Mein Vaapas Aaunga: ইমতিয়াজ পারলেন, বিবেক হারলেন! “ওরা ভেবেছিল গান্ধীকে মারলেই ভারত হিন্দুরাষ্ট্র হবে”, মোলাকাতের প্রথম পর্বে মুখোমুখি গান্ধীবাদী শিক্ষাবিদ মনীষা বন্দ্যোপাধ্যায় One Nation, One Law: এক দেশ, এক আইন প্রজেক্টের নাম “হিন্দি হিন্দু- হিন্দুস্তান” অশান্ত মণিপুরের নেপথ্যে অবৈধ মাদক কারবার? প্রশাসনের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা ‘বাঙালির সন্তান থাকবে রাজমা চাওলে’, নিরামিষ বাংলা গড়ার প্রথম পদক্ষেপ? Gym Jihad: বাজারে নতুন ট্রেন্ড ‘জিম জিহাদ’, ফের ‘খাত্রে মে’ হিন্দুরা? রাজনৈতিক হিংসার দুই অধ্যায় বাজেটে পার্শ্বশিক্ষকদের নামমাত্র বেতন বৃদ্ধি, যোগ্যতার অমর্যাদা ও আর্থিক বঞ্চনার চালচিত্র!

রাজনৈতিক হিংসার দুই অধ্যায়

৬ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

বীরভূম জেলার রামপুরহাটের বগটুই গ্রাম বরশাল পঞ্চায়েতের অন্তর্গত। উপপ্রধান ভাদু শেখ রাস্তার ধারে স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। চারটে মোটরবাইকে চড়ে কিছু লোক তাঁকে ঘিরে ফেলে। প্রথমে বোমা ছোঁড়ে। তারপর পিস্তল থেকে গুলি চালায়। কয়েকঘণ্টার মধ্যেই পালটা অ্যাকশন। অভিযুক্ত সঞ্জু শেখ ও তাঁর প্রতিবেশীদের বাড়িতে হামলা হয়। বোমা ছোঁড়া হয় এবং বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। আটটি দগ্ধ মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরের বছর খুন হন ভাদু শেখের দাদা। অভিযুক্ত সঞ্জু শেখ জামিন পান ও আত্মগোপন করেন। মনে পড়বে খড়দহের তৃণমূল কংগ্রেসের কাউন্সিলর অনুপম দত্ত খুনের ঘটনা। দুষ্কৃতীরা পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করে হত্যা করে তাকে। পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুর, নদীয়ার হাঁসখালি, ওই খড়দহেরই তৃণমূল নেতা রণজয় শ্রীবাস্তবের উপর হামলাসহ বিগত পাঁচ-ছ’ বছরে পুরসভা অথবা পঞ্চায়েত স্তরে এধরনের ঘটনা অব্যাহত থেকেছে। সবচেয়ে চমকে দেবার মতো ঘটনা ঘটেছিল ১৫ নভেম্বর, ২০২৪-এ দক্ষিণ কলকাতার কসবায়। কাউন্সিলর সুশান্ত ঘোষের উপর হামলা চালায় কিছু দুষ্কৃতী। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান তিনি।

