না, এর পেছনে অন্য কোনো স্বার্থের হিসাব নিকাশ খোঁজে।

একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধীদের প্রধান কাজ হলো সরকারের নীতি, গাফিলতি বা প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং জনস্বার্থকে সর্বাগ্রে তুলে ধরা। চোরবাগানের মতো মর্মান্তিক ঘটনায় যেখানে সুনির্দিষ্ট বিচারবিভাগীয় তদন্ত, কঠোর প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং জনমতের প্রবল জোয়ার তৈরি করার কথা ছিল, সেখানে বিরোধী দলগুলির এই ম্রিয়মাণ উপস্থিতি তাদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। মিডিয়ার ক্যামেরার সামনে কিছু চটজলদি মন্তব্য বা রাজনৈতিক ফায়দা তোলার মানসিকতা কি তবে বাংলার মাটিতে স্থায়ী আন্দোলনের সংস্কৃতিকে গ্রাস করে নিচ্ছে?

বামপন্থী দলগুলির ঐতিহ্যগতভাবে শ্রমিক, বঞ্চিত ও মেহনতি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস রয়েছে, এই ঘটনায় সেই সংগঠনের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ। অন্যদিকে, অন্যান্য বিরোধী দলগুলিও কেবল দায়সারা বিবৃতি দিয়েই তাদের দায়িত্ব সেরেছে। রাজপথের চেনা লড়াই, দীর্ঘমেয়াদী আন্দোলন কিংবা সরকারের ওপর লাগাতার চাপ সৃষ্টির যে রাজনৈতিক কৌশল অতীতে দেখা যেত, তার অভাব আজ বড় বেশি প্রকট।

পরিশেষে বলা যায়, চোরবাগান ট্র্যাজেডি কেবল কিছু মানুষের আকস্মিক ও দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু নয়, এটি বাংলার বিরোধী রাজনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা এবং রণকৌশলগত দেউলিয়াপনার এক বড় দলিল। মৃত মানুষের পরিবারের চোখের জলের প্রতি সম্মান জানিয়ে রাজনৈতিক দলগুলি যদি কেবল মিডিয়ার বাইট ও বাগাড়ম্বরে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা শুধু রাজনীতির অবক্ষয় নয়, বরং বিরোধী পরিসরের ক্রমিক বিলুপ্তির পূর্বাভাস। সাধারণ মানুষ আজ জানতে চায়—এত বড় ট্র্যাজেডির পরও কেন রাজপথ শূন্য? কেন আন্দোলনের সেই চেনা আগুনে জল ঢেলে দেওয়া হলো? এই প্রশ্নের উত্তর যতদিন না মিলবে, ততদিন বাংলার রাজনীতিতে জনস্বার্থের প্রকৃত প্রতিফলন অধরাই থেকে যাবে।

অন্যান্য প্রতিবেদন.