স্থানীয় স্তরের জনপ্রতিনিধিরা এভাবেই বারবার হিংসার শিকার হয়েছেন তৃণমূল জমানার শেষ দশ বছরে। লক্ষণীয়, প্রায় প্রত্যেক ক্ষেত্রেই আততায়ীরাও তৃণমূল কংগ্রেস-ঘনিষ্ঠ। অর্থাৎ, বিরোধীদের দেওয়া ক্যাপশন—‘মরছে তৃণমূল, মারছে তৃণমূল’ যেন আক্ষরিক অর্থেই সত্যি হয়ে উঠছিল ক্রমশ। কিন্তু, বাংলার গ্রাম ও আধাশহরাঞ্চলে রাজনৈতিক হিংসার এই প্রাদুর্ভাব তৃণমূল কংগ্রেস আমলেই আরম্ভ হয়েছিল, এটা বললে ইতিহাসকে অস্বীকার করা হবে। ষাট-সত্তরের দশকের গ্রামবাংলায় যে রাজনৈতিক হানাহানির সূত্রপাত, তার প্রারম্ভিক চেহারাটা ছিল অনেকাংশে মতাদর্শনির্ভর। ষাটের মাঝামাঝি থেকেই বাংলার গ্রামাঞ্চলে কৃষক আন্দোলন ও খাদ্য আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়তে থাকে। মূলত গ্রামীণ সম্পদশালী শ্রেণির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াই জোরদার হয় এবং ১৯৬৭-র নকশালবাড়ি আন্দোলনের সূচনা এই হিংসাকে এক তীব্র মতাদর্শগত শিলমোহর দেয়। দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শোকমিছিল’ (১৯৭৩) উপন্যাসে দুই কমিউনিস্ট পার্টির অন্তঃকলহে খুন হওয়া পার্টিকমরেডের ছবি সমকালীন ভ্রাতৃঘাতী রাজনৈতিক হিংসার বাতাবরণকেই তুলে ধরে। কথাসাহিত্যিক অসীম রায়ের লেখা ‘ধোঁয়া, ধুলো, নক্ষত্র’ গল্পটিতেও যুক্তফ্রন্টের আমলে রাজনৈতিক হিংসাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের স্পষ্ট ছবি পাওয়া যায়। ১৯৭০ সালে দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে দেবার পরে বর্ধমানে ‘সাঁইবাড়ি গণহত্যা’র ঘটনা ঘটে। দুই কংগ্রেস নেতা প্রণব সাঁই এবং মলয় সাঁই খুন হন সিপিআইএম পার্টির বিশাল মিছিলের আক্রমণে। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৭ পশ্চিমবঙ্গে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় জমানাতেও রাষ্ট্রশক্তি সরাসরি বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মীদের খতম করে। পরিস্থিতি বদলে গেল ১৯৭৭-এ বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার পরে। আংশিক ভূমিসংস্কার, ত্রিস্তর পঞ্চায়েতি রাজ, গ্রামীণ মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে সিপিআইএম-প্রভাবিত ‘পার্টি সোসাইটি’ যতো বেশি সংহত হতে লাগল, ততোই বিরোধী কংগ্রেসি, বামশরিক অথবা বামফ্রন্ট-বহির্ভূত অন্যান্য রাজনৈতিক কর্মীদের হত্যার ঘটনা ঘটতে লাগল। বিশেষত, ১৯৮৭ সালে তৃতীয় বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হবার পর থেকে। গ্রামসমাজে নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় রাখার কাজে সিপিআইএমের নীচুতলা ও মাঝারি স্তরের নেতারা হিংসাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন যথেচ্ছ। সেটা ২০০০ সালে নানুরের সুচপুর গণহত্যা, ২০০১-এ পশ্চিম মেদিনীপুরের ছোটো আঙারিয়ায় বক্তার মণ্ডল-সহ পাঁচজনকে জীবন্ত জ্বালিয়ে দেওয়া, ২০০৭-এর নন্দীগ্রাম গণহত্যা থেকে ২০১০-এ নেতাই গণহত্যা অব্দি বজায় থেকেছে। ১৯৯৮ সালে বিধানসভায় একটি তর্কে সেইসময়-অব্দি বামজামানায় ২৭ হাজার রাজনৈতিক খুনের কথা উল্লিখিত হয়েছিল। আসলে পার্টি সোসাইটির নিরঙ্কুশ একাধিপত্য বজায় রাখতে হলে মতাদর্শগত আধিপত্যের পাশাপাশি শারীরিক বলপ্রয়োগের এই স্বাভাবিক প্রবণতা গড়ে ওঠাই ছিল স্বাভাবিক।

তৃণমূল জমানায় এই রাজনৈতিক হিংসার চেহারাটা বদলে গেল কয়েকবছরের মধ্যে। অধ্যাপক বিশ্বনাথ চক্রবর্তী তাঁর একটি লেখায় বামজামানার এই সন্ত্রাসকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন—‘At the grassroot level the Left also used violent methods for tactical gain against opposition. During the Left Front regime violence existed at a sub-terrain level’। (Mapping Violence: West Bengal under the Left and the TMC Regimes, Socialist Perspective, Vol. 52. 3-4 December 2024-March 2025, pp.103-121) এই অন্তঃশীল সন্ত্রাসের সঙ্গে ২০১৩-র পঞ্চায়েত নির্বাচন-পরবর্তী তৃণমূল জমানার ব্যাপক রাজনৈতিক সন্ত্রাসের দৃশ্যত পার্থক্য রয়েছে। পার্টি-সোসাইটি যে কাজটা করত মতাদর্শিক স্তরে, বামজামানার শেষদিক থেকে সিপিআইএমের নীচুতলার যে অংশটি গ্রামীণ ক্ষুদ্র পুঁজির মালিক হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াকে ক্রমশ আরও বিপুল চেহারা দানের লক্ষ্যে তৃণমূলে জামা বদলে ঢুকে পড়ল এবং তৃণমূল-অনুমোদিত নতুন ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি সোসাইটি’র স্থানীয় মাতব্বর হয়ে উঠল, তাদের সামনে মতাদর্শিক সংগ্রামের কোনও লক্ষ্য ছিল না। গোটা গ্রামীণ ও আধাশহুরে-পিছিয়ে-থাকা নাগরিক সমাজকে সম্পূর্ণ বিরোধীমুক্ত করে তোলার উদগ্র আগ্রহ নিয়ে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ল সরকারি-বেসরকারি পূর্ণাঙ্গ অর্থনীতির দখল কেবল নিজেদের গোষ্ঠীর হাতে কুক্ষিগত করার লক্ষ্যে। অর্থাৎ এইবার রাজনৈতিক হিংসার একটা অন্যতম উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়াল এলাকায় এলাকায় লুঠের সাম্রাজ্য বিস্তার ও কাটমানি-তোলাবাজির ভাগ কে কতোটা নিজের কব্জায় আনতে পারে, সেই সংকীর্ণ লক্ষ্যকে সর্বজনীন করার এক সার্বিক প্রক্রিয়াকে গতিশীল রাখা। ক্ষমতায় আসার দু-বছরের মধ্যেই বাম-মুক্ত পশ্চিমবঙ্গ গড়ে তোলার এক উদগ্র আকাঙ্ক্ষায় তৃণমূল সিপিআইএমের প্রায় দেড়হাজার পার্টি অফিস দখল অথবা ধ্বংস করে। বিরোধীশূন্য পঞ্চায়েত ও পৌরসভা গড়ার লক্ষ্যে সিপিএম, ফরওয়ার্ড ব্লক এবং ২০১২-তে ইউপিএ সরকার ছেড়ে বেরিয়ে আসার পরে কংগ্রেসের অবশিষ্ট শক্তিটুকুকেও নিজের দখলে নিয়ে আসার আগ্রাসী প্রক্রিয়ারই ফল ঝালদা ও তাহেরপুর পুরসভা দখল নেওয়া। সাগরদীঘিতে কংগ্রেস বিধায়ক বায়রন বিশ্বাসকে দলবদল করানো ও তাকে নিজেদের দলের অন্তর্ভুক্ত করার ঘটনাটিও এই সার্বিক বিরোধীশূন্য রাজনৈতিক পরিসর দখলের নিদর্শন।

কিন্তু মতাদর্শিক জায়গাটা প্রায় অবলুপ্ত হয়ে যাবার ফল হল ভয়াবহ। তৃণমূল কংগ্রেস যেহেতু বিষম রাজনৈতিক বিশ্বাসের এক খাপছাড়া জোট, তাই এক্ষেত্রে আর্থিক ও অন্যান্য সুবিধা পাবার জায়গাটাই হয়ে উঠল মুখ্য। রাজনৈতিক হিংসার অভিমুখও হয়ে দাঁড়াল সেটাই। মমতা ব্যানার্জির সরকারের প্রায় শতাধিক জনকল্যাণমুখী প্রকল্প, কেন্দ্রীয় সরকারের নানাবিধ প্রকল্প, ক্ষুদ্র স্থানিক পরিসরে প্রায় সর্বজনীন তোলাবাজির এক অসাধু চক্র এমন এক বিরাট ‘বেনিফিশিয়ারি গ্রুপ’ তৈরি করল, যা কর্মসংস্থানহীন, শিক্ষাদীক্ষা-রুচিহীন এক তীব্র লুম্পেনসমাজের হাতে রাজনৈতিক সমাজের নেতৃত্ব তুলে দিল। বাম আমলেও ‘লুম্পেন প্রলেতারিয়েত’কে ব্যবহার করেছে উচ্চতর নেতৃত্ব। কিন্তু সেখানে ক্লাস সিক্স-পাশ বোমা-বাঁধা, বন্দুক চালানো নীচুতলার কর্মীর উপর কয়েকস্তর-বিশিষ্ট শিক্ষিত নেতৃত্ব বিরাজ করত। তৃণমূল সরকার যেহেতু প্রথম থেকেই বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বর্গটিকে প্রায় ‘শ্রেণিশত্রু’ হিসেবে দাগিয়েই জয়যাত্রা আরম্ভ করেছিল, তাই কোনও ধরনের রাজনৈতিক কৌলীণ্য বজায় রাখার ন্যূনতম দায়বদ্ধতা তার প্রথম থেকেই ছিল না। এবং বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে তারা সিপিআইএমের ছেড়ে-আসা জুতোতেই পা গলাল। অর্থাৎ, খুন, ধর্ষণ, অর্থনৈতিক বয়কট, ফসল-খামার লুট, জরিমানা, মানসিক অত্যাচার-জাতীয় পুরোনো পার্টিসমাজের যাবতীয় অস্ত্রগুলোই এবার ব্যবহৃত হতে লাগল নতুন করে। মতাদর্শিক আবরণের আর কোনও প্রয়োজন রইল না, কারণ, তৃণমূলের ‘পপুলিস্ট’ বা ‘জনতুষ্টিবাদী’ রাজনীতির কেন্দ্রেই রয়েছে আর্নেস্তো লাকলাউ-কথিত ‘এম্পটি সিগনিফায়ার’-এর রাজনীতি (On Populist Reason, Verso, 2005)। যার কোনও স্পষ্ট মতাদর্শগত ভিত্তি নেই। এমনকি পেয়ে যাওয়া-পাইয়ে দেওয়া ব্যতীত আর কোনও লক্ষ্যও এই রাজনীতির নেই। বামজামানার শেষদিকে ঠিক এই বিশেষ লক্ষণটিই বাংলার রাজনীতিতে সার্বত্রিক হয়ে উঠেছিল। তৃণমূল সেটাকেই চরম সীমায় পৌঁছে দিয়েছিল। ‘মরছে তৃণমূল, মারছে তৃণমূল’—এই বাস্তবতা স্বল্প সময়ে ওই অস্বাভাবিক লোভের পরিতৃপ্তি ঘটানোর সঙ্গেই জড়িত, যা পঞ্চায়েত প্রধান ও কাউন্সিলরের ঘরে কয়েকশ’ কোটি অনুপার্জিত টাকার সঞ্চয় ঘটায় মাত্র একদশকে। আবার এই টাকা ও ক্ষমতার বখরার কারণেই কাউন্সিলরের উপর গুলি চালায় দলেরই বিপক্ষ গোষ্ঠী।

কিন্তু সমাজের সর্বস্তরে হিংসার এই দৃশ্যমান, অসংস্কৃত চেহারা এবং ক্রমাগত বিরোধী পরিসরটিকে শূন্য করে দেওয়ার পরিণাম টের পাওয়া গেল ২০১৯-এ বিজেপির ১৮ টি লোকসভা আসন জয়ের মাধ্যমে। বামেদের ২৩ শতাংশ ভোট এইবার সরাসরি বিজেপিতে গেল। ঠিক আগের বছর, ২০১৮-এর পঞ্চায়েত নির্বাচনে যে লাগামছাড়া হিংসার সাক্ষী থেকেছে বাংলা, ৩৪.২ শতাংশ আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতেছে তৃণমূল, সেই মাত্রাছাড়া হিংসার প্রত্যক্ষ ফল বিজেপির এই চমকপ্রদ নির্বাচনী সাফল্য। একদিকে তৃণমূল বাংলার গ্রামসমাজে আরএসএস-এর নিঃশব্দ অনুপ্রবেশ, শাখা বিস্তারের প্রক্রিয়াকে রোধ করতে পারেনি, পাশাপাশি, পুরো বিরোধী পরিসরটুকু আত্মসাৎ করার চেষ্টা ব্যুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে। বিজেপি কিন্তু একটি উগ্র দক্ষিণপন্থী মতাদর্শবাহী দল, যাদের রেজিমেন্টেড পার্টিকাঠামো রয়েছে। ফলত, তৃণমূলের এই police-প্রশাসনকে সম্পূর্ণ ব্যবহার করে দলীয় হিংসাকে একমাত্রিক করে তোলার রাজনীতি থেকে বাঁচতেই বিরোধী কণ্ঠস্বর বিজেপির ছাতার নীচে জায়গা খুঁজে নিয়েছে। এই অভাবিতপূর্ব চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করা তৃণমূলের পক্ষে তাদের এতোদিনের চেনা হিংসার রাজনীতি দিয়ে করা সম্ভব ছিল না। বিপুল অর্থশক্তি, গোটা রাষ্ট্রশক্তিতে বলীয়ান বিজেপি দেশের কুড়িটি রাজ্যে ক্ষমতা দখল সেরে বাংলা দখলে ঝাঁপিয়েছিল। তাই, ২০২১-র পর থেকে দেখা গেছে, তৃণমূল দলের প্রধান হিংসাত্মক বলপ্রয়োগের লক্ষ্য বিজেপি। ২০২১-এর ভোটপরবর্তী হিংসায় বড়োসংখ্যক বিজেপি কর্মীর মৃত্যু হয়। ঘরছাড়া হয় তাদের বিপুলসংখ্যক সমর্থক। এতোদিনের চেনা হিংসার প্যাটার্ন দিয়ে যে বিজেপিকে রোখা যাবে না, তা সম্ভবত তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং তাদের ভোটকুশলী সংস্থাটি বুঝতেও পারেনি। সমাজের নীচুতলায় ব্যাপক অনুন্নয়নজনিত সমান্তরাল অবৈধ রোজগারের ইকোসিস্টেমটিকে তারা পনেরো বছর যাবৎ টিকিয়ে রেখেছিল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে। কিন্তু আঁটোসাঁটো নির্বাচন কমিশন, আড়াই লক্ষ আধাসামরিক বাহিনী, এসআইআর—কোনওটিরই কার্যকরী প্রতিরোধ করার মতো শক্তি ওই বলপ্রয়োগের নেই, তা সম্ভবত তৃণমূলের ভোট-ম্যানেজারেরাও বুঝতে পারেননি। দুর্বল বাম-কংগ্রেসকে যে পদ্ধতিতে ঠেকিয়ে রাখা গেছিল, সেই একই পদ্ধতিতে একটি সর্বভারতীয় অতিশক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তিকে আটকানো সম্ভব হয়নি ২০২৬-এর নির্বাচনে। এর হাতেগরম নিদর্শন ‘ফলতা’ উপনির্বাচন। তৃণমূলি বাহুবলীরা যে আসলে কাগুজে বাঘ, তা জাহাঙ্গির খানের ভোটপ্রক্রিয়া থেকে সরে যাবার ঘটনাতেই প্রমাণিত হয়েছিল।

যে হিংসার বাতাবরণ তৃণমূল কংগ্রেস গড়ে তুলেছিল বিগত দেড়দশকব্যাপী, পুলিশ-প্রশাসন পাশ থেকে সরে যেতেই তা ফিরে আসছে এলাকায় এলাকায় জনবিক্ষোভের চেহারায়। এই ‘গণরোষ’-এর পিছনে কোথাও কোথাও নতুন শাসক বিজেপির নেপথ্য হাত নিশ্চিত রয়েছে, কিন্তু হিংসাকে কাঠামোগত চেহারা দানের প্রক্রিয়াটি এবার তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সমান ও বিপরীত ফল বয়ে আনতে চলেছে। হয়তো, এর ভুক্তভোগী হবে সাধারণ মানুষও।

অন্যান্য প্রতিবেদন.